ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হওয়ার ঘোষণা দিয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কিছু নতুন শব্দ নিয়ে শুরু হয়েছে আলোচনার ঝড়। অনেকেই আমরা এইসকল পদ্ধতি সম্পর্কে জানলেও সাথে শব্দগুলোর সাথে পরিচিত না। বিশেষ করে, পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন, আরপিও, দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট আইনসভা,গণভোট এবং পোস্টাল ভোট।
বাংলাদেশে বর্তমানে ‘ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট’ পদ্ধতিতে নির্বাচন হয়। অর্থাৎ এই পদ্ধতিতে একজন ভোটার শুধুমাত্র একজন প্রার্থীকে ভোট দিতে পারেন এবং যিনি সবচেয়ে বেশি ভোট পান তিনিই জয়ী হন। এই পদ্ধতিতে একটি নির্বাচনী এলাকা থেকে শুধুমাত্র একজন প্রতিনিধি নির্বাচিত হন।
পিআর পদ্ধতি (প্রোপরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন): আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বমূলক নির্বাচন পদ্ধতি বা পিআর নির্বাচন এমন একটি নির্বাচন ব্যবস্থা, যেখানে কোনো একটি রাজনৈতিক দল মোট যত শতাংশ ভোট পায়, সংসদের ঠিক তত শতাংশ আসন পায়।
যেমন, কোনো নির্বাচনে যদি একটি দল ৫০ শতাংশ ভোট পায়, তাহলে মোট আসন সংখ্যার ৫০ শতাংশ আসনই তারা পাবে। পিআর বা আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে মুক্ত, গোপন ও মিশ্র তিনটি আনুপাতিক নির্বাচন ব্যবস্থা রয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে।
বর্তমান বাংলাদেশের সংসদীয় নির্বাচন ব্যবস্থায় ৩০০টি আসনে আলাদা আলাদা প্রার্থী দিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে রাজনৈতিক দলগুলো।
উদাহারণস্বরূপ, বর্তমান পদ্ধতিতে জাতীয় নির্বাচনে একটি আসনে মোট ৪ জন প্রার্থী চারটি দল থেকে নির্বাচন করছে। এই নির্বাচনে ভোট পড়েছে ৮৫ শতাংশ। এর মধ্যে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় তিনজন প্রার্থীই ২০ শতাংশ করে ভোট পেল। আর চতুর্থ প্রার্থী পেলো ২৫ শতাংশ ভোট।
বর্তমান পদ্ধতি অনুযায়ী চতুর্থ প্রার্থীই এই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হবেন। আর ওই তিনটি দলের ৬০ শতাংশ ভোট তেমন কোন কাজে আসছে না।
একই ভাবে সারাদেশের অন্তত ২৯০ আসনে যদি একই হারে ভোট পেয়ে চতুর্থ দলটির প্রার্থীরা জয়লাভ করে, তাহলে মাত্র ২৫ শতাংশ ভোট নিয়ে তারা সরকার গঠনসহ সংসদে এককভাবে আধিপত্য করবে। অথচ বাকি তিন দল মিলে ৬০ শতাংশ ভোট পেলেও তাদের কোনো প্রতিনিধিত্ব থাকলো না সংসদে। এতে সংসদে প্রতিনিধিত্বমূলক অংশগ্রহণ থাকে না।
আরপিও (রিপ্রেজেন্টেটিভ পিপলস অর্ডার): বাংলাদেশে সংবিধানের আওতায় নির্বাচন সংশ্লিষ্ট যতগুলো আইন আছে তার মধ্যে নির্বাচন পরিচালনা সংক্রান্ত মূল আইন হলো আরপিও বা গণপ্রতিনিধিত্ব আইন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তীতে সংবিধান তৈরির পর ১৯৭২ সালে নির্বাচন পরিচালনার জন্য প্রথমবারের মতো “গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২ (আরপিও)” প্রণয়ন করা হয়েছিলো।
এরপর বিভিন্ন সময়ে নানা পরিবর্তন আনা হয়েছে এ আইনটিতে। সবশেষ চলতি বছর আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সংশোধিত গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ২০২৫ (আরপিও) জারি করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
এতে ইসিকে নির্বাচন বন্ধ করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আদালত কর্তৃক ‘পলাতক’ ঘোষিত ব্যক্তি সংসদ সদস্য হওয়ার অযোগ্য হবেন বলেও উল্লেখ করা হয়। এছাড়াও একক প্রার্থীর বিরুদ্ধে ‘না ভোট’, ইভিএম সংক্রান্ত সমস্ত ধারা বাতিল, মিথ্যা তথ্য বা ‘ফেক নিউজ’ দণ্ডনীয় অপরাধ; এসব বিধানও রয়েছে সংশোধিত আরপিওতে।
আরপিও-তে সংশোধিত বিষয়গুলো হচ্ছে:
- একক প্রার্থীর বিরুদ্ধে ‘না ভোট’ (নো ভোট)
- ইভিএম সংক্রান্ত সমস্ত ধারা বাতিল
- প্রবাসীদের জন্য পোস্টাল ব্যালট এবং আধুনিকীকরণ
- ‘পলাতক’ ঘোষণা হলে প্রার্থিতা বাতিল
- মিথ্যা তথ্য বা ‘ফেক নিউজ’ দণ্ডনীয় অপরাধ
- মনোনয়নপত্রের সঙ্গে আয়কর রিটার্ন এবং সম্পদের পূর্ণ বিবরণ
- প্রার্থীর জামানতের অর্থ বৃদ্ধি
- সংসদ সদস্যের অযোগ্যতা সংক্রান্ত বিষয়ে ইসির ক্ষমতা
- ভোটকেন্দ্রে অবাঞ্ছিত প্রবেশে কঠোরতা
- ইসিকে নির্বাচন বন্ধ করার ক্ষমতা
- রাজনৈতিক দলের তহবিল স্বচ্ছতা
- ভোট গণনায় ‘সমতা’
দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট আইনসভা বা দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ: সংসদের নিম্নকক্ষের পাশাপাশি একটি উচ্চকক্ষও থাকবে। নিম্নকক্ষের সদস্য থাকবেন ৪০০ জন। প্রচলিত পদ্ধতিতে তারা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হবেন।
দ্বিকক্ষ সংসদের বিষয়ে যা রয়েছে সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবনায়
বাংলাদেশের বর্তমান এক কক্ষের জাতীয় সংসদে মোট আসন ৩৫০টি। যার মধ্যে ৩০০টি আসনে সদস্যরা সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন। আর ৫০টি আসন থাকে নারীদের জন্য সংরক্ষিত। সাধারণ নির্বাচনে পাওয়া আসনের অনুপাতে এসব আসন বণ্টন করা হয়।
তবে সংবিধান সংস্কার কমিশনের খসড়া প্রস্তাবে দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদের বিষয়ে বলা হয়েছে, নিম্নকক্ষ থাকবে ৪০০টি আসন। আর উচ্চকক্ষে থাকবে ১০৫টি আসন।
নিম্নকক্ষের ৪০০টি আসনে প্রচলিত ব্যবস্থায় অর্থাৎ সরাসরি জনগেণর ভোটে প্রতিনিধি নির্বাচিত হবেন।
উচ্চকক্ষের ১০০টি আসনে নির্বাচন হবে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিতে। অর্থাৎ, রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনে সারাদেশে মোট যত ভোট পাবে; সেই অনুপাতে তারা উচ্চকক্ষে আসন পাবে। তবে উচ্চকক্ষে প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিতের কথাও বলা হয়েছে সংবিধান সংস্কার কমিটির সুপারিশে।
উচ্চকক্ষের বাকি ৫টি আসন থাকবে রাষ্ট্রপতির হাতে। সমাজের পিছিয়ে পড়া বিভিন্ন অংশের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে এই পাঁচ আসনে সংসদ সদস্য মনোনয়ন দেবেন রাষ্ট্রপতি।
যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ভারতসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা রয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের আইনসভা এককক্ষবিশিষ্ট। অর্থাৎ বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে কোনো প্রস্তাব বা বিল পাস হলে তা আর কোথাও আলোচনা বা অনুমোদন নেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকে না।
গণভোট: গণভোট একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে জনগণের মতামত জানতে নির্বাচন পদ্ধতির মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে ভোটাররা “হ্যাঁ” বা “না” ভোট দিয়ে থাকেন।
ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ব্যালট পেপার পান এবং একটি সংরক্ষিত স্থানে গিয়ে সেই কাগজটিতে ভোট দেন। ভোটাররা সাধারণত একটি নির্দিষ্ট প্রশ্ন বা প্রস্তাবনার ওপর ভোট দেন, যা হতে পারে সংবিধানিক পরিবর্তন বা অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
এক কোথায় রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয়ের ওপর জনগণের সমর্থন আছে কিনা তা যাচাইয়ের জন্য যে ভোট অনুষ্ঠিত হয় তাকে গণভোট বলে। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ ব্যালটে সিল দেওয়া হয়।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে চারটি বিষয়ের ওপর করা একটি প্রশ্নেই ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দেবেন ভোটাররা।
১. নির্বাচনকালীন সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হবে।
২. আগামী সংসদ হবে দুই কক্ষ বিশিষ্ট। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ জন সদস্য বিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে এবং সংবিধান সংশোধন করতে হলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হবে।
৩. সংসদে নারীর প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে যে ৩০টি প্রস্তাবে জুলাই জাতীয় সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যমত হয়েছে সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী নির্বাচনে বিজয়ী দলগুলো বাধ্য থাকবে।
৪. জুলাই সনদে বর্ণিত অন্যান্য সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হবে।
পোস্টাল ভোট: এই পদ্ধতিতে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো অ্যাপে নিবন্ধিত করে প্রবাসী ভোটাররা পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারবেন।
এই প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে প্রবাসীরা যে ঠিকানায় আছেন সে ঠিকানায় নিবন্ধন করতে হবে। প্রবাসের ব্যবহৃত নম্বরটি ‘ইউজার নেম’ হবে। বাংলাদেশে বসে নিবন্ধনের সুযোগ থাকবে না। অন্যখানে (এক দেশে) বসে অন্য দেশের নামে নিবন্ধনের সুযোগ নেই। সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিতে একটা ব্যবস্থাও থাকছে। ইসি, প্রকল্প, সরকার ও আন্তর্জাতিক নানা সংস্থার সমন্বয়ে এ নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকবে।
অ্যাপ ডাউনলোড করে ভাষা নির্বাচন করে নির্দেশনা থাকবে। কয়েকটি ধাপ রয়েছে। ‘হেল্পলাইন’ রয়েছে। থাকবে ভিডিও টিউটোরিয়াল, তা সংশ্লিষ্টদের গাইড করে নিয়ে যাবে। ১০টি ধাপ দেখালেও সহজভাবে নিবন্ধন ও তালিকাভুক্ত হতে পারবেন।
নিবন্ধন করতে ৫-১০ মিনিট সময় লাগতে পারে। প্রবাসে নিবন্ধন করে দেশে এসে ভোট দেওয়া যাবে না। প্রাথমিকভাবে ১৪৩টি দেশের মধ্যে প্রতিটি অঞ্চলকে পাঁচ দিন করে সময় দেওয়া হয়েছে। ৪০ দিনব্যাপী নিবন্ধন প্রক্রিয়া হবে। নিবন্ধিত হলে প্রবাসী বাংলাদেশি ভোটার তালিকা ছাপা হবে।
দেশে ও প্রবাসে আগামী ১৯ নভেম্বর থেকে ২৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত নিবন্ধন প্রক্রিয়া চলবে। বাংলাদেশ সময় ১২টা ১ মিনিটে নিবন্ধন শুরু হয়ে শেষ হবে পঞ্চম দিনে ১১টা ৫৯ মিনিটে।
মধ্য এশিয়া, লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকায় অবস্থানরত প্রবাসীরা ১৯ থেকে ২৩ নভেম্বর পর্যন্ত নিবন্ধন করতে পারবেন।
উত্তর আমেরিকা ও ওশেনিয়ায় অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশিরা নিবন্ধন করতে পারবেন ২৪ থেকে ২৮ নভেম্বর পর্যন্ত। ইউরোপে অবস্থানরত প্রবাসীরা নিবন্ধনের জন্য ২৯ নভেম্বর থেকে ৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় পাবেন।
দক্ষিণ এশিয়ায় অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশিরা নিবন্ধন করতে পারবেন ৯ থেকে ১৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত। সৌদি আরবে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশিরা নিবন্ধন করতে পারবেন ৪ থেকে ৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশিরা নিবন্ধন করতে পারবেন ৯ থেকে ১৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত। সৌদি আরব ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশের প্রবাসী বাংলাদেশিরা নিবন্ধন করতে পারবেন ১৪ থেকে ১৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত।
এ ছাড়া তালিকায় নাম নেই, এমন দেশের প্রবাসী বাংলাদেশিরা ১৯ থেকে ২৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত নিবন্ধন করতে পারবেন। যেসব প্রবাসী বাংলাদেশি নির্দিষ্ট সময়ে নিবন্ধন করতে পারবেন না, তারাও এ সময় নিবন্ধন করতে পারবেন। সব মিলিয়ে ৪০ দিনে ১৪৩টি দেশে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশিরা নিবন্ধন করতে পারবেন।








