আলু বেচো, ছোলা বেচো, বেচো বাকর খানি
বেচোনা বেচোনা বন্ধু তোমার চোখের মণি।কলা বেচো, কয়লা বেচো, বেচো মটরদানা
বুকের জ্বালা বুকেই জ্বলুক, কান্না বেচোনা।ঝিঙে বেচো পাঁচ সিকেতে, হাজার টাকায় সোনা
বন্ধু তোমার লাল টুকটুকে স্বপ্ন বেচোনা।
উপরের কথাগুলো কবি সমীর রায়ের। যা সুরারোপিত করে সফল গানে রূপদান করেছেন গণসংগীতশিল্পী প্রতুল মুখোপাধ্যায়। যার কণ্ঠে এই গান বিশেষ মাত্রা পেয়েছে বাঙালি শ্রোতা সাধারণের কাছে। গানটি নিয়ে অরুণকুমার বসু প্রশংসায় উন্মুখ হয়ে বলেছিলেন—‘বাংলা গানের রীতিবদলের প্রথাবদলের স্বাদবদলের একটি অধ্যায় যেন এই গানটিতে থমকে দাঁড়িয়ে আছে।’
শনিবার সকালে কলকাতার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় প্রয়াত হয়েছেন গুণী শিল্পী, গীতিকার ও সুরকার প্রতুল মুখোপাধ্যায়। তার মৃত্যুতে শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, বাংলাদেশের সংগীতেও শোকের ছায়া।
তার প্রয়াণে বাংলাদেশ উদীচী শোক প্রকাশ করে জানিয়েছে, “কোন ধরনের বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার না করে শুধু হাতে তালি দিয়ে গান গাওয়ার এক অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছিলেন প্রতুল মুখোপাধ্যায়। তিনি দেখিয়েছিলেন, শুধু মনের জোর আর কণ্ঠের বলিষ্ঠতাই গণসংগীত গাইবার জন্য যথেষ্ট। যেকোন ধরনের অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন সদা সোচ্চার। ২০১০ সালে উদীচী আয়োজিত দ্বিতীয় সত্যেন সেন গণসংগীত উৎসব ও জাতীয় গণসংগীত প্রতিযোগিতায় অতিথি হিসেবে আমন্ত্রিত হয়ে এসেছিলেন প্রতুল মুখোপাধ্যায়। সেবার ঢাকায় আসার পথেই তিনি রচনা করেন “দুইজনাই বাঙালি ছিলাম দেখো দেখি কাণ্ডখান, তুমি হইলা বাংলাদেশি আমারে কও ইন্ডিয়ান” শীর্ষক গানটি। এছাড়া, তাঁর অমর সৃষ্টি “আমি বাংলায় গান গাই” প্রতিটি প্রজন্মের শ্রোতাকেই দেশপ্রেমে নতুন করে দীক্ষিত করে তোলে। আলু-ছোলা বেচলেও চোখের মণি না বেচতে তাঁর যে আহ্বান, সেটি ধারণ করেই প্রগতির পথে অবিচল যাত্রা করে চলেছেন উদীচীর হাজারো তরুণ শিল্পী-কর্মী।”
সংস্কৃতি চর্চার সংগঠনগুলো শুধু নয়, প্রতুল মুখার্জীর প্রয়াণে শোক জানাচ্ছেন বাংলাদেশ ও ভারতের বহু পরিচিত মুখ। কেউ সংবাদ মাধ্যমে প্রতুলকে নিয়ে কথা বলছেন, আবার কেউ নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্মৃতিচারণ করছেন।
প্রয়াত গায়কের বাংলার প্রতি ভালোবাসার কথা উল্লেখ করে পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তী বলেন, “বেশি আলাপ না থাকলেও আমি প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের গানের শ্রোতা। তার কণ্ঠে ‘আমি বাংলায় গান গাই’ বিশেষ ভাবে পছন্দ করি। তিনি বাংলাকে খুবই ভালোবাসতেন। সবাই একে একে চলে যাচ্ছেন, এটা ভেবেই মনটা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। সকালে উঠেই মন খারাপ করা খবরটা পেলাম। কিছুই ভালো লাগছে না।”
প্রতুলের প্রয়াণে ভীষণই ভেঙে পড়েছেন কিংবদন্তীশিল্পী হৈমন্তী। বলেন, “কী বলি আর! ভালোবাসার ও ভালো লাগার মানুষগুলোকে হারিয়ে ফেলছি। আমার ভাইটা চলে গেল। এখন প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের মতো একজন সৎ গায়ককেও হারালাম। ভারী মিষ্টি মানুষ ছিলেন। আমাদের গান নিয়ে গল্প হয়েছে। কত অনুষ্ঠানে দেখা হয়েছে। ওর গানে বাংলার প্রতি টান অনুভব করেছি। তার গান শুনে বলতাম, ‘কী ভালো গাইলেন’, প্রতুলবাবু অবাক হয়ে হেসে বলতেন, ‘আমার কত সৌভাগ্য, হৈমন্তী শুক্লার আমার গান ভালো লেগেছে’। আমি লজ্জা পেতাম আর বলতাম, ‘এ সব আপনি কী বলছেন?’ সব কথাগুলো মনে পড়ে যাচ্ছে একে একে।”
রবীন্দ্রসঙ্গীত গায়িকা শ্রাবণী সেন জানান, প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে খুব বন্ধুত্ব না থাকলেও, তার গানের ভক্ত ছিলেন। বলেন, ‘খবরটা পেয়ে খারাপ লাগছে। চমৎকার গান গাইতেন। ভোলার নয়।’
অন্যদিকে গায়িকা লোপামুদ্রা মিত্রর মনটাও খারাপ। জানালেন, কলকাতা বইমেলায় তার সঙ্গে প্রথম আলাপ হয় প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের। বলেন, “মাঠে গান-বাজনা হতো। আমি খালি গলায় গান গাইতাম। তিনিও তাই। প্রতুলদার সঙ্গে আমার বয়সের তফাৎ অনেকটাই। কিন্তু আমরা কনটেম্পোরারি। তাঁর প্রচুর কবিতার গান আছে। সেটাও মিল আছে। আমাদের সম্পর্ক বহুকালের। বলতেন, বেণীমাধব গাওয়া ঠিক না। আমি বলতাম, এই গান আপনাকে শুনতেই হবে। ভীষণ হিট।”
নির্মাতা কাওসার চৌধুরী ফেসবুকে লিখেছেন,“ফিরে গেলেন প্রতুল মুখোপাধ্যায়। তিনি বাংলায় গাইতেন- বাঙলার গান। তিনি সুর বেঁধেছেন বাংলায়। স্বপ্ন দেখেছেন বাংলায়। তিনি বাংলায় ভেসেছেন, বাংলায় মেতেছেন, জেগে ছিলেন বাংলায়। ‘এই বাঙলার মায়াভরা পথে হেঁটে হেঁটে’ আজ তিনি চলে গেলেন ওপারে! তিনি সশরীরে আর কোনদিন বাঙালির মুখোমুখি হবেন না! দু’হাতে হালকা তালি বাজিয়ে অকল্পনীয় এক মায়া তৈরি করে তিনি কোনদিন আর গাইবেন না- ‘আমি বাংলায় ভালোবাসি-আমি বাংলাকে ভালোবাসি’। কিন্তু তার অনবদ্য অমর সৃষ্টি রয়ে গেলো আমাদের জন্য। আমরা বারবার প্রাণিত হবো তাকে দিয়ে, তার সৃষ্টি দিয়ে। তারই সুরে উচ্চারণ করবো- ‘আমি একবার দেখি, বার বার দেখি, দেখি বাংলার মুখ।’ প্রতুল, হে মান্যবর গুণী- ওপারে অনেক ভালো থাকুন আপনি। ওখানেও বাংলায় বলুন- ‘আমি বাংলায় দেখি স্বপ্ন, আমি বাংলায় বাঁধি সুর, আমি এই বাংলার মায়াভরা পথে হেঁটেছি এতটা দূর……’!”
অভিনেতা আহসান কবীর লিখেছেন,“বিদায়ী স্যালুট..শ্রদ্ধেয় প্রতুল মুখোপাধ্যায়…আমি বাংলায় গান গাই/‘বন্ধু তোমার লাল টুকটুকে স্বপ্ন বেচো না/হাতের কলম জনম দুঃখী তাকে বেচো না..’ ‘প্রভাত ফেরি প্রভাত ফেরি আমায় নিও সঙ্গে..’ আপনার স্বপ্ন সঙ্গে নিয়ে বেঁচে আছি। আর আপনি চলে গেলেন। বিদায়…”
প্রতুলকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করে ‘মেঘদল’ ব্যান্ডের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও ভোকাল শিবু কুমার শীল লিখেছেন দীর্ঘ লেখা। তারমধ্যে একটি অংশে তিনি লিখেছেন, ‘গিয়েছিলাম পাখির হাটে কিনেছিলাম পাখি বন্ধু তোমারই জন্যে, তোমারই জন্যে…’ এ গান শুনে কেঁপে উঠেছিলাম কারণ তখনও আমি জানতাম না প্রেমিক কত রকম হয়। তাছাড়া একটা প্রেমের গান লিখবার বাসনায় তখন ছটফট করছি। আমি আমার প্রেমিকাকে কিভাবে আমার গানে তুলে ধরব তা যেনো বুঝতেই পারছি না। কারণ ততদিনে বুঝতে শিখেছি এই দ্বন্দ-সংঘাতময় দুনিয়ায় কোনো কিছুই স্থীর অবিচল নয়। নিপিড়িত এই পৃথিবীর রৌদ্রছায়ায় আমি আমার প্রেমিকাকে শকুন্তলার মত করে আর ভাবতে পারছি না। তাহলে কি হবে সেই প্রেমিকার রূপ-উপমা। প্রতুলের গানের প্রেমিক সেই দ্বন্ধ ঘোচালো যে কিনা কখন পাখির হাটে, কখনও ফুলের হাটে ঘুরে ঘুরে, কখন লোহার হাটে গিয়ে ভারি শেকল কেনে প্রেমিকার পায়ে পড়াবে বলে কিন্তু তাঁর প্রেমিকাকে ততদিনে বাঁদির হাটে সে হারিয়ে ফেলেছে। তার ভারি শেকল, পাখি আর ফুল সকলই বৃথা হয়ে যায় তখন। এই এক গানে নারী জীবনের আখ্যাণ ও রাজনীতি যেভাবে বর্ণিত হয় তা বাংলা গানে নেই বললেই চলে। প্রতুল আফ্রিকার উপকথা থেকে এমন এক গান তুলে আনলেন বাংলা গানের সম্ভারে। আমরা সকলেই আমাদের প্রেমিকাদের হারিয়ে ফেলেছি সেই বাঁদির হাটে তা যেনো প্রতুলই প্রথম দেখিয়ে দিলেন। এই মহান বিপ্লবী-শিল্পী-কবির মৃত্য যেনো পাহাড়সম বেদনার হয়ে উঠেছে আজ।
প্রতুলের প্রয়াণে একাধিক পোস্ট করেছেন অভিনেত্রী শাহনাজ খুশী। ‘ঝিঁঙে বেচো পাঁচশিকেতে, হাজার টাকায় সোনা, বন্ধু তোমার লাল টুকটুকে স্বপ্ন বেচো না’। প্রিয় শিল্পীর প্রয়াণে জানিয়েছেন শ্রদ্ধা।
মৃত্যুর সংবাদ শেয়ার করে অভিনয়শিল্পী রওনক হাসান লিখেছেন,“বিদায় কিংবদন্তী প্রতুল মুখোপাধ্যায়। আমি বাংলায় গান গেয়েই যাবো…বাংলার গান গেয়েই যাবো!”
শিল্পী তানভীর আলম সজীব লিখেছেন,“কেবলই খালি গলায় গান শোনানোর শিল্পশৈলী এই মানুষটা (প্রতুল মুখোপাধ্যায়) জানতেন। ২০১৫ তে একই অনুষ্ঠানে গান গাইবার উপলক্ষে ক্ষণিকের সাক্ষাতে তোলা ছবি। এই স্মৃতিটা কিছু সুন্দর মুহূর্তের। শুনলাম উনি আজ পরপারের উদ্দেশ্যে রওনা করেছেন। উনার যাত্রা শুভ হোক, এই কামনা করা ছাড়া আর কিছুই করার নেই আপাতত।”
অভিনেতা ইমতিয়াজ বর্ষণ লিখেছেন,“স্বকীয়তায় উজ্জ্বল বাংলা গানের নতুন ধারার প্রবর্তক। অমর শিল্পী প্রতুল মুখোপাধ্যায় এর প্রয়াণে আমি শোকাহত। গভীর শোক ও শ্রদ্ধা জানাই।”







