এই খবরটি পডকাস্টে শুনুনঃ
স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দেশগুলোতে বছরের সবচেয়ে দীর্ঘ দিন ও সবচেয়ে ছোট রাতকে ঘিরে শুরু হয়েছে ঐতিহ্যবাহী মিডসামার উৎসব। ২১ জুনকে কেন্দ্র করে সুইডেন, ডেনমার্ক, নরওয়ে ও ফিনল্যান্ডজুড়ে গ্রীষ্মকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানাতে চলছে নানা বর্ণিল আয়োজন।
শনিবার ২০ জুন নর্ডিক অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে বিবেচিত এই উৎসবকে বিশেষ করে সুইডেনে বড়দিনের পর সবচেয়ে বড় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উদযাপন বলা হয়। প্রতি বছর জুন মাসের ১৯ থেকে ২৫ তারিখের মধ্যে শুক্রবার মিডসামার উৎসব পালন করা হয়। বছরের সবচেয়ে দীর্ঘ দিন এবং সবচেয়ে ছোট রাতের প্রাকৃতিক ঘটনাকে কেন্দ্র করেই এ উৎসবের আয়োজন।

উৎসব উপলক্ষে শহরের ব্যস্ততা ছেড়ে অধিকাংশ মানুষ গ্রামাঞ্চল, লেকপাড়, দ্বীপাঞ্চল কিংবা সামার কটেজে সময় কাটাতে যান। ফলে বড় শহরগুলোর অনেক এলাকা ফাঁকা হয়ে গেলেও গ্রামীণ ও অবকাশ কেন্দ্রগুলো হয়ে ওঠে প্রাণচঞ্চল।
মিডসামারের সবচেয়ে পরিচিত প্রতীক হলো ফুল ও সবুজ পাতা দিয়ে সাজানো ‘মিডসামার পোল’ বা ‘মে-পোল’। খোলা মাঠে এই খুঁটি স্থাপনের পর সেটিকে ঘিরে শুরু হয় লোকজ সঙ্গীত, নৃত্য এবং বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী খেলা। শিশু থেকে প্রবীণ—সব বয়সী মানুষ এতে অংশ নেন। সুইডেনের জনপ্রিয় ঐতিহ্যবাহী নৃত্য ‘স্মো গ্রোদোরনা’ বা ‘ছোট ব্যাঙের নাচ’ উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ।

উৎসবের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হলো ফুলের মুকুট। নারী, পুরুষ ও শিশুরা বুনো ফুল দিয়ে তৈরি মুকুট পরে উৎসবে অংশ নেন। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, মিডসামারের রাতে নির্দিষ্ট সংখ্যক ফুল সংগ্রহ করে বালিশের নিচে রাখলে ভবিষ্যৎ জীবনসঙ্গীকে স্বপ্নে দেখা যায়। ঐতিহ্যবাহী খাবারও মিডসামার উদযাপনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ সময় আচারযুক্ত হেরিং মাছ, নতুন আলু, টক ক্রিম, পেঁয়াজ, স্ট্রবেরি, সামন মাছ এবং বিভিন্ন গ্রিল খাবার পরিবেশন করা হয়। অনেক পরিবার বিশেষভাবে স্ট্রবেরি কেকের আয়োজন করে।
ইতিহাসবিদদের মতে, কৃষিভিত্তিক সমাজে গ্রীষ্মের আগমন, প্রকৃতির উর্বরতা এবং ভালো ফসলের প্রত্যাশা থেকেই শত শত বছর আগে মিডসামার উৎসবের সূচনা হয়। সময়ের সঙ্গে এটি স্ক্যান্ডিনেভীয় সমাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক পরিচয়ে পরিণত হয়েছে।

বিশেষ করে সুইডেন ও নরওয়ের উত্তরাঞ্চলে এ সময় সূর্য প্রায় অস্ত যায় না। মধ্যরাতেও দিনের আলোর উপস্থিতি দেখা যায়, যা ‘মিডনাইট সান’ নামে পরিচিত। এই অনন্য প্রাকৃতিক পরিবেশ মিডসামার উৎসবকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে।
প্রতিবছর স্থানীয়দের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক বিদেশি পর্যটকও সুইডেন, ফিনল্যান্ড, নরওয়ে এবং ডেনমার্ক-এ ভিড় জমান এই উৎসব উপভোগ করতে। তাদের কাছে এটি শুধু একটি উৎসব নয়, বরং স্ক্যান্ডিনেভিয়ার সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও জীবনধারাকে কাছ থেকে জানার এক অনন্য সুযোগ।
কৃষিভিত্তিক সমাজ থেকে উঠে আসা শতাব্দীপ্রাচীন এই উৎসব আজও আলো, প্রকৃতি এবং গ্রীষ্মের আগমনকে উদযাপনের এক প্রাণবন্ত প্রতীক হয়ে রয়েছে।







