তথ্যপ্রযুক্তি

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অবাধ তথ্য প্রবাহ নিশ্চিতে সহায়ক নাকি অন্তরায়?

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অবাধ তথ্য প্রবাহ নিশ্চিতে সহায়ক নাকি অন্তরায়?

ছবি: সংগৃহীত।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই অবাধ তথ্য প্রবাহ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একাধারে যেমন একটি শক্তিশালী সহায়ক বা চালিকাশক্তি, ঠিক তেমনি এটি তথ্যের সত্যতা ও নিরাপত্তার জন্য একটি বড় অন্তরায় বা বাধা। বর্তমান বিশ্বে এআই তথ্য প্রবাহের ক্ষেত্রে একটি দুধারী তলোয়ারের মতো কাজ করছে।

সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক তথ্য অধিকার দিবস। ‘তথ্যের অবাধ প্রবাহ ও জনগণের জানার অধিকার’ নিশ্চিত করার প্রত্যয়ে বাংলাদেশে আজ যথাযথ মর্যাদায় পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক তথ্য অধিকার দিবস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে সেমিনার, র‍্যালি এবং বিভিন্ন সচেতনতামূলক কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি উদযাপন করা হচ্ছে।

এবারের তথ্য অধিকার দিবসের মূল লক্ষ্য হলো—প্রযুক্তির এই যুগে সর্বস্তরের মানুষের কাছে সঠিক ও বস্তুনিষ্ঠ তথ্য পৌঁছানোর পথ সুগম করা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) মতো নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে সুশাসন নিশ্চিত করা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিতামূলক সমাজ গঠনে তথ্যের অধিকার নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।

যেভাবে এআই অবাধ তথ্য প্রবাহে “সহায়ক” ভূমিকা রাখছে:

  • তথ্যপ্রাপ্তি সহজ ও দ্রুত করা: এআই-চালিত সার্চ ইঞ্জিন এবং চ্যাটবটগুলো (যেমন চ্যাটজিপিটি, জেমিনি) কোটি কোটি ডেটা থেকে মুহূর্তের মধ্যে সুনির্দিষ্ট তথ্য খুঁজে মানুষের সামনে উপস্থাপন করতে পারে। ফলে সাধারণ মানুষের তথ্য পাওয়ার প্রক্রিয়া অনেক দ্রুত হয়েছে।
  • ভাষাগত বাধা দূরীকরণ: এআই রিয়েল-টাইম অনুবাদ প্রযুক্তির (যেমন গুগল ট্রান্সলেট বা অন্যান্য অনুবাদ টুল) ব্যাপক উন্নতি ঘটিয়েছে। এর ফলে এক ভাষার মানুষ অন্য যেকোনো ভাষার তথ্য নিজের মাতৃভাষায় পড়তে ও বুঝতে পারছে, যা বিশ্বব্যাপী তথ্যের অবাধ প্রবাহকে ত্বরান্বিত করছে।
  • বিশাল ডেটার সহজ বিশ্লেষণ: জটিল বৈজ্ঞানিক গবেষণা, আইনি নথিপত্র বা বড় বড় সরকারি রিপোর্টের জটিল তথ্যকে এআই খুব সহজে সংক্ষেপ বা সামারি করতে পারে। এটি সাধারণ মানুষের জন্য কঠিন তথ্য সহজে হজম করার সুযোগ করে দিচ্ছে।
  • সাংবাদিকতা ও তথ্য প্রকাশে গতি: সংবাদ মাধ্যমগুলো এখন প্রাথমিক ডেটা প্রসেসিং, ট্রান্সক্রিপশন (কণ্ঠ থেকে লেখা) এবং সাধারণ প্রতিবেদন তৈরির কাজে এআই ব্যবহার করছে। এতে তথ্য প্রকাশের গতি অনেক বেড়েছে।

যেভাবে এআই অবাধ তথ্য প্রবাহে “অন্তরায়” বা বাধা সৃষ্টি করছে:

  • ভুয়া তথ্য ও ডিপফেক: এআই-এর মাধ্যমে নিখুঁতভাবে ভুয়া ছবি, অডিও এবং ভিডিও তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে, যা ‘ডিপফেক’ নামে পরিচিত। এর ফলে ইন্টারনেটে বিভ্রান্তিকর এবং ভুয়া তথ্যের সয়লাব ঘটছে, যা আসল ও নকল তথ্যের মধ্যকার পার্থক্য মুছে দিচ্ছে।
  • অ্যালগরিদমিক ফিল্টার বাবল: ফেসবুক, ইউটিউব বা এক্স (টুইটার)-এর মতো সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো ব্যবহারকারীর পছন্দ অনুযায়ী তথ্য দেখানোর জন্য এআই অ্যালগরিদম ব্যবহার করে। এর ফলে একজন ব্যবহারকারী কেবল তার মতাদর্শের তথ্যই বারবার দেখতে পান। এটি তথ্যের উন্মুক্ততা কমিয়ে মানুষকে একমুখী বা পক্ষপাতদুষ্ট চিন্তার দিকে ঠেলে দেয়।
  • এআই হ্যালুসিনেশন: অনেক সময় এআই মডেলগুলো সম্পূর্ণ কাল্পনিক বা ভুল তথ্যকে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে সত্য বলে উপস্থাপন করে। ব্যবহারকারীরা যাচাই না করে এই তথ্য বিশ্বাস করলে সমাজে ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়ে।
  • তথ্যের একচেটিয়াকরণ: বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো (যেমন টেক জায়ান্টরা) এআই মডেলগুলোর নিয়ন্ত্রণ করছে। তারা কোন তথ্যটিকে প্রাধান্য দেবে এবং কোনটিকে আড়াল করবে, তা পর্দার আড়ালে তাদের নিজস্ব অ্যালগরিদম দিয়ে ঠিক করতে পারে, যা তথ্যের নিরপেক্ষ প্রবাহের পরিপন্থী।

এআই নিজেই ভালো বা খারাপ নয়, বরং এর ব্যবহারের উদ্দেশ্য এবং নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ওপর এর প্রভাব নির্ভর করে। যদি সঠিক নীতিমালা, সাইবার নিরাপত্তা আইন এবং তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের (ফ্যাক্ট চেকিং) জন্য এআই-কে দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করা যায়, তবে এটি অবাধ তথ্য প্রবাহের সবচেয়ে বড় সহায়ক হতে পারে। অন্যথায়, এটি অপতথ্য ছড়ানোর সবচেয়ে বড় হাতিয়ারে পরিণত হবে।

বিষয়:অবাধ তথ্য প্রবাহআন্তর্জাতিক তথ্য অধিকার দিবসকৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…