২৪ জুন, ৩৯ বছরে পদার্পণ, এই দিনে প্রায় চার দশক আগে পৃথিবীতে আসেন এ যাবতকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার লিওনেল আন্দ্রেস কুচিত্তিনি মেসি। বুধবার ৩৯ বছরে পা রাখলেন বিশ্বকাপজয়ী আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। শুধু ফুটবল শৈলীতেই তিনি সেরাদের সেরা হননি। ঝুলিতে রয়েছে ক্লাব এবং জাতীয় দলের হয়ে অসংখ্য শিরোপা, রয়েছে ব্যক্তিগত অর্জনের এক বিশাল ভাণ্ডার।
২৪ জুন ১৯৮৭, আর্জেন্টিনার রোজারিও শহরে হোর্হে মেসি এবং সেলিয়া কুচিত্তিনির ঘরে জন্ম। ফুটবলের হাতেখড়ি রোজারিওতেই, এরপর শৈশবেই গন্তব্য বার্সেলোনার একাডেমি লা মাসিয়ায়। ২০০৪-এর ১৬ অক্টোবর লা লিগায় বার্সেলোনার হয়ে এস্পানিওলের বিপক্ষে ক্যারিয়রের প্রথম ম্যাচে নামেন মেসি। বয়স ছিল কেবল ১৭ বছর। ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট হাঙ্গেরির বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে অভিষেক আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। এরপর থেকে যেখানেই গেছেন, গড়েছেন অর্জন, ভেঙেছেন রেকর্ড, ছুঁয়েছেন মাইলফলক। বার্সেলোনার স্বর্ণযুগের সাক্ষী তিনি। আর্জেন্টিনার ৩৬ বছরের বিশ্বকাপখড়া কেটেছে তার হাত ধরেই।
ক্যারিয়ারের প্রথম অর্জনই ছিল বিশ্বমঞ্চে। জিতেছিলেন ২০০৫ সালের ফিফা অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ। আসরে ৫ গোল করে হয়েছিলেন সর্বোচ্চ গোলদাতা এবং পেয়েছিলেন টুর্নামেন্টসেরা গোল্ডেন বুট পুরস্কার। পরের অর্জনটি ২০০৮ সালে। বেইজিং অলিম্পিকে, আর্জেন্টিনা জিতেছিল স্বর্ণপদক। এরপর প্রায় কেটে যায় ১৩ বছর, আর্জেন্টিনার হয়ে ছুঁয়ে দেখা হয়নি কোন আন্তর্জাতিক শিরোপা।
তবে এরমাঝেই বার্সেলোনার হয়ে গড়তে থাকেন ব্যক্তিগত রেকর্ড, জিততে থাকেন শিরোপা। ২০০৪ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত বার্সার হয়ে জিতেছেন ১০টি লা লিগা শিরোপা। ২০০৫/৬, ২০০৮/৯, ২০১০/১১ এবং ২০১৪/১৫ মৌসুমে কাতালানদের হয়ে জিতেছেন চ্যাম্পিয়ন্স লিগ। বার্সার হয়ে জিতেছেন তিনটি উয়েফা সুপার কাপ। রয়েছে ৭টি কোপা ডেল রে ও তিনটি ক্লাব বিশ্বকাপ শিরোপা।
যে ক্লাবেই গেছেন, নিজেকে ছাড়িয়ে গেছেন অনন্য মাত্রায়। মাত্র দুই মৌসুম ছিলেন পিএসজিতে, যেখানে দুই মৌসুমেই জিতেছেন লিগ ওয়ান। ইন্টার মিয়ামি তাদের ক্লাব ইতিহাসে জিতেছে প্রথম মেজর লিগ কাপ, একটি মেজর লিগ শিল্ড এবং একটি লিগ কাপ, যার সব কয়টি এসেছে মেসির হাত ধরেই।
তবে আক্ষেপ রয়ে গিয়েছিল আর্জেন্টিনার হয়ে কোন আন্তর্জাতিক শিরোপা জয়ের। ২০১৪ সালে বিশ্বকাপের খুব কাছাকাছি গিয়েও ফাইনালে হেরে ফিরে আসতে হয়। ২০১৫ এবং ২০১৬ সালে টানা দুবার ফাইনাল হারেন কোপা আমেরিকার। সে আক্ষেপে জাতীয় দল থেকে নিয়েছিলেন অবসর।
তবে দেশটির সমর্থক, জাতীয় দল সতীর্থ-কোচ এবং রাষ্ট্রপতির অনুরোধে অবসর ভেঙে ফেরেন দলে। ফেরা আর তাকে হতাশ করেনি, বরং বীরের বেশে ফেরেন লিওনেল মেসি। ১৩ বছরের প্রচেষ্টা এবং তার নেতৃতে একে একে ২০২১ সালে কোপা আমেরিকা, ২০২২ সালে লা ফিনালিস্সিমা, একই সালে ৩৬ বছরের আক্ষেপ ঘুচিয়ে ফুটবল বিশ্বকাপ এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালে টানা দ্বিতীয় কোপা আমেরিকা জেতান আলবিসেলেস্তেদের।
ফুটবলে আর কোনকিছুর অপ্রাপ্তি রাখেননি মেসি। একমাত্র ফুটবলার হিসেবে জিতেছেন বিশ্বকাপে দুটি গোল্ডেন বুট। একবার জিতেছেন ফিফা বর্ষসেরা খেলোয়াড়। তিবার জিতেছেন ফিফার সেরা পুরুষ খেলোয়াড়। দুবার জিতেছেন ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপ সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার। ৯ বার জিতেছেন লা লিগা বর্ষসেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার। এক মাত্র ফুটবলার হিসেবে সর্বোচ্চ ৮বার জিতেছেন ব্যালন ডি‘অর।
বার্সেলোনার হয়ে সব টুর্নামেন্ট মিলিয়ে তিনি করেছেন ৬৭২ গোল, যা ক্লাবের সর্বকালের সর্বোচ্চ। ৪৭৪টি লা লিগা গোল করে এখনও সর্বকালের সর্বাধিক গোলদাতার তালিকায় শীর্ষে আছেন। আছে ১৯২ লা লিগা অ্যাসিস্ট, যা এখনও লিগ ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি। ২০১২ সালে ৯১ গোল করে এক ক্যালেন্ডার বছরে সর্বাধিক অফিসিয়াল গোলের জন্য গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে নাম লিখিছেন, যে রেকর্ডের মালিক এখনও মেসিই। এছাড়াও আছে ৩৬টি লা লিগা হ্যাটট্রিক, যেটি এখনও লিগের সর্বোচ্চ। জাতীয় দলের হয়ে করেছেন ১২২টি গোল, যা তাকে রেখেছে আর্জেন্টিনার হয়ে সর্বোচ্চ গোলদাতার শীর্ষে। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক গোল যেটি। ক্যারিয়ারে তার গোল সংখ্যা ৯১৬টি।
মেসি এখন লড়ছেন বিশ্বকাপ ধরে রাখার জন্য ২০২৬ আসরে। যেখানে খেলতে নেমে উদ্বোধনী ম্যাচে গড়েছেন রেকর্ড। প্রথম ম্যাচে ৩৮ বছর ১১ মাস ২৩ দিন বয়সে আলজেরিয়ার বিপক্ষে গোল করে বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি বয়সী আর্জেন্টাইন গোলদাতা হন। পাশাপাশি ম্যাচে তিন গোলে বিশ্বকাপের ইতিহাস সবচেয়ে বেশি বয়সী হ্যাটট্রিকের মালিক হয়েছেন।
হ্যাটট্রিক করে নাম লেখান ক্লোসার সঙ্গে, ২৪ ম্যাচে ১৬টি গোল করে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চের শীর্ষে ছিলেন ক্লোসা। পরে ২৮তম ম্যাচে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে প্রথম গোলটি করে ক্লোসাকে ছাড়িয়ে যান মেসি। দ্বিতীয় গোলটি করে নিজের রেকর্ড আরও বাড়ান আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি। সবমিলিয়ে বিশ্বকাপে মেসির গোল সংখ্যা ১৮টি, চলতি বিশ্বকাপে দুই ম্যাচে ৫টি। পাশাপাশি ক্লোসার আরও একটি রেকর্ডও ছাড়িয়ে গেছেন। বিশ্বকাপে ২৮ ম্যাচ খেলে মেসির জয়ের সংখ্যা ১৮টি। যা সর্বকালের সর্বাধিক বিশ্বকাপ ম্যাচ জয়ের রেকর্ড। এরআগে আলজেরিয়া ম্যাচে জিতে ক্লোসার ১৭ জয়ের রেকর্ডে ভাগ বসান। বিশ্বকাপে টানা ৬ ম্যাচে গোল করে ফ্রান্সের জাস্ট ফন্টেইন ও ব্রাজিলের জর্জিনহোর ৬ ম্যাচে গোলের রেকর্ডের সাথে বসেছেন।
৩৯ বছরে প্রাপ্তি অসংখ্য, তবে এখনও চিরতরুণ মেসি। চলতি বিশ্বকাপে নিজেকে ছাড়িয়ে তুলে নিচ্ছেন নতুন এক উচ্চতায়। সবুজ গালিচায় আঁকছেন পিকাসো, সুর তুলছেন মোজার্টের সিম্ফনির। অমরত্ব তো ছুঁয়ে ফেলেছেন আগেই।
শুভ জন্মদিন, সর্বজয়ী লিওনেল মেসি।







