আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ইরানি-ফরাসি কার্টুনিস্ট, লেখক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা মারজান সাতরাপি আর নেই। ৫৬ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেছেন তিনি। তাঁর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছে ফ্রান্সের সাংস্কৃতিক অঙ্গনসহ বিশ্বের নানা প্রান্তের শিল্পী, সাহিত্যিক ও চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্বরা।
মারজান বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পেয়েছিলেন তার আত্মজীবনীমূলক গ্রাফিক নভেল ও চলচ্চিত্র ‘পার্সেপোলিস’–এর মাধ্যমে। ইরানের ইসলামি বিপ্লব পরবর্তী সময়কে কেন্দ্র করে নির্মিত এই কাজটি বিশ্বজুড়ে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছিল এবং তাকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।
ফরাসি প্রেসিডেন্সি এক বিবৃতিতে সাতরাপির মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে তাকে “ফরাসি সংস্কৃতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব এবং স্বাধীনতার প্রতি নিবেদিত একজন শিল্পী” হিসেবে উল্লেখ করেন।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এবং তাঁর স্ত্রীও শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, ইরানে কাটানো নিজের শৈশবকে তিনি এমনভাবে শিল্পে রূপ দিয়েছিলেন, যা হয়ে উঠেছিল একটি সার্বজনীন মানবিক গল্প।
ফরাসি গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, স্বামী ম্যাথিয়াস রিপার মৃত্যুর এক বছরেরও কিছু বেশি সময় পর সাতরাপি ‘দুঃখে ভেঙে পড়েই’ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ঘনিষ্ঠজনদের উদ্ধৃত করে এমন তথ্য প্রকাশ করেছে কয়েকটি সংবাদমাধ্যম।
গত বছর স্বামীর মৃত্যুর পর নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লিখেছিলেন, “কারণ আমি আমার জীবনের ভালোবাসাকে হারিয়েছি।”
১৯৬৯ সালের ২২ নভেম্বর ইরানের রাশত শহরে জন্মগ্রহণ করেন মারজান সাতরাপি। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর দেশজুড়ে চরমপন্থার উত্থানের প্রেক্ষাপটে ১৯৮৩ সালে তাঁর পরিবার তাকে পড়াশোনার জন্য অস্ট্রিয়ায় পাঠায়। পরে ইরানে ফিরে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা সম্পন্ন করলেও শেষ পর্যন্ত ১৯৯৪ সালে ফ্রান্সে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।
তাঁর সৃষ্ট ‘পার্সেপোলিস’ ২০০৭ সালে কান ফিল্ম ফেস্টিভালে সমালোচকদের গ্রাঁ প্রি অর্জন করে। পরের বছর ছবিটি একাডেমি অ্যাওয়ার্ডস (অস্কার)-এ সেরা অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র বিভাগে মনোনয়নও পায়। একইসঙ্গে এটি ফরাসি চলচ্চিত্র পুরস্কার সিজার অ্যাওয়ার্ডে সেরা অভিযোজিত চিত্রনাট্যের সম্মান লাভ করে।
শুধু ‘পার্সেপোলিস’ নয়, তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে এমভ্রয়ডারিস এবং চিকেন উইথ প্লামস। চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবেও তিনি নির্মাণ করেছেন রেডিওএক্টিভসহ একাধিক আলোচিত চলচ্চিত্র।
নারীর অধিকার ও মানবাধিকারের প্রশ্নেও ছিলেন সরব। ২০২৩ সালে তিনি ‘ওমেন, লাইফ, ফ্রিডম’ গ্রন্থের সম্পাদনা করেন, যেখানে মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর ইরানে ছড়িয়ে পড়া আন্দোলন ও দমন-পীড়নের চিত্র তুলে ধরা হয়।
২০২৪ সালে তিনি ফ্রেঞ্চ একাডেমি অব ফাইন আর্টস–এর সদস্য নির্বাচিত হন। একই বছর ফ্রান্সের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান গ্রহণের প্রস্তাব পেলেও তা প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁর যুক্তি ছিল, ইরানে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের জন্য লড়াইরত মানুষের পাশে ফ্রান্স যথেষ্ট দৃঢ়ভাবে দাঁড়ায়নি।
শিল্প, সাহিত্য, চলচ্চিত্র এবং মানবাধিকারের পক্ষে আপসহীন অবস্থানের মাধ্যমে মারজান সাতরাপি হয়ে উঠেছিলেন বিশ্বজুড়ে লাখো মানুষের অনুপ্রেরণা। এওএল







