জামায়াত-নিয়ন্ত্রিত ইবনে সিনা হাসপাতাল থেকে কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে ডা. এ কে এম আহসান হাবীব নাফি। তার দাবি, জামায়াত-শিবির বিরোধী লেখালেখি এবং ব্যারিস্টার আরমানের একটি সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে প্রদত্ত মতামতের বিরুদ্ধে অবস্থানের কারণেই তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে তিনি বলেন, আমার কলম বিগত ফ্যাসিস্ট সময়েও থামেনি, এখনও থামবে না।
বৃহস্পতিবার ১১ ডিসেম্বর দীর্ঘ এক ফেসবুক পোস্টে এই দাবি করেন তিনি।
এরআগে তাকে ইবনে সিনা হাসপাতাল থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। সেখানে বলা হয়, আপনাকে ইবনে সিনা হাসপাতাল ধানমন্ডি ইউনিটে আর প্রয়োজন না থাকায় ইবনে সিনা ট্রাস্ট চাকরি চুক্তির শর্ত মোতাবেক নোটিশ পেরিয়ড প্রদান করে ১১ ডিসেম্বর থেকে চাকরি অবসানের সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। এতে আপনার শেষ কর্মদিবস হবে ১০ ডিসেম্বর।
এরপর আহসান হাবীব নাফি দীর্ঘ এক ফেসবুক স্ট্যাটাস দেন। সেখানে তিনি লিখেন, আমি ডা. এ কে এম আহসান হাবীব নাফি। একজন চিকিৎসক হিসেবে ইন্টার্নশিপ সম্পন্ন করে ইবনে সিনা হাসপাতালে পেশাগত জীবন শুরু করি। একই সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে আমি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) আদর্শে বিশ্বাসী এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, এনাম মেডিকেল কলেজ শাখার সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি।
তিনি লিখেন, স্কুল জীবন থেকেই আমি ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে কলম ধরেছি। মত প্রকাশের এই ধারাবাহিকতায় বহুবার নানারকন অজানা চাপ ও ঝামেলার মুখোমুখি হয়েছি। তবু অন্যায়ের বিরুদ্ধে লেখালেখি কখনো থামাইনি। বড় কোনো শারীরিক বা আইনি বিপর্যয়ে না পড়লেও এসব অভিজ্ঞতা আমাকে আরও সচেতন ও দৃঢ় করেছে।
পোস্টে তিনি লিখেন, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের গণআন্দোলনে সরাসরি যুক্ত থাকার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। বিশেষ করে ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে দেশে নানান মতাদর্শ ও রাজনৈতিক চিন্তার উত্থান আমরা প্রত্যক্ষ করছি। এই প্রেক্ষাপটে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি ১৯৭১ এবং ২০২৪ আমাদের জাতির ইতিহাসে আত্মিকভাবে সংযুক্ত। একটিকে অস্বীকার করে অন্যটিকে ধারণ করা মানে জাতিকে এক পায়ে পঙ্গু করে রাখা।
তিনি আরও লিখেন, পেশাগত জীবনে আমি সর্বদা নীতি ও দায়িত্বকে অগ্রাধিকার দিয়েছি। আমার রাজনৈতিক মতাদর্শ ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু কর্মস্থলে আমি কখনোই তার প্রভাব ফেলতে দেইনি। চিকিৎসক হিসেবে রোগীর প্রতি দায়িত্ব পালনে আমার জ্ঞান, সততা ও পেশাদারিত্বের সর্বোচ্চ প্রয়োগ করেছি। অথচ আজ হঠাৎ করেই আমাকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই। কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দিতে পারেনি। নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র থেকে জানতে পেরেছি, জামায়াত-শিবির বিরোধী লেখালেখি এবং ব্যারিস্টার আরমানের একটি সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে প্রদত্ত মতামতের বিরুদ্ধে অবস্থানের কারণেই আমাকে এই সিদ্ধান্তের শিকার হতে হয়েছে যার প্রমাণ আমার কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।
নিঃসন্দেহে এটি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং তারা তাদের আইন অনুসারে চাইলে আমাকে অব্যাহতি দিতে পারে। কিন্তু কোনো কারণ না দেখিয়ে, মতাদর্শগত ভিন্নতাকে অজুহাত বানিয়ে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া নৈতিকতা ও গণতান্ত্রিক চর্চার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
৫ আগস্টের পর যখন মানুষ নতুন করে মত প্রকাশের স্বাধীনতা ফিরে পাওয়ার স্বপ্ন দেখছে, ঠিক তখনই একটি অদৃশ্য শক্তি সেই স্বাধীনতাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে পুরনো ফ্যাসিবাদী কায়দায় দমন-পীড়ন চালাতে চাইছে। তারই একটি নগ্ন উদাহরণ আজ আমার সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনা। দুঃখজনক হলেও সত্য আজ আমাকে জামায়াত-নিয়ন্ত্রিত ইবনে সিনা হাসপাতাল থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
পোস্টে তিনি বলেন, যখন বাংলাদেশের গণমানুষের দল বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান নিজে তাঁর বিরুদ্ধে মিম, ব্যঙ্গ ও সমালোচনাকে উদার গণতান্ত্রিক দৃষ্টান্ত হিসেবে গ্রহণ করেন, তখন একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কোনো সমালোচনা করা যাবে না এমন দাবি কোন ধরনের রাজনৈতিক দেউলিয়ত্বের পরিচয় বহন করে? এই দেউলিয়ত্ব নিয়েই যদি তারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার স্বপ্ন দেখে, তবে ক্ষমতায় গেলে কী ধরনের কালো আইন, বাকরোধী শাসন ও মতাদর্শিক নিপীড়ন চালু হবে তা বোঝার জন্য খুব বেশি দূর তাকাতে হয় না।
আমি আমার কলম থামাবো না। বিগত ফ্যাসিস্ট সময়েও আমার কলম থামেনি এখনও থামবে না। আমি সত্য বলবো, কিন্তু আমি আমার মোরাল এথিক্স বিক্রি করব না। আমি অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াবো আজ, আগামীকাল এবং যতদিন প্রয়োজন। ইনশাআল্লাহ ভবিষ্যতে বাংলাদেশে এর বিচার জনগণ করবে।







