জাতীয় নির্বাচনের ন্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন নিয়েও এখন পুরো দেশে চলছে আলোচনা। এরই মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীরা হল ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের দাবীতে প্রতিবাদ-বিক্ষোভের পর কর্তৃপক্ষ আবাসিক হলে ‘প্রকাশ্য ও গুপ্ত’ রাজনীতি নিষিদ্ধ করেছে। এরপর থেকে শুরু হয়েছে এই সিদ্ধান্তের পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর সহযোগী অধ্যাপক সাইফুদ্দিন আহমেদ চ্যানেল আই অনলাইনের সাথে আলাপকালে বলেন, ছাত্র সংগঠনের নেতৃবৃন্দের সাথে আমরা বসেছি এবং এই বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সমাধানের মাধ্যমে ডাকসু নির্বাচন যথাসময়ে আয়োজনের পরিকল্পনা করছি।
তিনি বলেন, আমরা আজকে ছাত্র সংগঠনের সাথে আলোচনা করেছি। ডাকসু নির্বাচন সময়ে হলগুলোতে কিভাবে ছাত্র সংগঠনগুলো কার্যক্রম পরিচালনা করবে, তা নিয়ে মূলত আজকের বৈঠক। কারণ, হলগুলোতে রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকলেও অধিকাংশ শিক্ষার্থী কোনো না কোনো রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত থাকে। সেজন্য আমাদের নির্ধারিত আচরণবিধি থাকলেও সংগঠনগুলোর সাথে আলোচনা করা জরুরি।
তিনি বলেন, সংগঠনের নেতৃত্বে থাকা সকলেই গঠনমূলক আলোচনা করেছে। বিশেষ করে, অধিকাংশ সংগঠনের নেতারা আমাদের আশ্বস্ত করেছেন, তারা আগের সংগঠনগুলোর মতো কোনো বলপ্রয়োগমূলক কর্মকাণ্ড করবেন না। সুতরাং হলের শিক্ষার্থীদের সেই ভীতির জায়গাটা দূর হবে বলে বিশ্বাস করছি।
এসময় আসন্ন ডাকসু নির্বাচন যথাসময়ে আয়োজন করতে পারবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখনো যে সময় বাকি আছে, এর মধ্যে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মতামত নিয়ে একটি সুনির্দ্দিষ্ট সমাধানে পৌঁছাতে পারবো।
হলগুলোতে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের কারণ হিসেবে তিনি বলেন, মূলত হলগুলোতে রাজনৈতিক সংগঠনগুলো নিজেদের মতো কার্যক্রম পরিচালনা করলে দ্বন্দ্ব হওয়ার একটা সম্ভাবনা থেকে যায়। আমরা এই দ্বন্দ্ব চাই না বলেই ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করেছি।
দেশের ‘দ্বিতীয় সংসদ’ খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই দেশ ও জাতির নানা আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা নিয়ে আবির্ভূত হয়েছে। শিক্ষার্থীদের নানা দাবি-দাওয়া, আশা-আকাঙ্ক্ষার মূর্ত প্রতীক এই ডাকসু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে। তপসিল ঘোষণার পরপরই শিক্ষার্থীদের মধ্যে নির্বাচনি আমেজ দেখা যাচ্ছে।
আবাসিক হলগুলোতে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ হওয়ার বিষয়টি শিক্ষার্থীদের মতপ্রকাশে বাধা হিসেবে দেখছেন ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সেক্রেটারি নাহিদুজ্জামান শিপন। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এমন বক্তব্য দেয়ার মতো কোনো সুযোগ নেই। কারণ এটা রাজনৈতিক মত প্রকাশে বাধা তৈরি করা। এছাড়াও এটা সাংবিধানিক লঙ্ঘনও বটে। তারা মূলত বিশেষ পরিস্থিতে এমন বক্তব্য দিয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
ছাত্রদল সেক্রেটারি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এমন বক্তব্য অযৌক্তিক অনুধাবন করে ছাত্রসংগঠনগুলোর সাথে আলোচনায় বসেছে। পরবর্তীতে আবারও আলোচনা হবে বলে জানানো হয়েছে।
নির্বাচনকে ঘিরে হলগুলোতে কার্যক্রম জরুরি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ডাকসু নির্বাচনকে ঘিরে আমরা হলগুলোতে কাজ করতে চাই। আর কাজ করতে গেলে আমাদের কমিটি প্রয়োজন। প্রশাসন যদি এভাবে বাধাগ্রস্ত করে, কিংবা কার্যক্রম করতে না দেয়, তাহলে সেটা আমাদের জন্য অবশ্যই অসুবিধার কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
ঢাবির ছাত্র ইউনিয়ন সভাপতি মেঘমল্লার বসু বলেন, হলগুলোতে রাজনীতি নিষিদ্ধ করার পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ডাকসু নির্বাচনের জন্য সামনে এগিয়ে যেতে পারবে বলে মনে করছি না। এই বিষয়টিতে একটা সমাধানে আসতে হবে। অন্যথায়, এই স্বল্প সময়ের মধ্যে নির্বাচনের আয়োজন বা প্রস্তুতি নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ থেকে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, এই বিষয়টি সমাধান করার জন্য যথেষ্ট সময়ের প্রয়োজন। আজকেও এটি নিয়ে সমাধানে পৌঁছানো যায়নি। এছাড়া শুধুমাত্র এই বিষয়কে কেন্দ্র করে কোনো একটা গ্রুপ সময়ক্ষেপণের মধ্য দিয়ে ডাকসু নির্বাচনকে বানচাল করারও পায়তারা করছে কি-না তা নিয়ে আমাদের মাঝে একটা শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
উল্লেখ্য, গত শুক্রবার সকালে বিএনপির সহযোগী সংগঠন ছাত্রদল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোর আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণার পর রাতে তুমুল বিক্ষোভ হয়েছে আবাসিক হলগুলোতে। এরপর রাতে হলগুলোতে মিছিল বের হতে শুরু করে এবং তাতে ‘ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের’ দাবিটি সামনে উঠে আসে।

পরে রাত ১টার দিকে রাজু ভাস্কর্য এলাকায় সমাবেশের পর বিক্ষোভকারীরা উপাচার্যের বাসভবনের সামনে অবস্থান নেন। এর ঘণ্টাখানেক পর প্রক্টরকে সাথে নিয়ে উপাচার্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ খান বাসভবনের সামনে এসে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন।
এ সময় তিনি বলেন, হল পর্যায়ে ছাত্ররাজনীতি নিয়ন্ত্রিত থাকবে। তখন উপস্থিত বিক্ষোভকারীরা তার প্রতিবাদ করে ‘না না’ বলে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি জানায়। একপর্যায়ে ছাত্ররাজনীতির বিষয়ে ২০২৪ সালের ১৭ জুলাই হল প্রভোস্টের নেওয়া সিদ্ধান্ত বহাল থাকবে বলে উল্লেখ করেন উপাচার্য।
এ সময় একটি ছাত্র সংগঠনের ‘গুপ্ত কমিটি’র বিষয়ে আপত্তি উঠলে প্রক্টর সাইফুদ্দীন আহমেদ স্পষ্টভাবে ঘোষণা দেন যে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলে ‘প্রকাশ্য ও গুপ্ত রাজনীতি’ নিষিদ্ধ থাকবে।







