ফুটবল বিশ্বকাপ বরাবরই তরুণ প্রতিভাদের উত্থানের সবচেয়ে বড় মঞ্চ হিসেবে পরিচিত। তবে টুর্নামেন্টের ইতিহাসে এমন কিছু কিংবদন্তি ফুটবলার রয়েছেন, যারা বয়সকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে চল্লিশ পেরিয়েও বিশ্বমঞ্চে শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দিয়েছেন। অভিজ্ঞতা, কৌশল, বুদ্ধিমত্তা এবং অসাধারণ ফিটনেসের সমন্বয়ে তারা গড়েছেন অনন্য নজির।
বিশ্বকাপ ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বয়সে মাঠে নামার রেকর্ড মিশরের কিংবদন্তি গোলরক্ষক এসাম এল হাদারির দখলে। ২০১৮ সালে রাশিয়া বিশ্বকাপে সৌদি আরবের বিপক্ষে ম্যাচে তিনি মাঠে নামেন ৪৫ বছর ১৬১ দিন বয়সে। ম্যাচে একটি পেনাল্টি ঠেকিয়ে অসাধারণ নৈপুণ্যও দেখান। সেই পারফরম্যান্সের মাধ্যমে বিশ্বকাপের ইতিহাসে নিজের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখে রাখেন এল হাদারি।
এল হাদারির আগে সবচেয়ে বেশি বয়সে বিশ্বকাপে খেলার রেকর্ড ছিল কলম্বিয়ার গোলরক্ষক ফারিদ মন্দ্রাগনের। ২০১৪ ব্রাজিল বিশ্বকাপে জাপানের বিপক্ষে ম্যাচে বদলি হিসেবে মাঠে নেমেছিলেন তিনি, বয়স ছিল ৪৩ বছর ৩ দিন। বিশেষত্ব হল, এটি ছিল তার আগের বিশ্বকাপ ম্যাচের প্রায় ১৬ বছর পরের উপস্থিতি, যা বিশ্বকাপ ইতিহাসে দীর্ঘতম বিরতির রেকর্ডও।
গোলরক্ষকদের বাইরে সবচেয়ে বেশি বয়সে বিশ্বকাপে খেলার রেকর্ড এখনও ক্যামেরুনের কিংবদন্তি ফরোয়ার্ড রজার মিলারের দখলে। ১৯৯৪ যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপে রাশিয়ার বিপক্ষে গোল করে তিনি হয়ে যান বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বয়সী গোলদাতাও। তখন তার বয়স ছিল ৪২ বছর ৩৯ দিন। কর্নার ফ্ল্যাগের পাশে তার বিখ্যাত নৃত্য উদযাপন আজও ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতিতে অম্লান।
বিশ্বকাপের ‘ওভার-৪০’ ক্লাবে জায়গা করে নিয়েছেন ব্রিটেনের দুই কিংবদন্তি গোলরক্ষক। প্যাট জেনিংস ১৯৮৬ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের বিপক্ষে ৪১তম জন্মদিনে মাঠে নেমে অনন্য রেকর্ড গড়েন। অন্যদিকে ইংল্যান্ডের ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোলরক্ষক পিটার শিলটন ১৯৯০ বিশ্বকাপে ৪০ বছর ২৯২ দিন বয়সে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানেন।
বয়সকে জয় করার আলোচনায় ইতালির কিংবদন্তি অধিনায়ক ডিনো জফের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৯৮২ বিশ্বকাপ জয়ের সময় তার বয়স ছিল ৪০ বছর ১৩৩ দিন। এর মাধ্যমে তিনি বিশ্বকাপ ট্রফি জেতা সবচেয়ে বেশি বয়সী ফুটবলার হন। পশ্চিম জার্মানিকে ৩-১ গোলে হারিয়ে শিরোপা জয়ের সেই মুহূর্ত এখনও বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায়।
বিশ্বকাপে খেলা সবচেয়ে বেশি বয়সী ২০ ফুটবলার
১. এসাম এল হাদারি (মিশর) – ৪৫ বছর ১৬১ দিন
২. ফারিদ মন্দ্রাগন (কলম্বিয়া) – ৪৩ বছর ৩ দিন
৩. রজার মিলা (ক্যামেরুন) – ৪২ বছর ৩৯ দিন
৪. প্যাট জেনিংস (উত্তর আয়ারল্যান্ড) – ৪১ বছর
৫. পিটার শিলটন (ইংল্যান্ড) – ৪০ বছর ২৯২ দিন
৬. ডিনো জফ (ইতালি) – ৪০ বছর ১৩৩ দিন
৭. আলি বুমনিজেল (তিউনিসিয়া) – ৪০ বছর ৭১ দিন
৮. জিম লেইটন (স্কটল্যান্ড) – ৩৯ বছর ৩৩৪ দিন
৯. ডেভিড জেমস (ইংল্যান্ড) – ৩৯ বছর ৩৩০ দিন
১০. আতিবা হাচিনসন (কানাডা) – ৩৯ বছর ২৯৬ দিন
১১. পেপে (পর্তুগাল) – ৩৯ বছর ২৮৭ দিন
১২. অ্যাঞ্জেল লাব্রুনা (আর্জেন্টিনা) – ৩৯ বছর ২৬০ দিন
১৩. জোসেফ-অ্যান্টোইন বেল (ক্যামেরুন) – ৩৯ বছর ২৫৯ দিন
১৪. দানি আলভেজ (ব্রাজিল) – ৩৯ বছর ২১৩ দিন
১৫. স্ট্যানলি ম্যাথিউজ (ইংল্যান্ড) – ৩৯ বছর ১৪৫ দিন
১৬. রাফায়েল মার্কেজ (মেক্সিকো) – ৩৯ বছর ১৩৯ দিন
১৭. সের্গেই ইগ্নাশেভিচ (রাশিয়া) – ৩৮ বছর ৩৫৮ দিন
১৮. ইয়ান হেইন্টজে (ডেনমার্ক) – ৩৮ বছর ২৯৩ দিন
১৯. ডেভিড সিম্যান (ইংল্যান্ড) – ৩৮ বছর ২৭৫ দিন
২০. ভিতর দামাস (পর্তুগাল) – ৩৮ বছর ২৪৬ দিন
বিশ্বকাপের ইতিহাসে এই কিংবদন্তিরা প্রমাণ করেছেন, ফুটবলে সাফল্য শুধু তারুণ্যের উপর নির্ভর করে না। অভিজ্ঞতা, নেতৃত্বগুণ এবং খেলার গভীর উপলব্ধি অনেক সময় বয়সকে হার মানিয়ে দেয়। তাই বিশ্বকাপের মঞ্চে তাদের অর্জন শুধু পরিসংখ্যান নয়, বরং অনুপ্রেরণার এক অনন্য দলিলও।







