বাংলাদেশে শীতের ধরন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যে পরিবর্তন এসেছে, তা অতীত ও বর্তমানের তুলনায় এখন আরও স্পষ্টভাবে চোখে পড়ছে। এক সময় দেশের শীত মানেই ছিল দীর্ঘস্থায়ী কুয়াশা, হিমেল বাতাস আর তীব্র ঠাণ্ডার দাপট। বিশেষ করে ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় সর্বনিম্ন ২.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড হওয়ার ঘটনা এখনও মানুষের মনে গভীরভাবে দাগ কেটে আছে। সে সময় দেশের উত্তরাঞ্চলে একাধিক দফায় তীব্র শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যায়। দিনের পর দিন সূর্যের দেখা মেলেনি, ঘন কুয়াশায় ঢেকে ছিল মাঠঘাট ও সড়ক। হিমেল বাতাসে কৃষিকাজ ব্যাহত হয়, দিনমজুর ও শ্রমজীবী মানুষ কাজ হারান, আর শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া ও ঠাণ্ডাজনিত রোগের ঝুঁকি মারাত্মকভাবে বেড়ে যায়। জানুয়ারি মাসজুড়েই তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক নিচে অবস্থান করেছিল, ফলে শীত ছিল দীর্ঘ, গভীর ও কষ্টকর।
কিন্তু বর্তমান শীত মৌসুমে (২০২৫–২০২৬) সেই চিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এক সময় যে পঞ্চগড় বা দিনাজপুর ছিল শীতের প্রতীক, সেখানে এবার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা সাধারণত ৭ থেকে ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যেই ঘোরাফেরা করছে, যা আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে শীত এখনো অনুভূত হলেও তা অনেকটাই স্বল্পস্থায়ী; কয়েকদিন ঠাণ্ডা থাকলেও দ্রুতই তাপমাত্রা আবার স্বাভাবিকের দিকে ফিরে যাচ্ছে। রাজধানী ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ এলাকায় শীতের তীব্রতা আরও কম—এখানে তাপমাত্রা সাধারণত ১৩ থেকে ১৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। আর খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে শীত আরও হালকা; অনেক রাতে তাপমাত্রা ১৫ থেকে ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামেই না।
এই ভৌগোলিক পার্থক্য স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে উত্তরাঞ্চল এখনো তুলনামূলকভাবে ঠাণ্ডা থাকলেও সার্বিকভাবে দেশের সব জেলাতেই শীতের তীব্রতা আগের চেয়ে কমছে। একই সঙ্গে শীতের ধরনও বদলাচ্ছে—দীর্ঘ ও ধারাবাহিক শীতের বদলে এখন দেখা যাচ্ছে খণ্ড খণ্ড ঠাণ্ডা আবহাওয়া, যার স্থায়িত্ব খুব বেশি নয়। আবহাওয়াবিদ ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবেই এই রূপান্তর ঘটছে। ভবিষ্যতে উত্তর ও দক্ষিণের তাপমাত্রার পার্থক্য আরও কমে আসতে পারে, ফলে বাংলাদেশের শীত ক্রমেই “কম ঠাণ্ডা কিন্তু অনিশ্চিত” রূপ ধারণ করবে—যেখানে কখনো হালকা ঠাণ্ডা, কখনো হঠাৎ শৈত্যপ্রবাহ, আবার কখনো প্রায় বসন্তসুলভ আবহাওয়া একই মৌসুমে দেখা যেতে পারে।






