সম্প্রতি একজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকের একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে চিকিৎসক সমাজে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। চিকিৎসকদের ঢালাওভাবে একটি নেতিবাচক শব্দে সম্বোধন করা কেবল অনভিপ্রেতই নয়, বরং তা একটি মহান পেশার অবমাননার শামিল। একজন স্বাস্থ্য বিষয়ক সাংবাদিক হিসেবে কর্মজীবনে হাসপাতালের করিডোর থেকে শুরু করে জরুরি বিভাগ—সবখানেই যাতায়াতের সুযোগ পেয়েছি। খুব কাছ থেকে দুই পক্ষের আলো এবং অন্ধকার দুটি রূপই দেখার সুযোগ আমার হয়েছে। তাই কোনো একক চশমায় পুরো চিকিৎসাব্যবস্থাকে বিচার করাটা হবে চরম অন্যায়।
আমি রাতের পর রাত সলিমুল্লাহ, সোহরাওয়ার্দী, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে কাটিয়েছি। সেখানে দেখেছি, এক ফোঁটা রক্তের জন্য যখন রোগীর স্বজনেরা হাহাকার করছেন, তখন কর্তব্যরত ইন্টার্ন চিকিৎসক নিজের শরীর থেকে রক্ত দিতে দ্বিধা করছেন না। গভীর রাতে পকেটে থাকা নিজের রাতের খাবারের টাকাটা দিয়ে দরিদ্র রোগীর জীবনরক্ষাকারী ওষুধ কিনে দিচ্ছেন—এমন দৃশ্য রূপকথা নয়, আমাদের হাসপাতালের নিত্যদিনের বাস্তব চিত্র।
ব্যক্তিগত চেম্বারে অনেক চিকিৎসকের টেবিলের সামনে বড় করে লেখা থাকে, “আপনার আর্থিক সমস্যা থাকলে আমাকে বলুন”। রোগীর মলিন পোশাক দেখে ভিজিট অর্ধেক করে দেওয়া, কিংবা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের নিজের কমিশনের টাকাটা রোগীর ব্যবস্থাপত্রের ওপরে ‘ডিসকাউন্ট’ হিসেবে লিখে দেওয়া মানবিক চিকিৎসকের সংখ্যা এই দেশেই কম নয়। এমনকি বেসরকারি হাসপাতালে হার্টের রিং বা স্টান্টিংয়ের অব্যবহৃত অংশটুকু, শল্য চিকিৎসার টুকিটাকি যত্ন করে সরকারি হাসপাতালে নিয়ে আসেন অনেক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, যেন কোনো দরিদ্র রোগীকে এই সুবিধাটুকু বিনামূল্যে দেওয়া যায়। যে অধ্যাপক চাইলে ১০ হাজার টাকা ভিজিট নিলেও রোগীর চাপ সামলানো কঠিন হবে, তিনি মাত্র ৩০০ টাকা ভিজিটে প্রান্তিক মানুষকে সেবা দিয়েছেন যুগ যুগ ধরে—এমন উদাহরণও আমাদের চোখেই দেখা।
আমার ছাত্রজীবনের একটি ঘটনা আজও মনে দাগ কেটে আছে। এলিফ্যান্ট রোডে একটি পথশিশুর পায়ের ওপর দিয়ে গাড়ি চলে যাওয়ায় আমি ও আমার বন্ধু তাকে নিয়ে কাছের একটি প্রাইভেট ক্লিনিকে যাই। কর্তব্যরত চিকিৎসক যখন জিজ্ঞেস করলেন, “আপনার কী হয়?” আমি উত্তর দিয়েছিলাম, “এই শিশুটি এই দেশের সমান অংশীদার।” ডাক্তার সাহেব শিশুটির পায়ে দ্রুত ব্যান্ডেজ করে দিলেন এবং টাকা নিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বললেন, “আপনারা একটা পথশিশুকে কোলে করে হাসপাতালে আনতে পেরেছেন, আর আমি ডাক্তার হয়ে তাকে বিনামূল্যে চিকিৎসা দিতে পারব না?” এমনকি সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকেরা নিজেদের উদ্যোগে তহবিল গঠন করে দরিদ্র রোগীদের আর্থিক সহায়তা দিচ্ছেন—এমন দৃশ্যও বিরল নয়।
কিন্তু মুদ্রার অপর পিঠও তো আছে। চিকিৎসাব্যবস্থার কাঠামোগত বৈষম্য ও কিছু চিকিৎসকের অতি-পেশাদারিত্বও আজ খবরের শিরোনাম। যে সরকারি হাসপাতালে লোডশেডিংয়ের সময় ওটিতে মোমবাতি বা মোবাইলের ফ্ল্যাশলাইট জ্বালিয়ে চিকিৎসকদের অস্ত্রোপচার করতে হয়, ঠিক একই সময়ে হাসপাতালের পরিচালকের রুমে জেনারেটরের সাহায্যে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র সচল থাকে। নিজের উদাসিনতায় রোগী মৃত্যুর দায় গোপন করতে অবাধ মিথ্যাচার, ক্ষমতা প্রয়োগরে মাধ্যমে বিচারিক প্রক্রিয়াকে আটকে দেয়া ইত্যাদি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার দায় কিন্তু শেষমেশ চিকিৎসকের ওপরেই এসে পড়ে।
আবার এর বাইরেও কিছু অন্ধকার দিক আছে। এমন চিকিৎসকের দেখাও মেলে যিনি বিনা কারণেই রোগীর সাথে অত্যন্ত দুর্ব্যবহার করেন, এক টাকা কম হলে চিকিৎসা দিতে অনীহা প্রকাশ করেন, মুমূর্ষ রোগী ফেলে রেখে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় মেতে ওঠেন। কেউ কেউ এত বেশি বাণিজ্যিক হয়ে পড়েন যে, মানবিকতা শব্দটাই তাদের অভিধান থেকে হারিয়ে যায়। এমন পরিস্থিতিও তৈরি হয় যেখানে রোগীরা মনে করেন, চিকিৎসককে সৌজন্যমূলক ‘সালাম’ দিলেও হয়তো টাকা চেয়ে বসতে পারেন। কারণ এমন ঘটনা বিরল নয় যে ডাক্তার তার চেম্বারের সামনে লিখে রেখেছেন, প্রথম দিনের ভিজিট, দ্বিতীয় দিনের ভিজিট, তৃতীয় দিনের ভিজিট, রিপোর্ট দেখানোর ভিজিট, ওষুধ লেখানোর ভিজিট ইত্যাদি। এই বিপরীতমুখী বাস্তবতার কারণেই চিকিৎসকদের প্রতি মানুষের এক ধরণের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও বিরূপ ধারণা তৈরি হচ্ছে।
চিকিৎসকদের গায়ে হাত তোলা এখন নিয়মিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে, গালি দেওয়াটা যেন লোকায়ত আচরণে রূপ নিয়েছে। কিন্তু মারধর বা গালিগালাজ কোনো সমাধান নয়; বরং এটি সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে। দেশের চিকিৎসকদের সঠিক মূল্যায়ন করা হয় না বলেই অনেকই দেশের বাইরে পাড়ি জমান, অনেকে পেশা পরিবর্তন করতেও দ্বিধা করেন না। এমন চলতে থাকলে দেশের চিকিৎসা সংকট আরও ঘনীভুত হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
আমি মনে করি জটিলতার নিরসনে উভয় পক্ষের যোগাযোগের উন্নয়ন জরুরী। চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে রোগ বা চিকিৎসার প্রক্রিয়াটি সহজ ভাষায় বুঝিয়ে বলা এবং রোগীদের পক্ষ থেকে চিকিৎসকের নির্দেশনা মন দিয়ে শোনা। এর পাশাপাশি চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনি ভুল চিকিৎসার সুনির্দিষ্ট অভিযোগের জন্য সঠিক আইনি ব্যবস্থা থাকা দরকার যাতে কেউ আইন নিজের হাতে তুলে না নেয়, বা আইনকে ক্ষমতার বলে ব্যবহার করতে না পারে। এছাড়া গুরুতর রোগের ক্ষেত্রে রোগীর স্বজনদের মানসিক অবস্থা বোঝার জন্য এবং রোগীর বাস্তবতা বোঝানোর জন্য হাসপাতালগুলোতে প্রাতিষ্ঠানিক কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা থাকা উচিত।
মনে রাখতে হবে, চিকিৎসা কোনো বাণিজ্যিক লেনদেন নয়, এটি একটি মানবিক সম্পর্ক। পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং সহানুভূতির মাধ্যমেই কেবল এই সংকটের সমাধান সম্ভব।
চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের যে অভিযোগগুলো জমছে, তার কারণ অনুসন্ধান করা আজ জরুরি। রোগ নির্ণয়ের অতিরিক্ত খরচ, চিকিৎসকের অবহেলা বা আচরণের যে জায়গাগুলো নিয়ে ক্ষোভ আছে, চিকিৎসকদের নিজেদের স্বার্থেই সেই জায়গাগুলো থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। নিজেদের আত্মশুদ্ধি এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
চিকিৎসক ও রোগী—কেউ কারও প্রতিপক্ষ নয়, একে অপরের পরিপূরক। উভয়পক্ষের এই অসহিষ্ণুতা ও আস্থার সংকট থেকে যদি আমরা বের হতে না পারি, তবে দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার এই জটিলতা দিন দিন বাড়তেই থাকবে। ঢালাও গালিগালাজ বন্ধ হোক, একই সাথে নিশ্চিত হোক চিকিৎসকের মানবিক আচরণ ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ। তবেই ফিরবে চিকিৎসা সেবার সুস্থ পরিবেশ।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







