অপরাধ

পুলিশকে ‘অরাজনৈতিক’ রাখার কথা বললেই কি সম্ভব?

পুলিশকে ‘অরাজনৈতিক’ রাখার কথা বললেই কি সম্ভব?

দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও টেকসই রাখতে পুলিশ বাহিনীর নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও প্রশাসন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, পুলিশ যদি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে সংবিধান ও আইনের প্রতি দায়বদ্ধ থাকে, তাহলে নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সহজ হবে এবং জনআস্থাও বাড়বে।

পুলিশকে ‘অরাজনৈতিক’ রাখতে হবে শুধু ঘোষণা দিলেই কি তা সম্ভব? নাকি প্রয়োজন গভীর কাঠামোগত সংস্কার, আইনি সুরক্ষা ও জবাবদিহির কার্যকর ব্যবস্থা?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুলিশ রাষ্ট্রের একটি প্রতিষ্ঠান, কোনো রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীর নয়। দলীয় আনুগত্যের সংস্কৃতি গড়ে উঠলে আইন প্রয়োগে বৈষম্য, হয়রানি ও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ বাড়তে পারে। এতে জনগণের আস্থা কমে যায় এবং অপরাধ দমন কার্যক্রমও দুর্বল হয়ে পড়ে।

এদিকে, বিএনপির নেতৃত্বে নতুন সরকারের সামনে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীতে জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী গণতান্ত্রিক সংস্কার করা হবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ

সম্প্রতি সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন দপ্তর ও সংস্থার প্রধানদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি বলেন, দীর্ঘ দেড় যুগ পর একটি স্বচ্ছ নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক সরকার গঠিত হয়েছে। ফলে জনগণের প্রত্যাশা বেড়েছে এবং সেই প্রত্যাশা পূরণে সরকার নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে কাজ করছে।

সাবেক পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, পদায়ন ও বদলির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনার পরিবর্তে পেশাদার দক্ষতা ও সততাকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটগুলোতে অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়া এবং অভ্যন্তরীণ জবাবদিহিতা জোরদার করা প্রয়োজন।

সাবেক আইজিপি আশরাফুল হুদা

বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক আশরাফুল হুদা চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, বর্তমানে একটি নির্বাচিত সরকার রয়েছে এবং প্রশাসনিক শৃঙ্খলা পুনর্বিন্যাসের সুযোগ তৈরি হয়েছে। নতুন নিয়োগ ও বদলিতে পেশাদারিত্ব, মেধা ও সততাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

তিনি আরও বলেন, পুলিশ বাহিনীর সক্ষমতা বাড়াতে আধুনিক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত, সিসিটিভি নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ এবং স্বাধীন অভিযোগ তদন্ত ব্যবস্থা চালু করা জরুরি। এতে বাহিনীর প্রতি জনগণের আস্থা বাড়বে।

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ওমর ফারুক চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা, নির্বাচনী সহিংসতা, কিশোর গ্যাং তৎপরতা, সাইবার অপরাধ ও চাঁদাবাজির কারণে জনমনে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাই নতুন সরকারের জন্য এখনই আস্থা পুনরুদ্ধারের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ওমর ফারুক

তিনি বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত, দ্রুত বিচার, কমিউনিটি পুলিশিং জোরদার এবং সাইবার অপরাধ দমনের মাধ্যমে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্গঠন, নৈতিক মান উন্নয়ন এবং প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের মাধ্যমে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা বাড়ানো হবে। এ জন্য প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ ও পরিকল্পনা প্রণয়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সাবেক আইজিপি আশরাফুল হুদা বলেন, নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশের কার্যকর ভূমিকা ইতিবাচক দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, পুলিশকে দলীয়করণ করা হলে শুধু আইন-শৃঙ্খলা নয়, রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

মানবাধিকারকর্মীরাও বলছেন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার নামে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ বা হয়রানি করা হলে তা দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তাই নাগরিক অধিকার রক্ষা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো, বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত করা এবং জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধি করতে পারলে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি সম্ভব। আইন-শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধার তাই শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়, বরং সরকারের প্রতি জনআস্থা পুনর্গঠনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

বিষয়:নিরাপত্তা বিশ্লেষক পুলিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…