ফাইনালে খেলার লক্ষ্য জানিয়ে দেশ ছেড়েছিল বাংলাদেশ। মনের কোণে শিরোপা জয়ের প্রত্যাশা লুকিয়ে সাবিনা-কৃষ্ণারা মাঠে সাফল্য ছোঁয়ার পণ করেছিলেন। বয়সভিত্তিক দলে নিয়মিত সাফল্য ধরা দিলেও জাতীয় দলের বড় আসরে শিরোপা যেন অধরা থেকে যাচ্ছিল। ছয় বছর আগে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে ফাইনালে হারের হতাশা ছিল। এবার আনন্দের ক্ষণ। মেয়েরা উড়িয়েছে লাল-সবুজের বিজয় নিশান। সাউথ এশিয়ান মেয়েদের শ্রেষ্ঠত্বে প্রথমবার চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ।
কাঠমান্ডুর দশরথ রঙ্গশালা স্টেডিয়ামে সোমবার স্বাগতিক নেপালকে ৩-১ গোলে হারিয়ে শিরোপা উঁচিয়ে ধরেছে বাংলাদেশ। লাল-সবুজদের হয়ে দুটি গোল করেছেন কৃষ্ণারাণী সরকার, অপর গোলটি করেছেন শামসুন্নাহার জুনিয়র।
গ্রুপপর্বে মেয়েদের সাফে টানা ৫ বারের চ্যাম্পিয়ন ভারত, মালদ্বীপ ও পাকিস্তানকে পেয়েছিল গোলাম রব্বানি ছোটনের দল। নেপালে পা রেখেই ইতিবাচক ফুটবল খেলার কথা জানানো কোচের কথার মান প্রথম ম্যাচেই রাখেন শিষ্যরা। মালদ্বীপকে ৩-০ গোলে হারিয়ে শুভ সূচনা পায় লাল-সবুজের দল। জোড়া গোল করেন অধিনায়ক সাবিনা খাতুন। অন্য গোলটি মাসুরা পারভিনের থেকে আসে।
পরের ম্যাচে পাকিস্তানের জালে গোল উৎসবে মেতে ওঠে বাংলাদেশ। ৬-০ গোলের বড় ব্যবধানে জিতে যায় বাঘিনী দল। হ্যাটট্রিকের আনন্দে মাতেন অধিনায়ক সাবিনা খাতুন। একটি করে গোল পান মনিকা চাকমা, সিরাত জাহান স্বপ্না ও ঋতুপর্ণা চাকমা। এ ম্যাচে প্রতিবার গোলের পর আঙুল দিয়ে ‘ট্রিগার’ উদযাপনে মেতে নজর কেড়েছিল ফুটবলাররা। মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি মনে করিয়ে দিতেই তারা করেছিলেন এমন উদযাপন।
পাকিস্তানের বিপক্ষে জয়ে এক ম্যাচ হাতে রেখেই বাংলাদেশ কেটে ফেলে সেমিফাইনালের টিকিট। গ্রুপপর্বের শেষ ম্যাচে প্রতিপক্ষ ছিল আগের ৫ আসরের সবকটিতে চ্যাম্পিয়ন ভারত। প্রতিপক্ষ কতটা শক্তিশালী তা বোঝাতে এটুকুই যথেষ্ট নয়! ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে মেয়েদের ফুটবলে ভারতের অবস্থান ৫৮তম, সেখানে ১৪৭তম স্থানে বাংলাদেশ। ৮৯ ধাপ এগিয়ে থাকা দলটির সঙ্গে আগের ১০ বারের দেখায় ৯ বারই জুটেছিল হার। একবার মাত্র ড্রয়ের অতীত থাকলেও জয় ছিল অধরা।
তবে ১৩ সেপ্টেম্বর ভিন্ন এক চিত্রনাট্যই লিখেছে বাংলাদেশ। অনিন্দ্য সুন্দর ফুটবলের সফল মঞ্চায়ন করেন ফুটবলের অগ্নিকন্যারা। গ্রুপ শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে শক্তিশালী দলটিকে পুরো ম্যাচে পাত্তাই দেয়নি তারা। প্রতিবেশীদের ৩-০ গোলে উড়িয়ে দেয় আক্রমণাত্মক ফুটবল উপহার দিয়ে। লাল-সবুজদের হয়ে জোড়া গোল করেন সিরাত জাহান স্বপ্না, একটি গোল করেন কৃষ্ণারাণী সরকার।
ম্যাচ শেষে বাংলাদেশের ফুটবলাররা মাঠের মাঝে গিয়ে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ান। সবাই হাঁটু গেড়ে মাথা নত করেন। সংবাদ সম্মেলনে কৃষ্ণারাণী সরকার এমন অসাধারণ জয়ের পর বলেছিলেন, ‘ভারত এশিয়ার অনেক শক্তিশালী দল। তাদের হারিয়ে বাংলাদেশি হিসেবে আমরা গর্বিত। আমরা ভারতকে হারিয়েছি এটাই মূল বিষয়’
সেমিতে অপেক্ষাকৃত সহজ প্রতিপক্ষ ভুটানকে পেলেও সমীহই করেছিল গোলাম রব্বানি ছোটনের দল। র্যাঙ্কিংয়ে ২৯ ধাপ এগিয়ে থাকা প্রমাণ করছিল শক্তি-সামর্থ্যে যোজন পার্থক্য। গ্রুপপর্বে তিন ম্যাচের সবকটিতে দাপুটে জয় তুলে নেয়া দলটি মুখের কথায় নয়, মাঠের খেলায় নিজেদের টপ ফেভারিট প্রমাণে মরিয়া ছিল।
ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে বল দখল, আক্রমণ কিংবা গোলে শট- ভুটানকে সব বিভাগে উড়িয়ে দেয় বাংলাদেশ। আসরে অধিনায়ক সাবিনা খাতুনের দ্বিতীয় হ্যাটট্রিকে ৮-০ গোলের উড়ন্ত জয়ে শিরোপার মঞ্চে পা রাখে ছোটনের মেয়েরা। বাকিদের মধ্যে একটি করে গোল করেন সিরাত জাহান স্বপ্না, কৃষ্ণারাণী সরকার, ঋতুপর্ণা চাকমা, মাসুরা পারভিন ও তহুরা খাতুন। বড় জয়ের পরও কোচ ছোটন ম্যাচ পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে সাফ বলে দেন, ‘প্রথম লক্ষ্য ছিল ফাইনাল, সেটা পূরণ হয়েছে। এখন ট্রফি জিততে চাই। এরপর উদযাপন করতে চাই।’
সোমবার দশরথ রঙ্গশালায় এলো সেই উদযাপনের ক্ষণ। স্বাগতিক নেপালকে ৩-১ গোলে হারিয়ে শিরোপা উঁচিয়ে ধরেছে বাংলাদেশ। মেয়েদের সাফে লাল-সবুজদের প্রথম শিরোপা।








