এই খবরটি পডকাস্টে শুনুনঃ
অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা প্রণয়ন এবং এসব ওষুধের মূল্য নির্ধারণ—দুটি বিষয়ই সরাসরি জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই এ বিষয়ে সরকারের যেকোনো সিদ্ধান্তের মূল বিবেচনা হওয়া উচিত জনগণের প্রয়োজন, ওষুধের সহজলভ্যতা, গুণগত মান এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা। রাজনৈতিক সরকার হোক কিংবা অন্তর্বর্তী সরকার—এই মৌলিক নীতির কোনো পরিবর্তন হওয়ার কথা নয়।
সম্প্রতি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা প্রণয়ন ও মূল্য নির্ধারণে গঠিত টাস্কফোর্সের সিদ্ধান্ত বাতিল করেছে বর্তমান সরকার। এ নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই নানা ধরনের আলোচনা ও মতবিরোধ তৈরি হয়েছে। এক পক্ষ সরকারের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করছে, অন্য পক্ষ অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্যোগকে যৌক্তিক মনে করছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, অন্তর্বর্তী সরকার যে প্রক্রিয়ায় অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ও মূল্য নির্ধারণ করেছিল, সেটি আইনসম্মত ছিল না। ফলে প্রচলিত আইন ও বিধিবিধান অনুসরণ করে নতুন করে তালিকা ও মূল্য নির্ধারণ করা হবে।
আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা অবশ্যই জরুরি। কোনো সরকারি সিদ্ধান্তই আইন ও বিধির বাইরে গিয়ে নেওয়া উচিত নয়। কিন্তু জনগণের দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্নটি শুধু এতটুকু নয় যে, আগের সিদ্ধান্তটি আইনসম্মত ছিল কি না। আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—নতুন যে তালিকা করা হবে, সেটি কতটা বৈজ্ঞানিক, বাস্তবভিত্তিক ও জনবান্ধব হবে? ওষুধের যে মূল্য নির্ধারণ করা হবে, তা কতটা যৌক্তিক হবে? এবং পুরো প্রক্রিয়ায় জনগণের স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত থাকবে?
কারণ, শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষ আইনগত প্রক্রিয়ার জটিলতা নিয়ে মাথা ঘামায় না। একজন রোগীর কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো—তার প্রয়োজনীয় ওষুধটি বাজারে পাওয়া যাচ্ছে কি না এবং তিনি সেটি কিনতে পারছেন কি না। এখানেই অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা প্রণয়নের বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়।
আমাদের দেশে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা প্রণয়নকে শুধু প্রশাসনিক কাজ হিসেবে দেখলে চলবে না। রোগের ধরন ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিবর্তনের সঙ্গে তালিকাটিও পরিবর্তিত হওয়া প্রয়োজন। বর্তমানে দেশে সংক্রামক রোগের পাশাপাশি অসংক্রামক রোগের প্রকোপ বেড়েছে। হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, ক্যানসার, কিডনি রোগ, শ্বাসতন্ত্রের রোগ, স্নায়ুরোগসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। একই সঙ্গে সংক্রমণজনিত রোগ, মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য, শল্যচিকিৎসা এবং বিভিন্ন বিশেষায়িত চিকিৎসার প্রয়োজনও রয়েছে।
ফলে আজকের অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা শুধু কয়েক দশক আগের রোগের চিত্রের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা সম্ভব নয়। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে কোন রোগের জন্য কোন ওষুধ এখন সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে, কোন ওষুধের কার্যকারিতা প্রমাণিত, কোন ওষুধের বিকল্প আছে, কোনটি জীবনরক্ষাকারী এবং কোন ওষুধ সাধারণ মানুষের জন্য সহজলভ্য হওয়া অপরিহার্য—এসব প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন।
আর এই উত্তর দেওয়ার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা।
সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ, মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ, কিডনি বিশেষজ্ঞ, নিউরোলজিস্ট, নিউরোসার্জন, সার্জন, গাইনি ও অবস বিশেষজ্ঞ, শিশু বিশেষজ্ঞ, ক্যানসার বিশেষজ্ঞ, শ্বাসতন্ত্র বিশেষজ্ঞসহ বিভিন্ন শাখার চিকিৎসকদের মতামত নিয়ে একটি বৈজ্ঞানিক তালিকা তৈরি করা প্রয়োজন। কোন রোগের প্রকোপ কতটা, আধুনিক চিকিৎসায় কোন ওষুধ ব্যবহৃত হচ্ছে এবং তার মধ্যে কোনগুলো সত্যিকার অর্থে অত্যাবশ্যকীয়—এ বিষয়ে মাঠপর্যায়ের চিকিৎসা-অভিজ্ঞতা ছাড়া বাস্তবসম্মত তালিকা তৈরি করা কঠিন। অর্থাৎ প্রথম কাজ হওয়া উচিত একটি যৌক্তিক, বিজ্ঞানভিত্তিক এবং সময়োপযোগী অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা তৈরি করা। এরপর আসতে পারে মূল্য নির্ধারণের প্রশ্ন।
এখানেও একতরফা সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই কাম্য নয়।
ওষুধের মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে একদিকে যেমন সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বিবেচনায় নিতে হবে, অন্যদিকে দেশের ওষুধশিল্পের বাস্তবতাও বিবেচনা করতে হবে। একটি ওষুধ উৎপাদনে কাঁচামালের দাম, আমদানি ব্যয়, উৎপাদন খরচ, শ্রম, বিদ্যুৎ, পরিবহন, সংরক্ষণ, গবেষণা ও উন্নয়ন, মান নিয়ন্ত্রণসহ নানা ব্যয় জড়িত। আবার একই সঙ্গে বাজারে প্রতিযোগিতা, উৎপাদনকারীর মুনাফা এবং ভোক্তার সামর্থ্যের বিষয়টিও রয়েছে। সুতরাং এমন মূল্য নির্ধারণ করা যাবে না, যাতে একদিকে রোগীর ওপর অযৌক্তিক আর্থিক চাপ পড়ে; আবার অন্যদিকে এমন মূল্য নির্ধারণও করা উচিত নয়, যাতে দেশীয় ওষুধশিল্পের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশের ওষুধশিল্প গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বাংলাদেশি ওষুধ বিভিন্ন দেশে রপ্তানিও হচ্ছে। এই শিল্পের বিকাশ ধরে রাখা জাতীয় অর্থনীতি ও জনস্বাস্থ্য—উভয়ের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। ফলে মূল্য নির্ধারণের নীতিতে এমন ভারসাম্য থাকতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষ সাশ্রয়ী মূল্যে ওষুধ পায় এবং দেশীয় শিল্পও মানসম্মত উৎপাদন ও বিনিয়োগ চালিয়ে যেতে পারে।
এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষার নামে জনগণের ওপর অতিরিক্ত মূল্য চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। আবার সস্তা ওষুধের নামে এমন মূল্য নির্ধারণও করা উচিত নয়, যা দেশীয় উৎপাদনকে দুর্বল করে শেষ পর্যন্ত বাজারকে বিদেশি বহুজাতিক কোম্পানির জন্য উন্মুক্ত করে দেয়। এমন কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত কাম্য নয়, যার তাৎক্ষণিক সুফল দেখা গেলেও দীর্ঘমেয়াদে দেশের ওষুধশিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং আমদানিনির্ভরতা বেড়ে যায়।
তাই অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের মূল্য নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় সব অংশীজনের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এখানে সরকারি সংস্থা, চিকিৎসক, ওষুধশিল্পের প্রতিনিধি, ফার্মাসিস্ট, স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ, ভোক্তা অধিকার সংগঠন, রোগী সংগঠন এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতামত থাকা দরকার। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—সাধারণ জনগণের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা। কারণ ওষুধের দাম নিয়ে যিনি সিদ্ধান্ত নেবেন, তার জানা দরকার একজন সাধারণ রোগীর কাছে সেই দামটি আসলে কতটা বহনযোগ্য। এমনকি জনগণের একাধিক প্রতিনিধি এই প্রক্রিয়ায় থাকলে তারা শুধু মূল্য নিয়ে নয়, ওষুধের সহজলভ্যতা, বাজারে সংকট, নিম্নমানের ওষুধ, অতিরিক্ত প্রেসক্রিপশন এবং অপ্রয়োজনীয় ব্র্যান্ড-নির্ভরতার মতো বিষয়ও সামনে আনতে পারবেন।
আর পুরো প্রক্রিয়াটি হতে হবে স্বচ্ছ। কোন ওষুধ তালিকায় ঢুকল, কেন ঢুকল, কোনটি বাদ পড়ল, কেন বাদ পড়ল এবং একটি নির্দিষ্ট ওষুধের দাম কীভাবে নির্ধারিত হলো—এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা থাকা প্রয়োজন। মূল্য নির্ধারণের সূত্র ও তথ্যও যতটা সম্ভব জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত। এতে সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর জনগণের আস্থা বাড়বে এবং অযৌক্তিক চাপের সুযোগ কমবে। সবচেয়ে বড় কথা, এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তই তড়িঘড়ি করে নেওয়া উচিত নয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত আইনসম্মত ছিল কি না, সেটি আইনগতভাবে যাচাই করা সরকারের দায়িত্ব। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করাই যেন মূল লক্ষ্য না হয়ে দাঁড়ায়। আগের প্রক্রিয়ায় ভুল থাকলে সেটি চিহ্নিত করে আরও উন্নত, স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়া তৈরি করাই হওয়া উচিত পরবর্তী পদক্ষেপ। কারণ সরকার পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু রোগীর প্রয়োজন পরিবর্তন হয়নি। একজন ক্যানসার রোগী, হৃদরোগী, কিডনি রোগী কিংবা সংক্রমণে আক্রান্ত শিশুর কাছে কোনো সরকারের মেয়াদ বা রাজনৈতিক পরিচয়ের গুরুত্ব নেই। তার প্রয়োজন কার্যকর, নিরাপদ, মানসম্মত এবং সাশ্রয়ী ওষুধ।
তাই অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ও মূল্য নির্ধারণের প্রশ্নে রাজনৈতিক পক্ষ-বিপক্ষের বিতর্কের বাইরে গিয়ে একটি জাতীয় ঐকমত্য তৈরি করা প্রয়োজন। প্রথমে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্বয়ে রোগের বর্তমান প্রবণতা ও আধুনিক চিকিৎসা বিবেচনায় নিয়ে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের একটি যৌক্তিক তালিকা তৈরি হোক। এরপর অর্থনীতিবিদ, শিল্পমালিক, চিকিৎসক, ফার্মাসিস্ট, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, ভোক্তা অধিকারকর্মী এবং জনগণের প্রতিনিধিদের নিয়ে স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়ায় মূল্য নির্ধারণ করা হোক। নির্দিষ্ট সময় পরপর সেই তালিকা ও মূল্য পুনর্মূল্যায়নের ব্যবস্থাও থাকতে হবে।
আমরা চাই না, কোনো সরকারের সিদ্ধান্তকে সমর্থন বা বিরোধিতা করতে গিয়ে আসল প্রশ্নটি আড়ালে পড়ে যাক। আসল প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশের মানুষ কি প্রয়োজনীয় ওষুধটি সময়মতো এবং সামর্থ্যের মধ্যে কিনতে পারছে? এই প্রশ্নের উত্তরই হওয়া উচিত অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ও মূল্য নির্ধারণের সব নীতির কেন্দ্রবিন্দু। জনস্বার্থের ঊর্ধ্বে কোনো পক্ষের স্বার্থ নয়—না সরকারের, না ওষুধ কোম্পানির, না কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর। একই সঙ্গে এমন কোনো সিদ্ধান্তও নয়, যা দেশীয় ওষুধশিল্পের বিকাশকে থামিয়ে দিয়ে ভবিষ্যতে বিদেশি বহুজাতিক কোম্পানির ওপর নির্ভরতা বাড়িয়ে দেয়। অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ শেষ পর্যন্ত কোনো সাধারণ পণ্য নয়। এটি মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্যের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তাই এর তালিকা হবে বিজ্ঞানভিত্তিক, মূল্য হবে যৌক্তিক, প্রক্রিয়া হবে স্বচ্ছ এবং সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে থাকবে জনগণ—এটাই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের নীতি।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








