এই খবরটি পডকাস্টে শুনুনঃ
পেশাদার সাংবাদিকেরা যখন তাদের কর্মময় জীবনের ফেলে আসা ঘটনাবহুল স্মৃতিকথা লেখেন, তখন তা থেকে পরবর্তী প্রজন্ম অনেক কিছু শিখতে পারে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমাদের দেশে এই ধারার খুব একটা চল নেই। আমাদের বেশিরভাগ প্রবীণ সাংবাদিকদের বড় একটি অংশ স্মৃতিকথা লেখায় মনোনিবেশ না করে নিষ্ঠার সাথে তাদের পেশাগত জীবনের ঘটনাবহুল বিচিত্র অভিজ্ঞতা ও স্মৃতি কেবল আড্ডার টেবিলেই সীমাবদ্ধ রাখেন।
ফলে তা আর অন্যদের কাছে গুরুত্ব বহন করে না। আর একথা তো আমরা সবাই জানি, প্রিন্ট মাধ্যমের ছাপার অক্ষরে প্রকাশিত ব্যতীত অন্য সব কাহিনী, কথাবার্তা কেউ বিশ্বাস করে না। পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন, অনুসন্ধানী প্রচ্ছদকাহিনী, ফিচারের বাইরেও এমন অনেক অলিখিত বিষয়, তথ্য রয়ে যায় একজন সাংবাদিকের ডায়েরিতে, যা পাঠকের জানার কিংবা সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকের তা জানানোর অধিকার আছে। একজন দায়িত্ববান সাংবাদিকের কাজ হলো, সেইসব অপ্রকাশিত সত্য ও তথ্যকে তার পাঠকের কাছে তুলে ধরা।
১
প্রবীণ সাংবাদিক মনোয়ার হোসেনের ‘খণ্ড খণ্ড স্মৃতি’ বইটি পড়তে গিয়ে উপরোক্ত কথাগুলোই বারবার মনে পড়ছিল। জন্মসূত্রে তিনি পুরান ঢাকার নাগরিক। দেশভাগের তিন বছর পর তার জন্ম বুড়িগঙ্গার পাড়ের সূত্রাপুরের বাংলাবাজারে, যার আদি নাম ডিগবাজার নর্থব্রুক হলের কাছাকাছি। পড়াশোনা জুবিলি স্কুল, জগন্নাথ কলেজ হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতির সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন, যার ফলে খুব কাছ থেকে দেখেছেন ষাটের দশকের উত্তাল রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ, সত্তরের নির্বাচন, একাত্তরের সাত মার্চ, তারপর মুক্তিযুদ্ধ। এরপর স্বাধীন দেশে সাংবাদিকতা করার সুবাদে দেখেছেন আরও অনেক কিছু। প্রখ্যাত সাংবাদিক এবিএম মুসার কাছ থেকে শিখেছেন কিভাবে একজন রিপোর্টার ষোলোআনা রিপোর্টার হয়ে ওঠে। সেই অর্থে তিনি তাকে গুরু মানেন।
প্রতিবেদক হিসেবে কাজ করতে গিয়ে দেখেছেন দেশ, সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি সহ নানাকিছু। কথাপ্রসঙ্গে তিনি জানান, সদ্য স্বাধীন দেশে সাংবাদিকতার বিকাশের শুরুটা হয়েছিল তাদের হাত দিয়েই। আর এই কাজে তাদের অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন সে সময়ের বাঘা বাঘা সব সাংবাদিক-সম্পাদক। তাদের মধ্যে রয়েছেন হাসান হাফিজুর রহমান, শামসুর রাহমান, তোয়াব খান, আবদুল গাফফার চৌধুরী, এম. আর. আখতার মুকুল, এনায়েতউল্লাহ খান, এবিএম মুসা সহ আরও অনেকেই।
২
সদ্য স্বাধীন দেশে একজন প্রতিবেদকের কাজের ধরন কেমন ছিল? জানতে চাইলে মনোয়ার হোসেন জানান, আজকের দিনের মতো সে সময় প্রতিবেদকদের এত বিট-ফিট ছিল না। তখন একজন প্রতিবেদককে ‘জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ’— সবকিছুই করতে হতো। ‘নির্দিষ্টভাবে কোনো ‘বিট’ বা এলাকা না থাকার কারণে তখন সব ধরনের এবং সব বিষয়ের ওপরই প্রয়োজন অনুযায়ী করতে হতো। আমাকে এভিয়েশন, শিপিং, পরিবেশ, পানি সম্পদ, বাণিজ্য বিষয়ক রিপোর্ট সমান গুরুত্ব দিয়ে করতে হতো। ফলে কৃষি বিষয়ক রিপোর্ট করা পিছিয়ে গেল। বিভিন্ন বিষয়ের ‘সোর্স’ ও ‘কন্টাক্ট’ তৈরি ও রক্ষা করার জন্য সপ্তাহের প্রতি দিনই ছুটাছুটি করতে হতো’ (রিপোর্টারে রূপান্তর, পৃষ্ঠা- ১৩)।
মনোয়ার হোসেন কম কথা বলার মানুষ। সারাক্ষণ নিজের মতো করে থাকেন, নিজের জগতে বাস করেন। কথাটাকে আরেকটু পরিষ্কার করে বললে বলতে হয়, তিনি তার নিজস্ব বলয়েই থাকতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। যদি নেহাত কারো সাথে কথা বলা অতি জরুরি হয়ে ওঠে, সেখানেও তিনি মাত্রাতিরিক্ত পরিমিতিবোধের পরিচয় দিয়ে নিজে যতটুকু জানেন, ঠিক ততটুকুই বলবেন— এর বাইরে একরত্তিও বেশি বলবেন না। তার সাথে কিছুদিন মেলামেশা করলে যে কেউই ভেবে নিতে পারেন, লোকটা বুঝি অর্থনীতির জটিল শাস্ত্রের মতো হিসেব করে কথা বলেন, হিসেব করে কথা শোনেন, এমনকি হিসেব করে চলাফেরাও করেন।
দেশে অর্থনৈতিক সাংবাদিকতার জটিল পথকে মনোয়ার হোসেন তার নিজস্ব মেধা ও মুন্সিয়ানায় নতুন মাত্রা দিয়েছেন। অর্থনীতির কঠিন বিষয়কে পাঠকের কাছে বোধগম্য করে তুলতে তার অবদান অনস্বীকার্য। মূলত আশির দশক থেকে অর্থনৈতিক সাংবাদিকতার বিকাশ শুরু হতে থাকে। রাজনীতির পাশাপাশি অর্থনীতিও যে সাংবাদিকতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, তা ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়।
৩
‘খণ্ড খণ্ড স্মৃতি’ বইটিতে লেখকের রিপোর্টার জীবনের নানা অধ্যায়ের বয়ান বর্ণিলভাবে উঠে এসেছে। মনোয়ার হোসেনের সুবিধা হলো, তিনি বাংলাদেশ সৃষ্টির প্রক্রিয়াটা দেখেছেন— মুক্তিযুদ্ধ দেখেছেন। স্বাধীনতার পর সবকিছুর দ্রুত বদলে যাওয়াও দেখেছেন। গত পঞ্চাশ বছরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনসহ নানা মাধ্যমের দুই পয়সার কেউকেটা থেকে শুরু করে গজিয়ে ওঠা হাজার কোটি টাকার রাঘববোয়ালদের চড়াই-উতরাই, উত্থান-পতন দেখেছেন। বর্তমান অস্থির সময়েরও সাক্ষী তিনি।
মনোয়ার হোসেন তার নিজস্ব ঢংয়ে লিখেছেন। তার লেখা পড়তে গিয়ে মনে হয়েছে, রিপোর্টারের গদ্যের যে ধরন থাকে, তিনি তার বাইরে আসতে পারেননি কিংবা বেরিয়ে আসতে চাননি। লেখার মধ্যে রিপোর্টারের স্পষ্ট স্পর্শ থাকুক— তিনি হয়তো তা চেয়েছেন। তবে একথা বলতে কোনো দ্বিধা নেই যে, তিনি তার লেখার মধ্যে ‘পাখির চোখে দেখা’-র মতো একটা নির্মোহ ব্যাপার রেখেছেন, যা বইটির বাড়তি আকর্ষণ।
৪
আমার পাঠ-উপলব্ধিতে বইটিতে রয়েছে তিন ধরনের বা মেজাজের লেখা। প্রথম ক্যাটাগরিতে রয়েছে বিগত দিনে লেখকের ফেলে আসা পেশাগত কাজের বয়ান; দ্বিতীয় ক্যাটাগরিতে ভ্রমণ অভিজ্ঞতা; এবং তৃতীয় ক্যাটাগরিতে ব্যক্তিগত স্মৃতি-রোমন্থন, যেখানে লেখকের বেড়ে ওঠা, একাত্তর, মুক্তিযুদ্ধের পাশাপাশি তার দেখার বিষয়টি বড় পরিসরে উঠে এসেছে।
প্রথম ক্যাটাগরিতে যেসব লেখা উল্লেখযোগ্য, তা হলো— রিপোর্টারে রূপান্তর, একটি ইন্টারভিউ এবং সংশ্লিষ্ট রিপোর্টার, বাণিজ্য বিষয়ক রিপোর্ট এবং গার্মেন্টস পণ্য রফতানি, জাহাজ চলাচল সংক্রান্ত খবর তুলনামূলক কম গুরুত্বে, দেশে অর্থনৈতিক সাংবাদিকতার বিস্তার, এক কঠোর মুখের রসিকতা, পানি সম্পদ রিপোর্টিং-এ কিছু অভিজ্ঞতা ও একটি চমক, নিরস অর্থনীতিতে ফুলের বাণিজ্য।
দ্বিতীয় ক্যাটাগরির মধ্যে রয়েছে— নীল নদের উৎসে, মাসাইমারা সাফারি পার্কে রাত্রিযাপন ও ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাত দর্শন।
আর শেষোক্ত ক্যাটাগরিতে রয়েছে— অস্ত্র সমর্পণের এক টুকরো স্মৃতি, ‘৬৯-এর একটি স্মৃতি ও গোলটেবিল বৈঠক থেকে ফিরে এলেন বঙ্গবন্ধু, ১৭ সেপ্টেম্বরের স্মৃতি: ১৯৬২, স্মৃতি থেকে: ডিগবাজার রোড বা নর্থব্রুক হল রোড।
৫
আমি নিজেও জন্মসূত্রে পুরান ঢাকার নাগরিক। ঢাকা, পুরান ঢাকা নিয়ে আমার বিস্তর আগ্রহ ও কৌতূহল রয়েছে। আমি যখন মনোয়ার হোসেনের পুরান ঢাকা, এর আশেপাশের মানুষজন, রাজনীতি নিয়ে স্মৃতিকথাগুলো পড়ছিলাম, তখন পাঠক হিসেবে আমার মনে হচ্ছিল, তিনি যেন খুব তাড়াহুড়ো করে লেখার পরিসর সংক্ষেপ করতে গিয়ে লেখাগুলোর প্রতি অবিচার করেছেন।
মুদ্রণপ্রমাদ, ছাপা, বাঁধাইসহ বইটির সৌকর্যে মনোযোগের অভাব পরিলক্ষিত হয়েছে। তবে একজন পাঠক হিসেবে লেখকের কাছে পুরান ঢাকায় জন্ম, বেড়ে ওঠা, ঢাকার জনজীবন আর গত ৫৪ বছরে দ্রুত বদলে যাওয়া চারপাশ নিয়ে একটি স্বতন্ত্র স্মৃতিকথার বই লেখার সনির্বন্ধ অনুরোধ রইল।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







