ভয়াবহ বন্যার পর প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে নেপালে সাময়িকভাবে অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান স্থগিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়াদের উদ্ধারে টানেল উদ্ধার, মরদেহ শনাক্তকরণ, ডিএনএ পরীক্ষা এবং যোগাযোগব্যবস্থা পুনরুদ্ধারসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিদেশি কারিগরি সহায়তা চেয়েছে দেশটি।
শনিবার (২৯ আগস্ট) আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।

বুধবার হিমবাহ ধসে সৃষ্ট ভয়াবহ স্রোতে নেপাল ও চীনের তিব্বত সীমান্তবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকা বিপর্যস্ত হয়। পাথর, বরফ, কাদা ও ধ্বংসাবশেষের স্রোতে ঘরবাড়ি, সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্র ভেসে যায়। এখন পর্যন্ত নেপালে অন্তত ৬২৬ জন এবং তিব্বতে সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় ৩ হাজার মানুষ। এর মধ্যে নেপালে প্রায় ২ হাজার ৪২৬ জন এবং তিব্বতের গিরং কাউন্টিতে অন্তত ৫৫৪ জন নিখোঁজ রয়েছেন।
নেপালের ক্ষতিগ্রস্ত রাসুয়া জেলার শীর্ষ প্রশাসনিক কর্মকর্তা নরেন্দ্র পারিয়ার বলেন, বৃষ্টি ও কুয়াশার কারণে সাময়িকভাবে উদ্ধার অভিযান বন্ধ রাখা হয়েছে। বর্তমানে উদ্ধার হওয়া তীর্থযাত্রীদের সড়কপথে রাজধানী কাঠমান্ডুতে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করাই অগ্রাধিকার।

বন্যার তিন দিন পর ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করা কিছু মরদেহ পচে যাওয়ায় শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। স্বাস্থ্যঝুঁকি ও রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় আইনি প্রক্রিয়া শেষে এসব মরদেহ দাফন করা হবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
চিতওয়ান জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, মরদেহগুলোর ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হবে। এরপর সেগুলো খোলা জায়গায় দাফন করা হবে।
কাঠমান্ডুর মহারাজগঞ্জ মেডিকেল ক্যাম্পাসের বাইরে নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে ভিড় করছেন পরিবারের সদস্যরা। সেখানে উদ্ধার করা মরদেহের ছবি দেখে স্বজনদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হাসপাতালে নেওয়া ৪৯টি মরদেহের মধ্যে মাত্র সাতটির পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে।
বন্যার পর নেপাল-চীন সীমান্তে তৈরি হওয়া একটি হ্রদ থেকে পানি উপচে পড়ায় শুক্রবারও উদ্ধার অভিযান সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছিল। তবে শনিবার চীনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হ্রদটি উপচে পড়ার ঝুঁকি কমেছে।
স্যাটেলাইটের ছবিতে দেখা গেছে, হ্রদের পানি ধীরে ধীরে বের হয়ে যাচ্ছে এবং পানির স্তর কমছে। তবে বন্যার ঝুঁকি পুরোপুরি কাটেনি। নেপালের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উজানে থাকা দুটি হ্রদের পানি পুরোপুরি নেমে না যাওয়া পর্যন্ত নতুন করে বন্যার আশঙ্কা থাকবে।
নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিষির খানাল জানিয়েছেন, অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানে বিদেশি সহায়তা প্রয়োজন নেই। তবে টানেলের ভেতর আটকে থাকা মানুষদের উদ্ধার, ধ্বংস হওয়া সেতুর কারণে বিচ্ছিন্ন যোগাযোগব্যবস্থা পুনরুদ্ধার, মরদেহ শনাক্ত, ডিএনএ পরীক্ষা এবং দীর্ঘ সময় মরদেহ সংরক্ষণের মতো বিশেষায়িত কাজে বিদেশি কারিগরি সহায়তা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, যেসব ক্ষেত্রে নেপালের পর্যাপ্ত দক্ষতা ও কারিগরি সক্ষমতা নেই, সেসব বিষয়ে বিশেষায়িত সেবা ও কারিগরি সহায়তার জন্য ইতোমধ্যে বিভিন্ন দেশের কাছে অনুরোধ করা হয়েছে।
এদিকে ভারত নেপালে প্রায় ৬০ টন ত্রাণসামগ্রী পাঠিয়েছে। তিনটি ফ্লাইটে কম্বল, ওষুধ, খাবার ও পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি টানেল উদ্ধারকারী ও চিকিৎসা দল পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে। ধ্বংস হওয়া যোগাযোগব্যবস্থা পুনরুদ্ধারে দুর্যোগ মোকাবিলা বাহিনী, অস্থায়ী সেতু ও কারিগরি দল পাঠানোর প্রস্তাবও দিয়েছে ভারত।
চীনও নেপালের দুর্গত এলাকায় জরুরি সহায়তা ও আন্তর্জাতিক উদ্ধার সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছে।
ভয়াবহ এই দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে অবকাঠামো পুনর্গঠনে নেপালের ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হতে পারে বলে জানিয়েছেন দেশটির অর্থমন্ত্রী স্বর্ণিম ওয়াগলে।
তিনি বলেন, এটি প্রাথমিক হিসাব। ক্ষয়ক্ষতি ও লোকসানের প্রকৃত পরিমাণ নির্ধারণের কাজ চলছে।
এদিকে চীনের তিব্বতেও নিখোঁজ পাঁচ শতাধিক মানুষকে উদ্ধারে অভিযান চলছে। শুক্রবার উদ্ধারকারীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত গিরং সীমান্ত ক্রসিং এলাকায় পৌঁছান। ধ্বংস হয়ে যাওয়া সড়কের কারণে তারা পাহাড় ও উপত্যকা পেরিয়ে দড়ির সাহায্যে বন ও খাড়া পাহাড়ি এলাকায় এগিয়ে যান।
সীমান্ত ক্রসিংয়ের নজরদারি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা গেছে, বন্যার সময় প্রবল পানির স্রোত ও ধ্বংসাবশেষ ভবনগুলোকে গ্রাস করছে এবং প্রাণ বাঁচাতে মানুষ সেখান থেকে পালানোর চেষ্টা করছে।









