বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও এফবিসিসিআই এর সাবেক প্রেসিডেন্ট আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেছেন, ব্যাংকিং সেক্টর খারাপ থাকলে ব্যবসা-বাণিজ্য কিংবা অর্থনীতির সাথে যুক্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
রাজু আলীমের পরিকল্পনা এবং প্রযোজনায় চ্যানেল আইয়ের বিশেষ অনুষ্ঠান টু দ্য পয়েন্ট এ এসেছিলেন বিএনপির ভাইস প্রেসিডেন্ট আবদুল আউয়াল মিন্টু। অনুষ্ঠানে তার সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন রিজভী নেওয়াজ।
বিগত সরকারের আর্থিক অনিয়ম এবং দুর্নীতি এরই মধ্যে ছাড়িয়ে গেছে অতীতের সব রেকর্ড। কেবলমাত্র ইসলামী ব্যাংক থেকেই ব্যবসায়ী এস আলম প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকা নিয়েছে বলে অভিযোগ। যার প্রায় পুরোটাই বর্তমানে বেহাত অথবা দেশের বাইরে। বিপুল পরিমাণ এই অর্থ ফিরিয়ে আনার বিষয়ে প্রশ্ন করা হয় আবদুল আউয়াল মিন্টুকে।
তিনি বলেন, ইসলামী ব্যাংক বর্তমানে খুব ভালো অবস্থায় আছে এমন কোন তথ্য আমার কাছে নেই। সরকার পালিয়ে যাবার আগে বাংলাদেশ ব্যাংক ইসলামী ব্যাংককে প্রায় ৫ থেকে ৬ হাজার কোটি দিয়েছিল। সেই টাকার বিনিময়ে তার ডলার দেয়ার কথা। সেই ডলার দেয়া হয়েছে কিনা আমি জানি না। যদি ভালো করে তো ভালো। আমরাও চাই সব ব্যাংক ভালো করুক। কারণ ব্যাংক যদি খারাপ হয় তখন অর্থনীতি খারাপ হয়। ব্যাংক যদি খারাপ হয়, দেশে মানুষ যারা ব্যাংকে টাকা সঞ্চয় করেছে তাদের জন্য একটা সমস্যা সংকুল ব্যপার।
আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, লুটপাট আপনি কোন দৃষ্টিতে বলছেন আমি জানি না। ব্যাংকের কাছ থেকে ঋণের নামে টাকা লুট করে নিয়ে গেছে। গত ১০ বছরে প্রত্যেকটি খাতে এক ধরণের দুর্বৃত্তায়িত রাজনীতির চালু হয়েছিল। তাদের আমরা পলিটিক্যাল ক্রিমিনাল বলি। তাদের সাথে নতুন একটা গোষ্ঠি সৃষ্টি হয়েছে, স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠি। একদিক দিয়ে তারা ব্যবসাকে পলিটিসাইজ করেছে। অর্থাৎ ব্যবসা করার নামে লুটপাট করেছে।
দুই, তাদেরই সমর্থক গোষ্ঠি এর সাথে যুক্ত হয়েছে। তারা দেশের জন্য কোন সম্পদ না গড়ে তারা নিজেরা সম্পদের মালিক হয়ে গেছে। দেশে আসলে দুই ধরণের মানুষ ছিল। এক যারা শ্রম দিয়ে কষ্ট করে সম্পদ সৃষ্টি করেছে, আরেক গোষ্ঠি সেই সম্পদ লুট করেছে। একদিকে সরকারি ট্রেজারি থেকে অর্থ লুট করেছে, আরেকদিকে ব্যাংক থেকেও অর্থ লুট করেছে। অর্থাৎ দুই দিক দিয়েই লুটপাট করেছে।
দেশে কোনো ধরণের বিনিয়োগ ছাড়াই কিছু মানুষ বিপুল পরিমাণ অর্থ লুটে নেয়া প্রসঙ্গে আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, দুই ধরণের লুটপাটই খারাপ। তবে সবচেয়ে বেশি খারাপ যারা কোন ধরণের বিনিয়োগ ছাড়াই দেশের অর্থ নিয়ে বিদেশে পাচার করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এবং তাদের মিনিস্ট্রি এবং সরকার চেষ্টা করছে যারা বাইরে টাকা পাচার করেছে সেই টাকা দেশে ফিরিয়ে নিয়ে আসতে।
যদিও তারা বলছেন যে আমরা টাকা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছি কিন্তু এটার সাথে তো অন্য দেশও জড়িত। অন্য দেশের আইন জড়িত, আন্তর্জাতিক আইন জড়িত।

অতীতে যেসব ব্যাংকে লুটপাট বেশি হয়েছে সে ব্যাংকগুলোকে আমরা অডিট করছি। অডিট করে আমরা দেখছি কোথায় কোথায় চুরি হয়েছে। যখন অডিট শেষ হবে তখন আমরা বুঝতে পারবো কোন ব্যাংক থেকে কত টাকা চুরি হয়েছে।
সংস্কার প্রসঙ্গে আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, এ সরকারকে ধরতে পারেন জন সমর্থিত সরকার। তাকে আমরাও সাপোর্ট দিয়েছি। তারা বহুমাত্রিক সংস্কারের কথা বলছেন। সংস্কারে আমরাও বিশ্বাস করি। আপনারা যদি বিএনপির দিকে তাকান দেখতে পাবেন এখন থেকে ৫ বছর আগে বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন ভিশন ২০৩০ আবার এক দেড় বছর আগে বিএনপি থেকে ২৭ দফার একটা সংস্কার প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে বিভিন্ন দলের সাথে একত্রিত হয়ে কথা বলে ঐক্যমত্যের মাধ্যমে ৩১ দফা হিসেবে জনগনের সামনে উপস্থিত করা হয়েছে। সঙ্কার আমরা সবাই চাই। আইন কানুন থেকে শুরু করে বিধিবিধানের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত আমাদের সংস্কার প্রয়োজন। এর অন্যতম কারণ প্রতিটি প্রজন্ম আগের প্রজন্মের চেয়ে এগিয়ে। নতুন নতুন প্রযুক্তি সংযোজন করা হয়েছে। এই নতুনত্বে নতুন প্রজন্ম আমাদের চেয়ে অনেক এগিয়ে। এ জন্য জীবনমান পরিবর্তনের সাথে সাথে যদি পরিবর্তন না আসে তবে সে সমাজ পিছিয়ে যায়।
গত ১৪-১৫ বছরে আমাদের দেশে কোন খাতেই কোন সংস্কার হয় নাই।
আপনারা যারা এই মুহূর্তে দেশকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, ব্যবসায়ী সমাজ। সংস্কারে আন্তরীকতা নিয়ে কী আপনাদের কোন সংশয় সৃষ্টি হয়েছে? এমন প্রশ্নের উত্তরে আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, সংস্কার নিয়ে আমরা কোন প্রশ্ন করি না। ক্ষমতাকে নিয়ে করি। কিছু সংস্কার প্রাতিষ্ঠানিক, কিছু সংস্কার শিক্ষা খাতে, স্বাস্থ্য খাতের সংস্কার অথবা দুদকের সংস্কার, এগুলো আমাদের কোন সমস্যা নাই।
কিন্তু যখনই আপনি ইলেকশনের সংস্কার নিয়ে কথা বলতে যাবেন তখনই এখানে সাংবিধানিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা প্রয়োজন পরবে। আর সাংবিধানিক সংস্কার করতে গেলে তো জনপ্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে করতে হবে। সেটি তো এই সরকারের নেই।
এটি একটি বিপ্লবের মাধ্যমে সংগঠিত সরকার। যার সমর্থন আপনারাও করেছেন। তাদের সাথে তো সাধারণ জনতার সমর্থনও তো ছিল, এমন প্রশ্নের প্রেক্ষিতে তিনি বলেন, দেখেন, যারা ক্যু করে ক্ষমতায় আসে তারাও তো ছিল। যে জনগণ মাঠে আসলো, তারাই যে সরকার গঠন করে ক্ষমতায় থাকবে বিষয়টা তো এমন না। আমরা এখনো তাদের সমর্থন করে আসছি। যা তাদের বৈধতা দিয়েছে। কিন্তু সেই বৈধতা কত দিনের? এর তো একটা প্যারামিটার লাগবে। এ জন্যই আমরা বলছি আপনারা সফল হোন। কিন্তু সফলতার জন্য, আপনারা সকল রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে বসে একটি ঐক্যমত্যে আসেন। কোন কোন সংস্কারগুলো এখন করা যাবে। কোনগুলো আপনি পরে করবেন।
২০০৭ এ যে সরকার ছিল তারা ১৯০টা আইন সংস্কার করেছে। পতিত সরকার কথা দিয়েছিল পার্লামেন্ট বসলে তারা এই আইনগুলো পাস করে দিবে। কিন্তু এই ১৯০টার ভিতরে মাত্র ৬টা আইন পাস করেছে। আমরা বিএনপির পক্ষ থেকে এই সরকারকে এখনো সমর্থন দিচ্ছি এবং দিয়ে যাব। কিন্তু বিএনপিকে গত ১৭ বছরে হত্যা, নির্যাতন, জেল জুলুম, সহ্য করতে হয়েছে। শুধু একটা অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য। কিন্তু সেই দাবি তো এখনও পূরণ হয়নি আমাদের।

সম্মিলিত ছাত্র জনতা বলছে, কেবল নির্বাচনের জন্য তারা জীবন দেননি। তারা নির্বাচনকে ততটা গুরুত্ব দিয়ে দেখছে না। আল জাজিরায় দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, এই সরকারের চার বছর বা এর কম সময় লাগতে পারে। এ বিষয়টিকে আপনারা কিভাবে দেখছেন?
যদি কেউ বলে থাকে শুধু নির্বাচনের জন্য কেউ জীবন দেয়নি। সেটা তার অথবা তাদের ব্যক্তিগত মতামত হতে পারে। আর যদি তাদের কথা ধরেন, তারা কী বলতে পারে যে আমরা রাস্তায় একটা আন্দোলন করে আসছি। সে কারণে এই দেশে আর গণতান্ত্রিক সরকার প্রয়োজন নাই? নির্বাচনের দরকার নাই? এটাও আমি জানি না। প্রধান উপদেষ্টা জাতির উদ্দেশে একটা ভাষণ দিয়েছেন। সে ভাষণে তিনি চার বছর ক্ষমতায় থাকার কথা কিছু বলেন নাই। তবে আমার একটা বিষয় মনে হয়, তারা ৪ বছর ক্ষমতায় থাকতে চাইলেও খুব সম্ভবত তারা ৪ বছর ক্ষমতায় থাকতে পারবেন না।
এই ধারণার ভিত্তি বহু মাত্রিক। কারণ একটা রাষ্ট্র কখনো রাজনীতি ছাড়া থাকতে পারে না। একটা দেশ চলে রাজনীতির মাধ্যমে। সেই রাজনীতিকে পরিচালনা করে রাজনৈতিক দল। আমরা বলি জনগণ ক্ষমতার মালিক। কিন্তু আমি যদি গিয়ে বলি, যে আমি সাধারণ জনগণ, আপনারা তো আমাকে পাবনায় পাঠায় দিবেন। জনগণ তাদের মালিকানা দেখায় যেকোন একটি রাজনৈতিক দলকে অনুসরণ করে। অর্থাৎ যদি আমার মতধারার কোন রাজনৈতিক দল থাকে সেই রাজনৈতিক দলের মাধ্যমে আমি আমার রাজনীতির চিন্তাধারাকে প্রতিফলন করতে পারি।
ফলে যখনই একজন ব্যক্তি তার রাজনৈতিক চিন্তাধারাকে প্রতিফলন করার জায়গা পাবে না। তখনই তার মধ্যে বহুমাত্রিক প্রতিক্রিয়া তৈরী হবে।
দ্বিতীয়ত, সরকার পরিচালনার একটা বিষয় আছে। এই যে এখন সরকার চলছে, কিভাবে চালানো হচ্ছে, একটু বাইরে গিয়ে দেখেন! আমি যদি বলি তাহলে অনেকেই অনেক কথাই বলতে পারে।
তৃতীয়ত হলো অর্থনীতি। এখন পর্যন্ত অর্থনীতি কতটুকু এগিয়ে আমি জানি না। দেশের বিনিয়োগ পারিস্থিতি ভালো না। অর্থনীতিতে অস্থিরতা চলছেই। কাজেই তারা যদি ৪ বছর ক্ষমতায় থাকেও আর আমরা যদি সমর্থনও দেই তবুও তারা অসমর্থ হবে ক্ষমতায় থাকতে। উনাদের এখন একটা ভালো পথ আছে। যদি তারা এখন নির্বাচনের একটা রোডম্যাপ দেন তবে সামনের দিকে এটা ইতিবাচক ফলাফল আসবে।
অর্থনীতিতে ভালো দিক আসার কথা থাকলেও আমরা দেখছি খেলাপী ঋণের পরিমাণ বাড়ছে। ব্যাংকের সার্কুলার জারি করা হয়েছে, জরুরি পণ্য আনার জন্য এলসি খোলা যায়। কিন্তু তার পরেও অনেকে পারছেন না। বিভিন্ন কারণে। অন্যদিকে যদি আপনি ঋণ খেলাপীর কথা বলেন তাহলে যদি অর্থনীতি ভালো হয় তবে কী ঋণ খেলাপী বেশি হয়? অর্থনীতিতে যদি কোন ঘাটতি হয়, উৎপাদনে যদি ঘাটতি হয়, মানুষ যদি উৎপাদন তরে ঠিক মতো বিক্রি না করতে পারে তবে মানুষ ব্যাংকে টাকা কিভাবে দিবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক মুদ্রাস্ফিতি কমাতে এবং অর্থনৈতিক জটিলতা কাটাতে বাংলাদেশ ব্যাংক সুদের হারে একটা নীতি প্রণয়ন করেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক মুদ্রা সংকোচন নীতিও পালন করছে। এই বিষয়ে আমার ব্যাক্তিগত কোন দ্বিমত নাই। এই অতি মাত্রায় মূদ্রানীতির ফলে দুটো জিনিস হচ্ছে। একটা আমাদেন উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে। আমাদের মূদ্রার মান গত কয়েক মাসে ৩০-৪০ ভাগ কমে গেছে, অন্যদিকে আমাদের শুল্কের হার বেশি। প্রতিটা জিনিসের উৎপাদন খরচ এখন বেড়ে গেছে। তাতেও কিন্তু উৎপাদন ব্যায় বাড়বে। আর তাতেও মূল্যস্ফিতি বাড়বে।
তিনি বলেন, আপনি যখনই অতি মাত্রায় মূদ্রা সংকোচন নীতিমালা মানবেন তারও একটা নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তো একদিক দিয়ে আপনি সুদের হার বাড়ালেন আরেকদিক দিয়ে মানি সাপ্লাই কমিয়ে দিয়েছেন। মানি সাপ্লাই কমাতে গিয়ে যদি সাপ্লাই চেইন বিঘ্নিত করেন তাহলেও তো মূল্যস্ফিতি হবে। এই জায়গাতে বাংলাদেশ ব্যাংক, সরকারে একটা সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ব্যালেন্স গ্রোথ এর জন্য। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এখনো যেন থাকে। সেই সাথে গ্রোথ ব্যালেন্স নিশ্চিত করতে সরকারের উচিৎ কতটুকু মূদ্রা সংকোচন নীতি প্রয়োজন তা নির্ধারণ করা।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







