রাজধানীর গুলশানের হোলি আর্টিজান রেস্টুরেন্টে জঙ্গি হামলার আট বছর পর মাঠে সাংগঠনিক কার্যক্রম না চালালেও থেমে নেই নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠনগুলোর কার্যক্রম। বর্তমানে উঠতি বয়সী কিশোরদের টার্গেট করে অনলাইনেও তারা সক্রিয় রয়েছে। এরই মধ্যে ১৮ থেকে ২০ বছর বয়সী তরুণ এবং মাদরাসার ছাত্র ও শিক্ষকদের দলে ভিড়িয়েছে তারা। এখন নতুন নতুন সব অ্যাপসে সদস্য সংগ্রহ, প্রচারণা, নিজেদের মধ্যে ট্রেনিং মডিউল শেয়ার করাসহ যাবতীয় কার্যক্রম চালাচ্ছে অনেকটা নির্বিঘ্নে।
কাউন্টার টেররিজম ও ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের (সিটিটিসি) একটি গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, জঙ্গিবাদে জড়ানো ৬৮ শতাংশের বয়স ১৫ থেকে ৩৪ বছর। আর ৮২ শতাংশই জঙ্গিবাদে জড়ায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।
সম্প্রতি কক্সবাজারে আস শাহাদাত নামের একটি জঙ্গি সংগঠনের পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেন গোয়েন্দারা। তাদের কাছে জানা গেছে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কৌশলগুলোকে মাথায় রেখে ভিন্ন কৌশলে যাচ্ছে জঙ্গিরা। কারাগার থেকেও তারা সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
পুলিশের সিটিটিসি ইউনিট ও র্যাবের গোয়েন্দা দল সূত্রে জানা গেছে, অনলাইনে এখনো জঙ্গি সংগঠনগুলোর দাওয়াতি কার্যক্রম চলছে। সদস্য সংগ্রহ ও উগ্রবাদী প্রচারও চলছে। সাংগঠনিক যোগাযোগের জন্য নিত্যনতুন অ্যাপস ব্যবহার করছে তারা। বর্তমানে নব্য জেএমপির আমির আমির মাহাদী হাসান জন তুরস্কে থেকে অনলাইনে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছেন।
পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের প্রধান (অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার) মো. আসাদুজ্জামান বলেন,আনসার আল ইসলাম এখনো হুমকি। জঙ্গিদের অনলাইন ও অফলাইন কার্যক্রম সব সময় নজরদারিতে রাখা হচ্ছে। তাদের অ্যাপসের বৈশিষ্ট্য এমন যে, কোনো রেকর্ড আমরা পাই না। তারপরও আমরা কাজ করে যাচ্ছি। সাইবার স্পেসকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে কাজ শুরু করেছি। আমাদের সার্বক্ষণিক অনলাইন সার্ভিলেন্স আছে। সেখান থেকে শনাক্ত করে বিভিন্ন সময় আইনের আওতায় আনতে সক্ষম হচ্ছি।
পাহাড়ি বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন কেএনএফের সঙ্গে একত্রিত হয়ে পাহাড়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণের মাধ্যমে দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত জঙ্গি সংগঠন জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বিয়ার আমির ও শীর্ষস্থানীয় নেতাসহ প্রায় শতাধিক জঙ্গিকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব। এ ছাড়া নিষিদ্ধঘোষিত আনসার আল ইসলাম ও হুজিসহ অন্যান্য জঙ্গি সংগঠনের কার্যক্রমের বিরুদ্ধে র্যাবের নিয়মিত নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।
র্যাব জানায়, সম্প্রতি বেশ কয়েকজন জঙ্গি সদস্যকে গ্রেপ্তার করে তারা জানতে পেরেছে, নতুন করে সংগঠনকে পুনরুজ্জীবিত করতে তারা কিশোর বয়সীদের রিক্রুট করছে। উঠতি বয়সী কিশোরদের অপব্যাখ্যা দিয়ে সহজে ব্রেন ওয়াশের মাধ্যমে ভুলপথে নেওয়া যায় বিধায় কোমলমতি কিশোরদের তারা প্রথমে টার্গেট করছে। এসব সদস্য নিয়ে এরই মধ্যে বিভিন্ন সময়ে তারা ধর্মীয় স্থাপনা, বাসা বা বিভিন্ন স্থানে গোপন সভা করেছে। গত ২৭ জুন কক্সবাজার সদরের চৌফলদণ্ডী থেকে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলামের তিন সক্রিয় সদস্যকে গ্রেপ্তার করে র্যাব।
র্যাবের মহাপরিচালক ব্যারিস্টার হারুন অর রশিদ বলেন, দেশ থেকে জঙ্গিবাদ পুরোপুরি নির্মূল না হলেও নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই আছে। যারা গোপনে তৎপরতা চালাচ্ছে, র্যাবের অভিযানে তারা গ্রেফতার হচ্ছে। জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়া নামে একটি জঙ্গি দল বান্দরবানের গহিন পাহাড়ি সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের (কেএনএফ) মাধ্যমে অস্ত্রের প্রশিক্ষণ নিতে গিয়েছিল। সেখান থেকে র্যাবের তৎপরতায় যৌথ বাহিনীর অভিযানে ৫৫ জনকে গ্রেপ্তার করে। অনেকে ভুল পথে যাওয়ায় তারা আত্মসমর্পণ করেছে।
এরই মধ্যে আনসার আল ইসলামের কর্মীরা যে আস শাহাদাত নামের সংগঠন করেছিল তাদের অনেককে প্রথমে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ এবং সর্বশেষ তিন দিন আগে কক্সবাজার থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর আগে গত বছর ১২ আগস্ট মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার পাহাড়ি এলাকার একটি বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ‘ইমাম মাহমুদের কাফেলা’ নামের নতুন একটি জঙ্গি দলের ৩৭ জনকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ।
ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার হাবিবুর রহমান বলেন, সব বাহিনীর আন্তরিক প্রচেষ্টায় দেশে জঙ্গিবাদ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। বড় ধরনের কোনো জঙ্গি হামলার হুমকি ও আশঙ্কা এখন নেই। হলি আর্টিজান হামলার পর সব জঙ্গির সক্ষমতা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদ ইনডেক্সের র্যাংকিংয়েও বাংলাদেশ এখন অনেক উন্নত দেশের চেয়ে নিরাপদ অবস্থানে আছে। সংঘবদ্ধ হয়ে জঙ্গিদের হামলার কোনো সুযোগ নেই।








