বাংলাদেশের মাছের ঝোল থেকে ভারতের চিকেন কারি, সুদানের উটের বিরিয়ানি কিংবা মালয়েশিয়ার লাকসা, বিশ্বের নানা দেশের রান্নায় হলুদের ব্যবহার রয়েছে। খাবারে রং ও স্বাদ বাড়ানোর পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে হলুদকে নানা স্বাস্থ্য উপকারের সঙ্গেও যুক্ত করা হয়। তবে হলুদ বা এতে থাকা কারকিউমিন আদৌ কতটা উপকারী, তা নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এখনো নিশ্চিত সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি।
সংবাদমাধ্যম বিবিসি বাংলা এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ার রান্নায় হাজার বছর ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসা হলুদের প্রায় ৩০টি জাত রয়েছে। এশিয়া, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলে এর ব্যবহার রয়েছে। দক্ষিণ এশীয় অভিবাসীদের মাধ্যমে হলুদের ব্যবহার বালি ও ফিজি থেকে ক্যারিবীয় অঞ্চল পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে।
খাদ্যবিষয়ক গবেষক ও পডকাস্টার রাগিনি কাশ্যপ বলেন, তার পরিবারের শিকড় পাঞ্জাবে হওয়ায় হলুদ তাদের রান্নার অবিচ্ছেদ্য অংশ। অসুস্থ হলে হলুদ ব্যবহার তার কাছে এক ধরনের স্বস্তি ও পারিবারিক স্মৃতির সঙ্গে জড়িত।
কাশ্যপের মতে, প্রায় আড়াই হাজার বছর আগের বিভিন্ন লেখাতেও হলুদের উল্লেখ পাওয়া যায়। দক্ষিণ এশিয়ায় এর জীবাণুনাশক ও প্রদাহনাশক গুণ রয়েছে বলে দীর্ঘদিনের বিশ্বাস রয়েছে। ভারতের বিভিন্ন বিয়ের অনুষ্ঠানেও হলুদের বিশেষ ব্যবহার রয়েছে। বিয়ের আগে বর-কনের গায়ে হলুদ মাখানোর রীতি এরই একটি উদাহরণ।
কারকিউমিন নিয়ে বাড়ছে আগ্রহ
হলুদের সম্ভাব্য স্বাস্থ্য উপকারিতা নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোতেও আগ্রহ বেড়েছে। বিশেষ করে হলুদে থাকা কারকিউমিন নামের যৌগকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সাপ্লিমেন্ট বাজারজাত করা হচ্ছে। এসব পণ্যে হাড় ও জয়েন্টের স্বাস্থ্য ভালো রাখা থেকে শুরু করে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর মতো নানা দাবি করা হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও হলুদ ব্যবহারের ইতিবাচক অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে পড়ায় এর জনপ্রিয়তা বাড়ছে বলে মনে করেন কাশ্যপ। তার মতে, বিপুলসংখ্যক মানুষ কোনো একটি উপাদানের উপকারিতায় বিশ্বাস করলে সেই ধারণা বিশ্বজুড়ে শক্তিশালী প্রভাব তৈরি করতে পারে।
রাসায়নিক গঠন নিয়েও প্রশ্ন
তবে হলুদের স্বাস্থ্য উপকারিতা নিয়ে সংশয় রয়েছে গবেষকদের একটি অংশের। যুক্তরাষ্ট্রের রসায়নবিদ ড. ক্যাথরিন নেলসন কারকিউমিন নিয়ে শতাধিক গবেষণাপত্র পর্যালোচনা করেছেন।
তার মতে, কারকিউমিনকে নিয়ে এমন অনেক দাবি রয়েছে যেন এটি প্রায় সব ধরনের সমস্যার সমাধান করতে পারে। কিন্তু বৈজ্ঞানিক প্রমাণ সেই দাবিকে সমর্থন করে না।
ড. নেলসনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, কারকিউমিন অত্যন্ত প্রতিক্রিয়াশীল একটি যৌগ এবং গবেষণাগারে ব্যবহৃত পরীক্ষায় এটি কখনো কখনো এমন ফল তৈরি করতে পারে, যাতে মনে হয় যৌগটি কার্যকর। অথচ বাস্তবে এর কোনো চিকিৎসাগত প্রভাব নাও থাকতে পারে।
এ ছাড়া মুখে খাওয়ার পর কারকিউমিনের খুব সামান্য অংশই রক্তে প্রবেশ করে। শরীরে এর শোষণ বাড়াতে অনেকে কালো মরিচের সঙ্গে হলুদ খেয়ে থাকেন।
বড় গবেষণাতেও মেলেনি প্রত্যাশিত ফল
কানাডার লন্ডন হেলথ সায়েন্সেস সেন্টারের কিডনি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক অমিত গার্গ ও তার সহকর্মীরা হলুদ নিয়ে বড় দুটি গবেষণা পরিচালনা করেছেন। গবেষণাগুলোর ফলও হলুদের বহুল প্রচলিত স্বাস্থ্য দাবির পক্ষে শক্ত প্রমাণ দিতে পারেনি।
প্রথম গবেষণায় অ্যাওর্টিক অ্যানিউরিজমের অস্ত্রোপচারের পর রোগীদের কিডনির ক্ষতি ও প্রদাহ কমাতে কারকিউমিন কার্যকর কি না, তা পরীক্ষা করা হয়। প্রায় ৬০০ রোগীর ওপর পরিচালিত এই গবেষণায় কারকিউমিনের উপকারী প্রভাবের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এরপর কিডনি রোগীদের নিয়ে আরেকটি গবেষণা করা হয়। এতে কারকিউমিনের আরও ছোট কণার একটি সংস্করণ ব্যবহার করে কিডনির স্বাস্থ্য উন্নত করা বা রোগের অগ্রগতি ঠেকানো সম্ভব কি না, তা পরীক্ষা করা হয়। সেখানেও কার্যকারিতার প্রমাণ মেলেনি।
অধ্যাপক গার্গ বলেন, গবেষণা শুরুর সময় তারা বিষয়টি নিয়ে খোলা মনেই ছিলেন। কারকিউমিন কাজ করে না, তা প্রমাণ করাই তাদের উদ্দেশ্য ছিল না। ফলাফল আশানুরূপ না হওয়ায় তারা হতাশ হয়েছিলেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাকৃতিক কোনো উপাদান থেকে একটি নির্দিষ্ট যৌগ আলাদা করে সেটিকে ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করা এবং খাবারে পুরো উপাদানটি ব্যবহার করার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। তাই গবেষণায় কারকিউমিনের নির্দিষ্ট প্রভাব না পাওয়া মানেই রান্নায় হলুদ ব্যবহার ক্ষতিকর, এমনটা বলা যায় না।
দামি হলুদ সাপ্লিমেন্ট কেনার ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন অধ্যাপক গার্গ। তার মতে, এসব পণ্যের কার্যকারিতা নিয়ে যথেষ্ট উচ্চমানের প্রমাণ নেই। প্রাকৃতিক স্বাস্থ্যপণ্যগুলো প্রচলিত ওষুধের মতো একই মাত্রার নিয়ন্ত্রণের আওতায়ও পড়ে না।
তার পরামর্শ, কোনো উপাদানের নির্দিষ্ট স্বাস্থ্য উপকারিতার দাবি করা হলে তা উচ্চমানের বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ভিত্তিতে হওয়া উচিত।
তবে খাবারের অংশ হিসেবে হলুদ খাওয়াকে তিনি নিরুৎসাহিত করছেন না। বরং হলুদ দিয়ে তৈরি খাবার উপভোগ করলে তা খাওয়া চালিয়ে যেতে পারেন বলেই মত দিয়েছেন তিনি।










