মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওয়াশিংটন ডিসিতে আইনশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তা পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েনের ঘোষণা দেওয়ার পর দিন থেকে শহরের রাস্তায় ন্যাশনাল গার্ড-এর সৈন্যরা উপস্থিত হতে শুরু করেছে।
বুধবার (১৩ আগস্ট) আন্তর্জাতিক একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে এ নিয়ে বিশ্লেষণ শুরু হয়। এর আগে গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানীর আশপাশের নগর কেন্দ্র এবং পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে সাঁজোয়া যান দেখা গেছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প কেন শহরটিতে ন্যাশনাল গার্ড সদস্যদের মোতায়েন করলেন, ন্যাশনাল গার্ডের পরিচয় এবং তাদের কাজ সম্পর্কে বিশ্লেষণ করা যাক।
ন্যাশনাল গার্ড কী?
ন্যাশনাল গার্ড মূলত একটি দেশের সশস্ত্র বাহিনীর রিজার্ভ অংশ, যা একই সাথে রাজ্য এবং ফেডারেল সরকারের অধীনে কাজ করে। এটি সাধারণত অভ্যন্তরীণ দুর্যোগ বা জরুরি অবস্থার সময় মোতায়েন করা হয়, তবে আন্তর্জাতিকভাবে সামরিক অভিযানেও সহায়তা করতে পারে।
মার্কিন ন্যাশনাল গার্ডের দুটি শাখা রয়েছে- আর্মি ন্যাশনাল গার্ড এবং এয়ার ন্যাশনাল গার্ড। কোনো অঙ্গরাজ্যের গভর্নর ও প্রেসিডেন্ট- দুজনের অধীনেই কাজ করে এই বাহিনী।
মূলত ন্যাশনাল গার্ডের সদস্যরা মার্কিন সেনাবাহিনী ও বিমানবাহিনীর রিজার্ভ (সংরক্ষিত) সেনাদের অংশ। খণ্ডকালীন ভিত্তিতে কাজ করেন তারা। যুদ্ধ বা সহায়তা অভিযানের জন্য তাদের বিদেশে মোতায়েন করা হতে পারে। তবে সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ বিভিন্ন জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় কাজ করে ন্যাশনাল গার্ড।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গরাজ্য ও অঞ্চলের (ওয়াশিংটন ডিসিসহ) নিজস্ব ন্যাশনাল গার্ড বাহিনী রয়েছে। যেকোন সময় যেকোন অঙ্গরাজ্যের গভর্নর বা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েনের নির্দেশ দিতে পারেন। এই বৈশিষ্ট্যটি মার্কিন সামরিক বাহিনীর অন্যান্য শাখা থেকে ন্যাশনাল গার্ডকে আলাদা করে তুলেছে।
রাজধানীতে ন্যাশনাল গার্ড মোতায়নের কারণ
সোমবার (১১ আগস্ট) হোয়াইট হাউজে এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেছেন, ‘আমাদের রাজধানী শহর সহিংস অপরাধী দল ও রক্তপিপাসু অপরাধীতে ছেয়ে গেছে। দেশের রাজধানীকে অপরাধ, রক্তপাত, বিশৃঙ্খলা, অসচ্ছলতা- এমনকি তার চেয়ে খারাপ অবস্থা থেকে রক্ষা করার জন্য এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপের ঘোষণা দিচ্ছি।’

এরপর তিনি বলেন, ‘আমি ওয়াশিংটন ডিসিতে আইন, শৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তা পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন করছি এবং তাদের যথাযথভাবে কাজ করার অনুমতি দিতে যাচ্ছি।’
ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই আদেশে বলা হয়, রাজধানী শহরে বাড়তে থাকা সহিংসতার ঘটনা এখন জরুরি পরিস্থিতি তৈরি করেছে। তা সরকারি কর্মচারী, সাধারণ মানুষ এবং পর্যটকদের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে, কেন্দ্রীয় সরকারের সুষ্ঠু কার্যক্রমে বাধা দিচ্ছে।
এতে আরও বলা হয়, অ্যাটর্নি জেনারেল নিয়মিত প্রেসিডেন্টকে ডিস্ট্রিক্ট অব কলম্বিয়ায় বিদ্যমান জরুরি পরিস্থিতি সম্পর্কে হালনাগাদ তথ্য দেবেন।
বিশ্লেষকরা কী বলছেন?
যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানীতে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা ব্যবহারের ট্রাম্পের এই দাবিকে ‘খুবই অস্বাভাবিক’ বলে অভিহিত করেছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। সংস্থাটি বলছে, এ পদক্ষেপ নিতে গিয়ে ট্রাম্প ওয়াশিংটন ডিসির নির্বাচিত নেতাদেরও পাশ কাটিয়েছেন।
এই মেয়াদে তিনি প্রচলিত রাজনৈতিক রীতিনীতির অবজ্ঞা করে নির্বাহী কর্তৃত্ব প্রয়োগ করছেন যার নজির যুক্তরাষ্ট্রের আধুনিক ইতিহাসে তেমন একটা নেই বলেও উল্লেখ করা হয়।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ওয়াশিংটন ডিসিকে আইনহীনতার কথিত ঢেউ থেকে ‘উদ্ধার’ করতে তার পদক্ষেপগুলোকে প্রয়োজনীয় বলে মনে করছেন। অথচ পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, ওয়াশিংটন ডিসিতে ২০২৩ সালে সহিংস অপরাধ বেড়ে যাওয়ার পর থেকে তা নাটকীয়ভাবে হ্রাস পেয়েছে।
অন্যদিকে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়, ওয়াশিংটন ডিসিতে সাম্প্রতিক এক হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ট্রাম্পের এই পদক্ষেপের সূত্রপাত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি দক্ষতা বিভাগের (ডিওজিই) সাবেক কর্মী এডওয়ার্ড কোরিস্টিনের ওপর এ হামলা হয়। কোরিস্টিন হলেন শীর্ষ ধনী ইলন মাস্কের ঘনিষ্ঠ সহযোগী। মাস্ক একসময় ডিওজিইর নেতৃত্ব দিয়েছেন।
পুলিশ বলছে, ৩ আগস্ট ভোরে ১৯ বছর বয়সী কোরিস্টিন ও তার সঙ্গীর ওপর ১০ কিশোর হামলা চালায়। পরে ১৫ বছর বয়সী দুই কিশোরকে গ্রেপ্তার করে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়।
হামলার কয়েক দিন পর নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ ট্রাম্প লিখেছেন, ডিসি যদি দ্রুত পরিস্থিতি সামাল না দেয়, তাহলে আমাদের আর কোনো উপায় থাকবে না। আমরা শহরটিকে কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসব এবং যেমনভাবে শহরটি চালানো উচিত, তেমনভাবে চালাব।
ন্যাশনাল গার্ডের কাজ কী হবে?
মার্কিন সেনাবাহিনীর বিবৃতি অনুযায়ী, যেকোন মুহূর্তে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহযোগিতার জন্য ১০০-২০০ ন্যাশনাল গার্ড সেনা প্রস্তুত থাকবে। প্রশাসনিক কাজ, জিনিসপত্র সরবরাহ এবং মাঠে উপস্থিত থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহযোগিতাসহ বিভিন্ন কাজ করবে তারা।
টাইটেল থার্টি টু স্ট্যাটাস অনুসারে ন্যাশনাল গার্ড পরিচালিত হয়; অর্থাৎ তারা স্থানীয় সরকারের অধীনে পরিচালিত হবে। তবে তাদের তহবিল জোগাবে কেন্দ্রীয় সরকার। এক্ষেত্রে তারা পসি কমিট্যাটাস আইন মেনে চলতে বাধ্য। এ আইনে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সদস্যদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে যুক্ত হওয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, চলতি সপ্তাহে ন্যাশনাল গার্ডের সেনারা ওয়াশিংটন ডিসিতে যাওয়া শুরু করবেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের কাজ হলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশে থাকা।’








