মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। হরমুজ প্রণালি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধের ঘোষণা দেওয়ার পর রোববার ভোরে ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় নতুন করে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এর কিছুক্ষণ পরই সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও বাহরাইনে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার সতর্কতা জারি করা হয়।
সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, একটি জাহাজ ‘অননুমোদিত রুটে’ চলাচল করছিল এবং একাধিক জাহাজ তাদের সতর্কবার্তা উপেক্ষা করেছিল। এ অবস্থায় একটি জাহাজকে সতর্কতামূলক গুলি করে থামিয়ে দেওয়া হয়।
রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএ-তে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে আইআরজিসি জানায়, এই ঘটনার পর এবং এ অঞ্চলে মার্কিন হস্তক্ষেপ বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকবে। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত কোনো জাহাজ এই পথে চলাচল করতে পারবে না।
এ ঘটনায় কোনো ধরনের প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হলে তার ‘কঠোর জবাব’ দেওয়া হবে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান।
হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণার পরপরই চলতি সপ্তাহে ইরানের বিরুদ্ধে তৃতীয় দফা হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, তেহরান প্রণালি অতিক্রমরত সাইপ্রাসের পতাকাবাহী একটি কনটেইনার জাহাজে হামলা চালিয়েছে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, ওই জাহাজের একজন বেসামরিক নাবিক নিখোঁজ রয়েছেন। জাহাজে আগুন লাগা এবং ইঞ্জিন কক্ষে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কারণে সেটি যাত্রা অব্যাহত রাখতে পারছে না।
সেন্টকমের তথ্য অনুযায়ী, ওয়াশিংটন সময় শনিবার সন্ধ্যা ৭টা ১৫ মিনিটে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে হামলা শুরু হয়।
এক বিবৃতিতে সেন্টকম বলেছে, বাণিজ্যিক জাহাজে আগের হামলার জন্য জবাবদিহির মুখে পড়ার পরও ইরান সমঝোতা মেনে চলার সুযোগ পেয়েছিল। কিন্তু তারা আবারও ব্যর্থ হয়েছে। এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সামুদ্রিক হামলার সক্ষমতা দুর্বল করতে বড় ধরনের মূল্য চাপিয়ে দিচ্ছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ইরান ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখন তাদের তার মূল্য দিতে হবে। প্রায় চার ঘণ্টা পর সেন্টকম জানায়, অভিযান শেষ হয়েছে এবং এতে প্রায় ১৪০টি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে। আগের দুই দফার তুলনায় এটি অনেক বড় অভিযান।
মার্কিন বাহিনীর দাবি, হামলার লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ছিল ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ঘাঁটি, নৌ সক্ষমতা, গোলাবারুদ সংরক্ষণাগার, যোগাযোগ নেটওয়ার্ক এবং উপকূলীয় নজরদারি কেন্দ্র।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, দেশটির দক্ষিণ উপকূলজুড়ে একাধিক স্থানে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। জ্বালানি ও পেট্রোকেমিক্যাল কেন্দ্র বুশেহর ও আসালুয়েহসহ বন্দর আব্বাস, বন্দর-ই-দায়ের এবং হরমুজ প্রণালির কাছের সিরিক এলাকায় বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হুমকির মোকাবিলা করছে। একই সময়ে প্রতিবেশী বাহরাইনেও বিমান হামলার সাইরেন বাজানো হয়।
আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে, দেশজুড়ে শোনা যাওয়া বিস্ফোরণের শব্দ চলমান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিরোধ অভিযানের ফল। বাহরাইনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নাগরিক ও বাসিন্দাদের শান্ত থাকার এবং নিকটস্থ নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
এদিকে কাতারেও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। পরে সেখানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সতর্কতা জারি করা হয়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা থাকা উপসাগরীয় দেশগুলোতে একাধিকবার হামলা চালিয়েছে ইরান।
সাম্প্রতিক এই সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ অবসানে হওয়া অন্তর্বর্তী সমঝোতাকে নতুন করে সংকটের মুখে ফেলেছে। ব্যাপক মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল।
গত ১৭ জুন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান ১৪ দফা একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এতে সামরিক অভিযান অবিলম্বে বন্ধ করা এবং ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছানোর অঙ্গীকার করা হয়েছিল। তবে ৮ জুলাই ট্রাম্প ঘোষণা দেন যে, ওই চুক্তি শেষ হয়ে গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, চূড়ান্ত সমঝোতার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ। যুদ্ধ চলাকালে ইরান বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বন্ধ করে দেয়।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাস পরিবহনপথ হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালি দিয়ে উপসাগরীয় অঞ্চলের বিপুল পরিমাণ জ্বালানি রপ্তানি হয়। তেহরান জানিয়েছে, ভবিষ্যতে জাহাজ চলাচলের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ থাকবে এবং এর জন্য ফি আদায় করা হবে। যুদ্ধ-পূর্ব সময়ের মতো অবাধ নৌ চলাচলে আর ফিরে যাওয়া হবে না বলেও জানিয়েছে ইরান।







