বাংলা সিনেমার এক কালজয়ী গান ‘বিমূর্ত এই রাত্রি আমার’। প্রখ্যাত চলচিত্রকার প্রয়াত আলমগীর কবিরের পরিচালনায় ৭৫ সালে ‘সীমানা পেরিয়ে’ ছবির জন্য এই গানটিতে প্লেব্যাক করেন জনপ্রিয় শিল্পী আবিদা সুলতানা। ৭৭ সালে ‘সীমানা পেরিয়ে’ মুক্তি পায়। সিনেমাতে এই গানে ঠোঁট মিলিয়েছেন সদ্য প্রয়াত প্রখ্যাত অভিনেত্রী স্নিগ্ধ সুন্দরী জয়শ্রী কবির।
দুই আকর্ষণীয়া আবিদা সুলতানা আর জয়শ্রী কবিরের দ্বৈরথে নিবেদিত এই গানটি দীর্ঘ পঞ্চাশ বছর পেরিয়ে গেলেও জনপ্রিয়তায় একবিন্দুও ছেদ ঘটেনি! বরং গানটির আকর্ষণ আরও বেড়েই চলেছে। এই গানটি সব প্রজন্মের কাছেই এখন সমান জনপ্রিয়। আর তাই বন্ধুদের আড্ডা-পারিবারিক অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অনুষ্ঠানেও এই গানটি সমানভাবে সমাদৃত। যুগ যুগ ধরে তাই এই গান শ্রোতা-দর্শকদের এক মায়ায় মোহবিষ্ট করে রেখেছে।
এই গানটি শুনলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে এই গানের গায়িকা আবিদা সুলতানা আর সিনেমাতে যিনি লিপ করেছিলেন সেই সুঅভিনেত্রী সুনয়না ক্লাসিক্যাল বিউটি সমৃদ্ধ জয়শ্রী কবির। এই গানের এই দুই আইকনের একজন অভিনেত্রী জয়শ্রী কবির সদ্য প্রয়াত হয়েছেন। যিনি মৃত্যু অব্দি অন্তরালেই ছিলেন।
গত ১২ জানুয়ারি লন্ডনের রমফোর্ড নার্সিং হোমে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর প্রয়াণের খবর সোশাল মিডিয়াতে আসতেই ‘বিমূর্ত এই রাত্রি আমার’ গানটি যেনো সবাইকে আরও ভীষণভাবে স্মৃতিকাতর করে তোলে। এই এক গানেই অভিনেত্রী জয়শ্রী কবিরের শৈল্পিক অভিনয় দক্ষতা অনুভব করা যায় এক নিমিষেই। বলতে দ্বিধা নেই এই গানটি মোহময়, প্রাণবন্ত হয়েছে জয়শ্রী কবিরের অপূর্ব অভিনয়ের কারণে। এই গানের প্লেব্যাক সিঙ্গার অবিদা সুলতানা পঞ্চাশ বছর পরেও সেটাই মনে করেন।
কণ্ঠশিল্পী আবিদা সুলতানা জানান, ৭৫ সালের কথা। এই গানটি তিনি গাওয়ার জন্য যখন পরিচালক আলমগীর কবিরের কাছ থেকে অফার পান তখন সবে ইন্টারমিডিয়েট ক্লাসের ছাত্রী। সেগুনাবাগিচাস্থ সঙ্গীত কলেজে পড়েন। ওস্তাদ বারীণ মজুমদার ছিলেন এই কলেজের অধ্যক্ষ। সে সময় পরিচালক আলমগীর কবির এই গানটিতে প্লেব্যাক করার জন্য তাঁকে নির্বাচন করেন। একদিন আলমগীর কবির নিজে নয়াপল্টনস্থ আবিদা সুলতানাদের বাসায় গিয়ে তাঁর বাবাকে বুঝিয়ে বলেন-গানটিতে তাঁর মেয়ে প্লেব্যাক করবে। গানটি কলকাতাতে রেকর্ডিং হবে সে কথাও জানান। পওে দিন তারিখ ঠিক হলে গানটির রেকর্ডিং এর জন্য আবিদা সুলতানা ‘সীমানা পেরিয়ে’ ছবির পরিচালক আলমগীর কবিরের সাথে কলকাতাতে যান। সাথে বড় বোন রেবেকা সুলতানা এবং দুলাভাই শফিউল্লাহকে নিয়ে যান। কলকাতাতে গিয়ে সদর স্ট্রীট-এ ‘হোটেল লিটন’ এ উঠেন। এরপর গানটির রেকর্ডিং-এ অংশ নেন।
আবিদা সুলতানা আরও জানান, কলকাতার বাবুরাম ঘোষ রোডে ছিল ‘টেকিনিশিয়ান স্টুডিও’। কলকাতার প্রখ্যাত সব শিল্পীদের গান ওখানে রেকর্ডিং হতো। ৭৫ এর টালমাতাল নভেম্বরে মাসে এই গানটির রেকর্ডিং হয় ওখানেই। রেকর্ডিং-এর আগে তিনি গানটি হাতে পান। গানটি ছিল এক দীর্ঘ কবিতা। যেখানে অনেক শব্দ আবার খুবই কঠিন। সুরকার ভূপেন হাজারিকা ও পরিচালক আলমগীর কবীর আবিদা সুলতানাকে অভয় দেন। অতঃপর স্টুডিওতে দুইবার গানটি টেক করা হয়। রেকর্ডিং-এর সময় অভিনেত্রী জয়শ্রী কবিরও স্টুডিওতে উপস্থিত হন। তরুণী আবিদা সুলতানা ছবির পরিচালক ও সুরকারের নির্দেশমতো গানের প্রতিটি শব্দকে মায়াময় করতে নিজেকে উড়াড় করে দেন।
৭৭ সালে ‘সীমানা পেরিয়ে’ ছবিটি মুক্তি লাভ করে। ‘সীমানা পেরিয়ে’ ছিল একটা ক্লাসিক্যাল ছবি। বাণিজ্যিক ছবির ভীড়ে এটি ছিল অন্যরকম এক গল্প নিয়ে তৈরি এক সিনেমা। ছবিটি মুক্তি পাওয়ার পর এই গানটি সবার হ্নদয়ে দাগ কাটতে সক্ষম হয়। শিল্পী আবিদা সুলতানা সে সময়কার স্মৃতি হাতড়িয়ে বলেন, ‘আসলে আমার গাওয়া এই গানটির প্রাণ কিন্তু অভিনেত্রী জয়শ্রী কবির। যাকে আমি ভাবী বলে সম্বোধন করতাম।। কেননা তাঁর অসাধারণ লিপে গানটি আরও বেশি হ্নদয়গ্রাহী হয়। গানটি তাই জনমানসে অন্যরকম এক মোহ তৈরি করে ও ছাপ ফেলে। গানের কথার সাথে তাঁর শৈল্পিক অভিনয়, এক্সপ্রেশনস (অভিব্যক্তি) গানটিকে আরও উচ্চমাত্রায় নিয়ে যায়। ছবির কাহিনীর সাথে গানটিকে অনবদ্যভাবে ফুটিয়ে তোলার অসাধারণ কাজটি তিনিই করেন। জয়শ্রী ভাবীর মৃত্যুর খবরে আমার খারাপ লেগেছে। ভীষণ স্মৃতিকাতরও হয়েছি। জয়শ্রী ভাবীর সাথে অনেকবার দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে। উনার ইকবাল রোডের বাসাতেও গিয়েছি। আলমগীর কবীর ভাই একবার কোনো এক কাজে আমাকে উনার বাসায় পাঠিয়েছিলেন। উনি চলে গেলেন ভালোবাসা আর এক বিষাদময় উপখ্যান রেখে।’
৭৭ সালে সীমানা পেরিয়ে ছবিতে অভিনয়ের জন্য বুলবুল আহমেদ শ্রেষ্ঠ অভিনেতা, পরিচালক আলমগীর কবির শ্রেষ্ঠ সংলাপ রচিয়তা, এম. এ মবিন শ্রেষ্ঠ চিত্রগ্রাহক (রঙিন), বশীর হোসেন শ্রেষ্ঠ সম্পাদনা ক্যাটাগরিতে জাতীয় চলচিত্র পুরস্কার পেলেও সঙ্গীত বিভাগে ‘বিমূর্ত এই রাত্রি আমার’ গানটি বিবেচিত হয়নি। আবার ‘সীমানা পেরিয়ে’ ছবিতে অভিনয়ের কারণে বুলবুল আহমেদ শ্রেষ্ঠ অভিনেতা নির্বাচিত হলেও জয়শ্রী কবিরকে বাদ রাখা হয়।
আবিদা সুলতানা বলেন, সেসময় কেন গানটি জাতীয় চলচিত্র পুরস্কার পেল না তা এখনও বোধগম্য না। অথচ শৈল্পিক মানে গানটি ছিল উচ্চমাত্রার। অবশ্য এতে কোনো দুঃখ নেই। তবে এই গানের সেই অদ্ভুত মাদকতা এখনও শ্রোতাদের হ্নদয় স্পর্শ করে। সব প্রজন্মের কাছেই এই গানটির আবেদন ও জনপ্রিয়তা অন্যরকম। আমি ও জয়শ্রী ভাবী জনগণের কাছ থেকেই তাই সবচেয়ে বড় পুরস্কার পেয়েছি বললে ভুল হবে না। সেই ভালোবাসা নিয়েই আছি। ‘বিমূর্ত এই রাত্রি আমার’-এই গানটি আবিদা, জয়শ্রী, ভূপেন হাজারিকা, আলমগীর কবিরের সম্মিলিত এক প্রতিচ্ছবি। এই গানই আমাদের বাঁচিয়ে রাখবে।’








