অফলাইন ও অনলাইন মার্কেট প্লেস, সোশ্যাল মিডিয়া এবং ডার্ক ওয়েবে নজরদারি শুরু করে ভ্যাপ-এর মাধ্যমে গোপনে ছড়িয়ে পড়া এক নতুন ধরনের সিনথেটিক মাদক এমডিএমবির সন্ধান পায় মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গ্রুপ তৈরি করে এই মাদক ক্রেতাদের মধ্যে সরবরাহ করা হতো। চক্রটির মূলহোতাসহ ৪ জন সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন, একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে চতুর্থ বর্ষে অধ্যয়নরত ছাত্র খন্দকার তৌকিরুল কবির তামিম (২৬), মেহেদী হাসান রাকিব (২৬), একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সেলস এবং মার্কেটিং কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত মো.মাসুম মাসফিকুর রহমান ওরফে সাহস (২৭), সম্প্রতি ইন্ডিয়াতে পড়াশোনা করে বাংলাদেশে ব্যবসা শুরু করা মো. আশরাফুল ইসলাম (২৫)।
অভিযানে এমডিএমবি ৩৪০ মিলি, গাঁজার চকলেট, এমডিএমবি গ্রহণে ব্যবহৃত ভ্যাপ ডিভাইস, এমডিএমবি ব্যবহারের ব্যবহারের ই-লিকুইড এবং এমডিএমবি বিক্রির জন্য প্রস্তুত খালি ক্যানিস্টার উদ্ধার করা হয়।
শুক্রবার রাজধানীর সেগুনবাগিচা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ে সংবাদ সন্মেলনে এসব তথ্য জানান সংস্থাটির মহাপরিচালক হাসান মারুফ।
তিনি বলেন, নতুন সিনথেটিক মাদক এমডিএমবির সন্ধান পাওয়ার পর খুচরা বিক্রেতা হিসেবে তামিমকে চিহ্নিত করা হয়। একই সঙ্গে সোর্স ব্যবহার করে তার কাছ থেকে স্যাম্পল অর্ডার করা হয়।
অর্ডার করা সেই মাদক ডেলিভারির পর ঢাকা বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের উপপরিচালক মেহেদী হাসানের নেতৃত্বে, ঢাকা মেট্রো উত্তর ও দক্ষিণের একটি সমন্বিত টিম গত বুধবার (১০ ডিসেম্বর) মিরপুর পল্লবীতে ২০ মিলি এমডিএমবিসহ প্রথম সরবরাহকারী তামিমকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তামিমকে জিজ্ঞাসাবাদ ও তার ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট বিশ্লেষণ করে এই ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আসামি মেহেদী হাসান রাকিবের অবস্থান চিহ্নিত করা হয়। পরে গোয়েন্দা নজরদারি ও তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে ঢাকার মিরপুর এলাকা থেকে ১০ মিলি এমডিএমবিসহ তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
আসামি রাকিবের জবানবন্দিতে উদ্ঘাটিত হয় দেশের অভ্যন্তরে থাকা একটি এমডিএমবি-সাপ্লাই নেটওয়ার্ক। সেই সঙ্গে শনাক্ত করা হয় মালয়েশিয়া থেকে দেশে এমডিএমবি আনার মূলহোতা আশরাফ ও সাহস।
হাসান মারুফ বলেন, মিরপুর সেনপাড়া এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা আশরাফকে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, দীর্ঘদিন যাবত সমাজের এলিট শ্রেণির মাঝে সে এই ধরনের মাদক সরবরাহ করতো। সে মূলত ই-সিগারেট ও ভ্যাপসের ব্যবহারকারীদের টার্গেট করে তার সহযোগী সাহসের সমন্বয়ে এমডিএমবি মাদকের একটি মার্কেট তৈরির প্রচেষ্টা করছিল। বিভিন্ন সময় মালয়শিয়ায় যাতায়াত করায় সেখান থেকে সে এই মাদক সংগ্রহ করে দেশে সরবরাহ করতো।

মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বলেন, ফেসবুক-এর ক্লোজড গ্রুপ, রিভিউ পেজ ও ভুয়া অ্যাকাউন্টে গোপন সংকেতভিত্তিক পোস্ট দিত তারা। যেখানে সাধারণ ফ্লেভার, গেমিং টুল বা পোর্টেবল ডিভাইস-এর আড়ালে বোঝানো হতো আসল পণ্য। আগ্রহী ক্রেতা ইনবক্সে মেসেজ পাঠালে তাকে নিয়ে যাওয়া হতো ইন্ড-টু-ইন্ড এনক্রিপটেড হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাটে। যেখানে কোডওয়ার্ডে দাম ঠিক করা হতো। অবস্থান শেয়ার, লাইভ ট্র্যাকিং এবং নির্দিষ্ট ইমোজি ব্যবহার করে সরবরাহ নিশ্চিত করা হতো। যা দেখে সাধারণ ব্যবহারকারী বুঝতেই পারতো না যে এটি আসলে ভয়ংকর এই মাদকের গোপন ডিজিটাল বিক্রয় নেটওয়ার্ক। সোশ্যাল মিডিয়ার আড়ালে এমন দক্ষভাবে তারা মাদক বেচাকেনা করত যে পুরো লেনদেনটাই থাকত নিরাপদ, দ্রুত এবং অদৃশ্য তাদের ভাষায়। অনলি ফর ট্রাস্টেড ভ্যেপার্স এই সব হোয়াটসঅ্যাপে গ্রুপ পর্যালোচনা করে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরও একাধিক ব্যক্তি ডিএনসির গোয়েন্দা নজরদারিতে রয়েছে।
এমডিএমবির ক্ষতিকর দিক উল্লেখ করে হাসান মারুফ বলেন, ভ্যাপ ও ই-সিগারেট কার্টিজের ভেতরে গোপনে মেশানো শুরু হয়েছে ভয়ংকর তরল সিনথেটিক এই মাদক। যা কয়েক ফোঁটাই মানুষের স্নায়ুতন্ত্র বিপর্যস্ত করতে সক্ষম। তরুণদের মধ্যে জনপ্রিয় ভ্যাগ ডিভাইসকে আড়াল হিসেবে ব্যবহার করে এই মাদক দ্রুত নেশা ধরায়, হ্যালুসিনেশন, আক্রমণাত্মক আচরণ থেকে শুরু করে হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিক হওয়ার মতো মারাত্মক শারীরিক ঝুঁকি তৈরি করে।








