সাংবাদিকতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
চ্যানেল আইয়ের ২৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ‘সাংবাদিকতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’ শীর্ষক বিশেষ আলোচনা সভার মূল প্রবন্ধ

ডিজিটাল দুনিয়ায় প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বর্তমান সময়ে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হচ্ছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। এআই কম্পিউটার সিস্টেম বা মেশিনের এমন একটি প্রযুক্তি, যা মানুষের মতো চিন্তা করতে, শিখতে এবং সমস্যার সমাধান করতে পারে। এআই বিশাল পরিমাণ তথ্য বা ডেটা বিশ্লেষণ করে বিভিন্ন প্যাটার্ন বা নিয়ম খুঁজে বের করে। নতুন তথ্য ও অভিজ্ঞতার আলোকে নিজেদের কার্যক্ষমতা প্রতিনিয়ত উন্নত করে এবং মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই বিভিন্ন বিষয়ে ও জটিল পরিস্থিতিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে বর্তমানে আমরা অদ্ভুত এক বৈপরীত্যের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছি। একদিকে এআই চিকিৎসাবিজ্ঞান, শিক্ষা, গবেষণা, কৃষি, ব্যবসা, যোগাযোগ, তথ্য বিশ্লেষণ থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে মানুষের সক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। একেবারে সাধারণ মানুষও এআইকে অনেকটাই বুঝতে শিখেছে। অন্যদিকে যত দিন যাচ্ছে, ততই এআইয়ের অপব্যবহার বাড়ছে। এআইয়ের কারণে বিঘ্নিত হচ্ছে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা। অপপ্রচার, ভুয়া ও বানোয়াট পরিসংখ্যান, তথ্য, ছবি ও ব্যাখ্যা প্রচার করে বিভ্রান্ত করছে মানুষকে। যার পরিপ্রেক্ষিতে এর গবেষক ও নির্মাতারাই প্রশ্ন তুলছেন, আমরা কি এমন এক বুদ্ধিমত্তা তৈরি করছি, যেটিকে একদিন আমরা আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারব না?
ইন্টারন্যাশনাল এআই সেফটি রিপোর্ট-২০২৬ বলছে, বর্তমান সিস্টেমগুলো এখনো নিয়ন্ত্রণ হারানোর মতো পর্যায়ে পৌঁছেনি। কিন্তু তারপরও খোদ এআইয়ের নির্মাতা ও গবেষকরাই এর ঝুঁকির ব্যাপারে মানুষকে সচেতন করার চেষ্টা করছেন। এআইয়ের ঝুঁকিগুলো কী কী? প্রথম ঝুঁকি হলো মিসঅ্যালাইনমেন্ট। ধরা যাক, আমরা এআইকে একটা লক্ষ্য দিলাম, কিন্তু মানুষের মূল্যবোধ ও প্রকৃত উদ্দেশ্যের সঙ্গে সেই লক্ষ্য পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ হলো না। শক্তিশালী এআই তখন এমনভাবে লক্ষ্যটি অর্জন করতে পারে, যা আমরা চাইনি।
দ্বিতীয় ঝুঁকি হলো প্রতারণা ও নিয়ন্ত্রণ হারানোর সম্ভাবনা। ভবিষ্যতে কোনো সিস্টেম যদি বুঝতে পারে কখন তাকে পরীক্ষা করা হচ্ছে, যদি সে পর্যবেক্ষণ এড়িয়ে যেতে পারে এবং নিজের উদ্দেশ্য গোপন করতে পারে—তাহলে প্রচলিত নিরাপত্তা পরীক্ষা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
তৃতীয় ঝুঁকি হলো এআইয়ের অপব্যবহার। এআই নিজে ‘খারাপ’ না হলেও একজন মানুষ, প্রতিষ্ঠান কিংবা রাষ্ট্র অত্যন্ত সক্ষম এআই ব্যবহার করে সাইবার হামলা, জৈবিক হুমকি, স্বায়ত্তশাসিত অস্ত্র বা গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় হামলার সক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে।
এআই নিয়ে চতুর্থ ঝুঁকিটি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যদি কোনো উন্নত এআই নিজেই গবেষণা, কোডিং এবং মডেল উন্নয়নে মানুষের চেয়ে দক্ষ হয়ে যায়, তবে এআই একেবারে মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
এআই সিস্টেমগুলো অতি দ্রুত সময়ের মধ্যে এত শক্তিশালী হয়ে ওঠায় এর ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে এআই বিকাশের গতি কমানোর পক্ষে একমত হয়েছেন প্রযুক্তিবিশ্বের শীর্ষ তিন ব্যক্তি। ‘অ্যানথ্রপিক’-এর প্রধান দারিও আমোদেই এআই মডেলগুলোর উন্নয়নের গতি কমানোর আহ্বান জানানোর পর তাতে সমর্থন জানিয়েছেন ‘ওপেনএআই’-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা স্যাম অল্টম্যান এবং ‘এক্সএআই’-এর প্রতিষ্ঠাতা ইলন মাস্ক।
নানা শঙ্কা ও ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও এআইয়ের সহজলভ্য বিশাল তথ্যভাণ্ডার, সৃজনশীল সক্ষমতা, তথ্য ও ডেটার বহুমাত্রিক ব্যবহার, ব্যাখ্যা ও প্রকাশক্ষমতা এবং দৈনন্দিন কাজ সহজ করে দেওয়ার সামর্থ্য অতি অল্প সময়ের মধ্যেই তুমুল জনপ্রিয়তা এনে দিয়েছে নতুন এই প্রযুক্তিকে।
সাংবাদিকতা একটি সৃজনশীল ও সংবেদনশীল পেশা। এই পেশার সঙ্গে প্রযুক্তির রয়েছে নিবিড় সম্পর্ক। প্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিনিয়ত এই পেশার ধরন-ধারণ ও বৈশিষ্ট্যেরও পরিবর্তন হচ্ছে। একবিংশ শতাব্দীতে এসে প্রথমে সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হয় কম্পিউটার অ্যাসিস্টেড রিপোর্টিং (সিএআর)। এখন যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)।
বাংলায় এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছু সমস্যা
এআই প্রযুক্তির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ ডেটা। বাংলা ভাষা ও বাংলাভাষী মানুষের জীবনের বিভিন্ন কাজে এআইয়ের ব্যবহার শুরু হলেও এক্ষেত্রে কিছু সমস্যা ও সংকট বিদ্যমান। এগুলো হলো—
১. বাংলাদেশে মানসম্পন্ন ডেটাসেট তৈরি ও সংরক্ষণ কাঠামো দুর্বল। ফলে বিভিন্ন বিষয়ে এআই টুল ব্যবহার করে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পাওয়া যায় না;
২. সরকারি তথ্য অনেক ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্ন ও অগোছালো। যার ফলে বিশ্লেষণের জন্য অনেক রাষ্ট্রীয় বিষয়ে যথাযথ তথ্য, উপাত্ত ও ডকুমেন্ট পাওয়া সম্ভব হয় না;
৩. বেসরকারি খাতেও ডেটা ব্যবস্থাপনার মান সমন্বিত নয়। ফলে কোনো গ্রহণযোগ্য বিকল্প তথ্যসূত্র সহজলভ্য নয়;
৪. উন্নত মানের বাংলা ভাষার ডেটাসেট কম বিধায় বাংলা ভাষাভিত্তিক এআই। যেমন উন্নত অনুবাদ, ভয়েস রিকগনিশন বা ‘স্বর স্বীকৃতি’ এবং স্থানীয় প্রেক্ষাপট বোঝার মতো চ্যাটবট অপ্রতুল।
সুবিধার তালিকা অনেক বড়
নানাবিধ সমস্যা থাকার পরও বাংলাদেশেও বিভিন্ন সেক্টরে এআই ব্যবহারের ধারা এগিয়ে চলেছে। অভিজ্ঞজন এবং এআই ব্যবহারকারীরা এআইয়ের যেসব সুবিধা চিহ্নিত করেছেন, সেসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
ক. অটোমেশন বা স্বয়ংক্রিয়করণ: এআই বিভিন্ন কাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পাদন করতে পারে। যেমন- উৎপাদন প্রক্রিয়া, ডেটা বিশ্লেষণ এবং গ্রাহকসেবা। এটি সময় ও খরচ সাশ্রয় করে।
খ. দ্রুত ও নির্ভুল সিদ্ধান্ত: এআই বিশাল পরিমাণ ডেটা অতি অল্প সময়ে বিশ্লেষণ করে নির্ভুল সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম। যেমন- স্বাস্থ্যসেবায় রোগ নির্ণয়, আর্থিক খাতে প্রতারণা শনাক্তকরণ, ট্রাফিক আইন অমান্যকরণ শনাক্তকরণ ইত্যাদি।
গ. মানুষের পরিশ্রম কমানো: ঝুঁকিপূর্ণ ও ক্লান্তিকর কাজ, যেমন- মহাকাশ গবেষণা, খনিতে অনুসন্ধান বা দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকায় কাজ করার ক্ষেত্রে এআইয়ের ব্যবহার ঝুঁকি ও মানুষের পরিশ্রম কমিয়ে দেয়।
ঘ. উন্নত গ্রাহকসেবা: মানুষের বদলে চ্যাটবট ও ভার্চুয়াল সহায়তার মাধ্যমে সপ্তাহের প্রতিদিন সার্বক্ষণিক গ্রাহক সহায়তা প্রদান করা সম্ভব।
ঙ. শিক্ষা ও গবেষণায় সহায়তা: এআই শিক্ষার ক্ষেত্রে কাস্টমাইজড শিক্ষা পরিকল্পনা তৈরি করে এবং গবেষণার জন্য উন্নত ডেটা বিশ্লেষণ সরবরাহ করে।
চ. নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন: এআই বিভিন্ন ক্ষেত্র, যেমন স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় নতুন প্রযুক্তির উন্নয়নে ভূমিকা রাখে।
আছে কিছু সীমাবদ্ধতা
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও অটোমেশন ব্যবহারের কিছু সমস্যা ও সীমাবদ্ধতা এখানে উল্লেখ করা হলো-
ক. পক্ষপাতিত্ব ও বৈষম্য: এআই মডেল ব্যবহৃত প্রশিক্ষণ ডেটায় ত্রুটি থাকলে এটি নিয়োগ, বিচার বা সেবামূলক কাজে নির্দিষ্ট জাতি, গোষ্ঠী, লিঙ্গ বা শ্রেণির প্রতি বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এআই ডেটার ওপর ভিত্তি করে কাজ করে। যদি ডেটা ভুল বা পক্ষপাতপূর্ণ হয়, তাহলে এআইয়ের বিশ্লেষণ বা সিদ্ধান্তও ভুল হবে।
খ. গোপনীয়তা লঙ্ঘন: বিশাল পরিমাণ ব্যক্তিগত ডেটা সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াকরণের ফলে ব্যবহারকারীর গোপনীয়তা হুমকির মুখে পড়ে এবং ডেটা ফাঁসের ঝুঁকি বাড়ে।
গ. জবাবদিহিতার সংকট: অটোমেটেড সিস্টেম বা এআই কোনো ভুল বা ক্ষতিকর সিদ্ধান্ত নিলে তার দায়ভার কার—ডেভেলপার, প্রতিষ্ঠান নাকি স্বয়ং মেশিনের—তা নির্ধারণ করার মতো স্পষ্ট আইনি কাঠামো এখনো পুরোপুরি কার্যকর নয়।
ঘ. স্বচ্ছতার অভাব (ব্ল্যাকবক্স সমস্যা): অনেক সময় এআই কীভাবে একটি নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছায়, তার ভেতরের কার্যপ্রক্রিয়া বা যুক্তি মানুষ বা সংশ্লিষ্ট ভুক্তভোগীর কাছে স্পষ্ট বা বোধগম্য হয় না।
ঙ. নিয়ন্ত্রণ হারানোর আশঙ্কা: এআই সিস্টেম স্বয়ংক্রিয় হওয়ায় কখনো কখনো তা মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে কাজ করতে পারে।
চ. নির্ভরতা বৃদ্ধি: অতিরিক্ত এআই নির্ভরতা মানুষের সক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে।
ছ. সৃজনশীলতা চর্চার সংকট: এআই নির্ভরতা মানুষের সৃজনশীলতার চর্চা ও সৃজনশীল ভাবনা ও সক্ষমতাকে ভোঁতা করে দিতে পারে।
জ. নৈতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জ: এআই ব্যবহারে অনেক নৈতিক ও সামাজিক প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। যেমন—স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে মানবিক বিষয় লক্ষ্য না করা, মানুষ ও যন্ত্রের মধ্যে সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো পার্থক্য না থাকা ইত্যাদি।
ঝ. কর্মসংস্থান ও শ্রমবাজারের ঝুঁকি: শিল্পকারখানা ও দাপ্তরিক কাজে অতিরিক্ত অটোমেশনের কারণে মানুষের কাজের সুযোগ কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
ঞ. মেধাস্বত্ব লঙ্ঘনের ঝুঁকি: এআই মডেলগুলো চালাতে প্রচুর তথ্যের প্রয়োজন হয়। তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রে মেধাস্বত্ব লঙ্ঘন হয়ে যায়।
সময়ের সঙ্গে পথ চলা
বর্তমান দুনিয়া হলো এআইয়ের দুনিয়া। সমস্যা, সংকট ও শঙ্কা যতই থাকুক না কেন, একে গ্রহণ না করার বা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কর্মসম্পাদনকারী ও কর্মের ফলাফল গ্রহণকারী কে না চায় কয়েক মাসের কাজ কয়েক ঘণ্টায় শেষ করতে?
বাংলাদেশের তরুণদের একটা বড় অংশ প্রযুক্তিতে আগ্রহী। প্রযুক্তিনির্ভর পেশায় সম্পৃক্ত এবং যুক্ত হতে আগ্রহী অনেক তরুণ। অনেকে প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিগত পর্যায়ে সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্টের কাজ করছেন। এজন্য তাদের এআই স্কিল শেখার প্রবণতা বাড়ছে।
এআই খাতে শুধু আগ্রহ যথেষ্ট নয়। গবেষণা ও শিল্প খাতের জন্য দরকার অভিজ্ঞ মেশিন লার্নিং প্রকৌশলী, এআই পণ্য ব্যবস্থাপক এবং নৈতিকতা ও নিরাপত্তা জ্ঞানের পেশাজীবী। এরই মধ্যে বাংলাদেশের তরুণ ফ্রিল্যান্সারদের অনেকে এআইভিত্তিক কাজ করে বিশ্ববাজারে নিজেদের ভালো অবস্থান তৈরি করেছেন।
অবস্থার অনিবার্যতায় সরকার জাতীয় এআই কৌশলপত্র প্রণয়ন করেছে। এই কৌশলপত্র শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষি খাতে এআই ব্যবহারের পথ দেখাবে। তবে বিভিন্ন খাতে অটোমেশন ও এআই ব্যবহারের কারণে সনাতন কিছু খাতে কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়বে।
বিজ্ঞান আশীর্বাদ না অভিশাপ এ নিয়ে বিতর্ক অনেক পুরোনো হলেও এতে কোনো সন্দেহ নেই যে বিজ্ঞান আমাদের করেছে আধুনিক, এগিয়ে নিয়ে চলেছে সভ্যতাকে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা—এআই প্রযুক্তি তৈরি করেছে অনেক সুযোগ। আবার ভুয়া ছবি ও ভিডিও, স্বয়ংক্রিয় ভুল তথ্য তৈরি, অনলাইন প্রতারণা এবং ব্যক্তিগত তথ্য অপব্যবহারের মতো ঝুঁকির মধ্যেও খুলছে সম্ভাবনার দুয়ার।
ভালো-মন্দ বাস্তবতা মিলিয়ে দেশে দেশে এআই অসীম সম্ভাবনার হাতছানি দিচ্ছে। বাংলাদেশও এই দুনিয়ার বাইরে নয়। স্বাভাবিকভাবেই সম্ভাবনার সমান্তরালে কিছু সীমাবদ্ধতাও সামনে চলে আসছে। এআইয়ের সম্ভাবনাকে ইতিবাচকভাবে কাজে লাগানোর জন্য প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট ও ইতিবাচক কর্মপরিকল্পনা। এর নেতিবাচক দিক বিবেচনা করে বাংলাদেশের সাইবার নিরাপত্তা ও তথ্য সুরক্ষা নিয়ে প্রণীত আইন ও নীতিমালায় এআই বিষয়ে পৃথক অনুচ্ছেদ রাখতে হচ্ছে।
সাংবাদিকতায় এআই
নতুন এই প্রযুক্তি সাংবাদিকতায় অনেক নতুন সুবিধা যুক্ত করেছে। নিউজরুমে সাংবাদিকরা যে ধরনের দায়িত্ব পালন করেন- যেমন অডিও ফাইলের প্রতিলিপি তৈরি, অনুবাদ ও টেক্সট সংরক্ষণের মতো কাজগুলো এখন সহজেই এআই টুলগুলোর মাধ্যমে সম্পাদন করা সম্ভব। প্রতিদিন ছোটখাটো অনুরোধ বা নির্দেশ দিয়ে জেনারেটিভ এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে টেক্সট ও ছবি তৈরি করা সম্ভব। এটি নিউজরুমের জন্য একদিকে যেমন সম্ভাবনা তৈরি করছে, অন্যদিকে নিউজরুমের কর্মীদের চাকরি কেড়ে নেওয়ার উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠাও সৃষ্টি করছে।
২০২২ সালে চ্যাটজিপিটি উন্মুক্ত হওয়ার পর থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গুরুত্ব বেড়ে গেছে। মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘ওপেনএআই’-এর তৈরি চ্যাটজিপিটি এখন ছোটখাটো নিউজরুমেও ব্যবহৃত হচ্ছে। এআই ব্যবহার করে গণমাধ্যম এমন প্রোগ্রাম তৈরি করতে পারে, যা তাদের আর্কাইভ থেকে ব্যাকগ্রাউন্ড তথ্য যোগ করতে পারে এবং তা ব্রেকিং নিউজে যুক্ত করে দিতে পারে।
দুই বছর আগে বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় অনলাইন ম্যাগাজিন ‘এভরিপিক্সেল’-এ পরিবেশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে এআই ব্যবহার করে যত ছবি তৈরি করা হয়েছে, তা পূর্ববর্তী ১৫০ বছরের আলোকচিত্রের ইতিহাসে সম্ভব হয়নি। গত দুই বছরে এআই ব্যবহার করে ছবি তৈরির পরিমাণ অনেক গুণ বেড়ে গেছে। কিন্তু এ নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে। আর তা হচ্ছে বিশাল এই কনটেন্টের ঢেউয়ের মাঝে প্রকৃত সংবাদ ও তথ্য কীভাবে খুঁজে পাওয়া যাবে?
ছবি বা ভিডিওকে বিকৃত ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে নিখুঁতভাবে হুবহু আসলের মতো তৈরি করে তা আসল বলে প্রচার করা হচ্ছে। এi বিষয়টি প্রযুক্তিজগতে ‘ডিপফেক’ নামে পরিচিত হয়ে উঠছে। বিশেষজ্ঞরা বিষয়টি ভয়ানক বিপদের কারণ হয়ে উঠেছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।
এআই নিয়ে সংকটসমূহের কিছু কিছু গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে খুবই গুরুতর সমস্যা তৈরি করছে এবং সমাজের শৃঙ্খলা, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও গণতন্ত্রের জন্য মারাত্মক হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ ব্যাপারে ইউনেস্কোর বক্তব্য, “এআই অবশ্যই ভুল করতে পারে। কমিয়ে দিতে পারে সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতা। সাংবাদিকদের চাকরির সুযোগ কমে যাওয়ার আশঙ্কা তো আছেই।”
সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠান ‘রিচ পিএলসি’ তাদের জাতীয় দৈনিক পত্রিকা ডেইলি মিরর, ডেইলি এক্সপ্রেস ও ডেইলি স্টারসহ একাধিক আঞ্চলিক সংবাদপত্রের ২২০ জন সংবাদকর্মীকে ছাঁটাই করার চূড়ান্ত ঘোষণা দিয়েছে। এই ছাঁটাইয়ের কারণ হিসেবে ‘রিচ পিএলসি’ বলেছে, বর্তমান ডিজিটাল বাস্তবতায় প্রতিষ্ঠানের ব্যয় সংকোচনের জন্য এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির মতে, বর্তমান সময়ে পাঠকদের তথ্য খোঁজার ধরনে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। আধুনিক সার্চ ইঞ্জিনগুলো সরাসরি ফলাফল পাতায় এআইয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন সংক্ষেপে তুলে ধরছে। এর ফলে পাঠকদের সংবাদপত্রের মূল ওয়েবসাইটে প্রবেশের প্রবণতা মারাত্মকভাবে কমে গেছে, যাকে প্রযুক্তিবিশ্বে ‘জিরো-ক্লিক’ সংস্কৃতি বলা হচ্ছে। ওয়েবসাইটে ভিজিটর কমে যাওয়ায় প্রদর্শনভিত্তিক ডিজিটাল বিজ্ঞাপন থেকে আয় একেবারে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে।
বাংলাদেশে সংবাদপত্র শিল্প অনেক আগে থেকেই বিজ্ঞাপন কমে যাওয়া এবং প্রিন্ট সার্কুলেশন সংকুচিত হওয়ার মতো সমস্যার জটিলতায় ধুঁকছে। অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমগুলোও দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং সার্চ ইঞ্জিনের রেফারেল ট্রাফিকের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে। এর মধ্যেই আন্তর্জাতিক সার্চ ইঞ্জিন ও স্থানীয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এআই ওভারভিউ কিংবা চ্যাটবটের প্রসার সরাসরি ডিজিটাল পোর্টালগুলোর পাঠকদের সাইটবিমুখ করছে।
দ্রুত ছড়িয়ে পড়া এআই প্রযুক্তির কারণে সাংবাদিকরাও এখন নানাবিধ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছেন। ব্যক্তিগত প্ল্যাটফর্মের পাশাপাশি বর্তমান বিশ্বের অনেক প্রধান সারির সংবাদমাধ্যম ও সংবাদ সংস্থা বিভিন্ন পরিসরে এআই ব্যবহার করছে। টেলিভিশনেও অনেক ক্ষেত্রে মানুষের বদলে সংবাদ পাঠ করছে এআই উপস্থাপক।
বাস্তবতা হলো, বর্তমানে সাংবাদিকতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ ও প্রভাব থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার উপায় নেই। এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো হলো, এআই যেন সত্যকে মিথ্যা আর মিথ্যাকে সত্য প্রমাণ করতে না পারে এবং কোনো ঘটনা, বিষয় ও ইস্যুর অতিরঞ্জিত প্রকাশ না ঘটাতে পারে। এখানে স্বাভাবিকভাবেই চলে আসে পক্ষপাতমুক্ত সাংবাদিকতা, নৈতিকতা ও দায়িত্বশীলতার মতো সাংবাদিকতার চিরায়ত বৈশিষ্ট্যগুলো।
অপব্যবহারের ঝুঁকি
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মারাত্মক উপসর্গ হলো ভুয়া সংবাদ ফটোকার্ড। এমন কোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী পাওয়া যাবে না, যিনি প্রতিদিন ভুয়া ফটোকার্ডের সম্মুখীন হন না।
এসব ডিপফেক কনটেন্ট তৈরির ক্ষেত্রে কোনো এডিটের প্রয়োজন হয় না। শুধু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অ্যাপে কিছু নির্দেশনা ও ছবি দিলে মুহূর্তেই তৈরি হয়ে যায় ভুয়া সংবাদ আধেয়। বাংলাদেশকেন্দ্রিক ফেসবুক ওয়ালে আমরা যে প্রতিদিন হাজার হাজার ফটোকার্ড দেখি, তার বেশিরভাগই ডিপফেক। এ প্রবণতাকে সহজলভ্য করছে এআই টুল।
এ ছাড়া ভুয়া উক্তি, মনগড়া সূত্র, মিথ্যা পরিসংখ্যান এবং সংবাদ উপস্থাপনে বিকৃত তথ্য উপস্থাপনে এআই টুল যথেচ্ছভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এখন এআই ব্যবহার করে কারও চেহারা ও কণ্ঠস্বর নকল করে তা দিয়ে পডকাস্ট তৈরি বা খবর পড়ানোর মতো কাজও করানো যায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অবাধ বিস্তৃতি এমনিতেই প্রচলিত সংবাদমাধ্যমগুলোকে নানাবিধ চ্যালেঞ্জের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এসব মাধ্যমে এআইয়ের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অনাবশ্যক এবং অনেক ক্ষেত্রে অতিরঞ্জিত, মিথ্যা ও ভুয়া তথ্য, ছবি, ভিডিও এবং এসব নিয়ে মনগড়া, বিভ্রান্তিকর ও উসকানিমূলক বক্তব্য ও ব্যাখ্যা।
যে কারণে সাংবাদিকতায় এআইয়ের ব্যবহার নিয়ে শঙ্কিত সবাই। কিন্তু প্রযুক্তিকে তো অবজ্ঞা করা যায় না। বিশেষত গণমাধ্যম শিল্পে সীমিত সম্পদের সঙ্গে নতুন প্রযুক্তি যুক্ত করার বিষয়টি প্রলুব্ধকর। আর তাই এআইয়ের নতুন ট্রেন্ড গণমাধ্যম মিস করবে, তা তো হতে পারে না।
২০২৫ সালে ইউনেস্কোর বৈশ্বিক গণমাধ্যম ও তথ্য স্বাক্ষরতা সপ্তাহে এক ধরনের বিশেষ প্রচারণা চালানো হয়েছিল। সে প্রচারণার স্লোগান ছিল- “এআইও ভুল করতে পারে (AI can make mistakes)।”
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নাগরিকদের মতিভ্রম ঘটাতে পারে। কারণ এআই টুলগুলো অনেক সময় পুরোপুরি ভুল আধেয় তৈরি করে থাকে, যার সঙ্গে বাস্তবতা ও সত্যতার কোনো সম্পর্ক নেই।
সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের ঝুঁকি হলো, সংবাদের জন্য তথ্য প্রক্রিয়াকরণে এআই টুলগুলো ইন্টারনেট পরিসরে ভাসতে থাকা তথ্যের সাহায্য নেয়। এক্ষেত্রে ভুল তথ্য, অপতথ্য ও বিদ্বেষমূলক তথ্যের ঝুঁকি প্রবল।
এখানে একটি বিষয় প্রণিধানযোগ্য। এআই টুল কিন্তু নির্দেশনা ছাড়া চলতে পারে না। আর এআই টুলের প্রক্রিয়াজাত করার ক্ষমতা মানব মস্তিষ্কের তুলনায় খুবই সীমিত। তাই সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে প্রতিবেদকের মস্তিষ্কের ওপর দৃঢ় আস্থা রাখা জরুরি। ইউনেস্কো এবং অনেক গণমাধ্যম এ ব্যাপারে একমত যে, একজন প্রতিবেদকের মস্তিষ্কই হলো এখন পর্যন্ত সবচেয়ে কার্যকর ও যথাযথ যাচাইকরণ টুল।
পৃথিবীর বিখ্যাত সংবাদপত্র, নিউজ পোর্টাল, টেলিভিশন ও মিডিয়া হাউজসহ সংশ্লিষ্টরা এ মর্মে একমত হয়েছে যে, সাংবাদিকের মূল কাজ সংবাদ সংগ্রহ ও প্রান্তিক স্তরে প্রতিবেদন তৈরি করা। এক্ষেত্রে এআই সহযোগীর ভূমিকা পালন করবে মাত্র।
আসল কাজটি করতে হবে মানুষকেই
এআই ব্যবহারের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে গণমাধ্যম পেশাজীবীরা সম্মত হয়েছেন যে সাংবাদিকতায় এখন বাড়তি কিছু যুক্ত করার বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। আর এই ভ্যালু অ্যাডিশনের কাজটি তারা করছেন এআই ব্যবহার করে।
তবে এক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছেন গুগল নিউজের ব্যবস্থাপক শৈলেন প্রকাশ। তিনি বলেছেন, “সাংবাদিক হিসেবে আপনিই আসল কাজটি করছেন। আমরা যে টুল বা প্রোগ্রামগুলো তৈরি করছি, তা আপনাকে সহায়তা করবে।”
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের লাগামহীন অগ্রগতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন চ্যাটজিপিটির নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘ওপেনএআই’-এর শীর্ষ গবেষক ও প্রধান বিজ্ঞানী ইয়াকুব পাচোকি। তিনি বলেছেন, “ভবিষ্যতে মানুষের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে এ খাতে আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারির প্রয়োজন রয়েছে।”
নিজের ব্লগে পাচোকি লিখেছেন, যেভাবে দ্রুত যন্ত্রের বুদ্ধিমত্তার বিকাশ ঘটছে, তার সুদূরপ্রসারী পরিণতি ঠেকানোর জন্য কেউ প্রস্তুত নয়।
সাম্প্রতিক সময়ে ‘ওপেনএআই’ ও ‘অ্যানথ্রপিক’সহ শীর্ষস্থানীয় বিভিন্ন এআই কোম্পানির গবেষণায় উঠে এসেছে, তাদের তৈরি বিভিন্ন এআই এজেন্ট স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করতে গিয়ে অন্যান্য কোম্পানির ওপর সাইবার আক্রমণ চালিয়েছে।
সাইবার আক্রমণ, ডিপফেক কনটেন্ট ইত্যাদি প্রসঙ্গ টেনে পাচোকি বলেছেন, “আমরা এমন এক ভবিষ্যতের দিকে পা বাড়াচ্ছি, যেখানে বিস্ময়কর রকম বুদ্ধিমান যন্ত্রের আবির্ভাব ঘটবে। এ রূপান্তর যাতে মানবজাতির জন্য কোনো সংকট তৈরি না করে, তা আমাদেরই নিশ্চিত করতে হবে।”
প্রয়োজন এআই ব্যবহারের নীতিমালা ও গাইডলাইন
সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে এআই ব্যবহারে নৈতিক নীতিমালা সাংবাদিকতার সততা ও জনমানুষের আস্থা বজায় রাখার জন্য অত্যন্ত জরুরি। নিম্নরূপ হতে পারে সংবাদ তৈরিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের ক্ষেত্রে অনুসরণীয় নীতিমালা—
ক. স্বচ্ছতা প্রকাশ: কোনো সংবাদ বা ছবির কোনো অংশ যদি এআই দিয়ে তৈরি বা পরিবর্তন করা হয়, তা পাঠক বা দর্শককে পরিষ্কারভাবে জানাতে হবে।
খ. মানুষের চূড়ান্ত নজরদারি: এআইয়ের তৈরি করা যেকোনো তথ্য বা প্রতিবেদন প্রকাশের আগে একজন মানব সম্পাদক বা সাংবাদিকের মাধ্যমে অবশ্যই তা যাচাই করে নিতে হবে।
গ. তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা: সংবাদের জন্য সংগৃহীত ব্যক্তিগত বা সংবেদনশীল তথ্য এআই টুলে ইনপুট দেওয়ার সময় সতর্ক থাকতে হবে, যেন ডেটার গোপনীয়তা নষ্ট না হয়।
ঘ. পক্ষপাতিত্ব রোধ: এআই মডেলগুলো অনেক সময় পক্ষপাতদুষ্ট তথ্য দিতে পারে। তাই সংবাদের ভারসাম্য ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সাংবাদিকেরই।
ঙ. কপিরাইট বা স্বত্বাধিকার সম্মান: অন্যের লেখা, ছবি বা কনটেন্ট অনুমতি ছাড়া এআই দিয়ে পুনর্লিখন বা ব্যবহার করা যাবে না।
সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে মূল মূল্যবোধ
সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে মূল মানগুলো এখানে উল্লেখ করছি-
১. মানুষের মর্যাদা ও মানবিকতাকে সম্মান ও প্রচার করা;
২. সুবিচার, শান্তি এবং আন্তঃসংযুক্ত সমাজের লালন;
৩. জীবনের বৈচিত্র্যময়তা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অবস্থা নিশ্চিত করা; এবং
৪. প্রকৃতি ও বাস্তুতন্ত্রের উন্নয়নে সহায়তা প্রদান।
ইউনেস্কোর মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের ক্ষেত্রে এই নীতি ও মানদণ্ড অনুসরণ মানবাধিকারকেন্দ্রিক সাংবাদিকতাকে আরও সমৃদ্ধ করবে।
সাংবাদিকতায় এআই ব্যবহারে ইউনেস্কোর ১০টি গাইডলাইন
১. সমানুপাতিক তথ্য প্রচার ও কারও ক্ষতির উদ্দেশ্যে কোনো কিছু প্রচার না করা;
২. কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী, শ্রেণি বা প্রতিষ্ঠানের জন্য নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার কারণ হয়, এমন কিছু প্রচার না করা;
৩. তথ্য ও ডেটার গোপনীয়তা রক্ষা করা;
৪. আন্তর্জাতিক ও জাতীয় আইন এবং সার্বভৌমত্বকে সম্মান করা এবং এসব ক্ষুণ্ন হওয়ার মতো কিছু প্রচার না করা;
৫. এআই সিস্টেমের দায়িত্বশীলতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে নিয়মিত সিস্টেম নিরীক্ষা ও পর্যালোচনা করা এবং তদনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ;
৬. নিয়মিতভাবে এআই সিস্টেমের স্বচ্ছতা ও ব্যাখ্যা করার ধরন পরিবীক্ষণ;
৭. এআই যাতে কোনোভাবেই পৃথিবীর কোনো জনপদের মানুষের অধিকার ও সার্বজনীন মানবাধিকারের পরিপন্থী কোনো কিছুর সঙ্গে যুক্ত না হয়, তা নিশ্চিত করা;
৮. কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে টেকসই করতে এবং এর প্রভাব স্থায়ী করতে এআইকে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার পরিপূরক প্রযুক্তি হিসেবে গড়ে তোলা;
৯. এআইকে শিক্ষা ও সামাজিক যোগাযোগের ফলপ্রসূ টুল, ডিজিটাল দক্ষতা বৃদ্ধি, নৈতিক প্রশিক্ষণ এবং তথ্যের সহায়ক প্রযুক্তি হিসেবে পরিণত করার অব্যাহত প্রয়াস চালিয়ে যাওয়া; এবং
১০. এআই যাতে সামাজিক ন্যায়বিচার, ন্যায়পরায়ণতা এবং সমাজের বৈষম্যমুক্তির পক্ষের সহায়ক হিসেবে পরিগণিত হয়, তার ব্যবস্থা নেওয়া।
পরাজয় নয় নিজের সৃষ্টির কাছে
এআই হয়তো খুব দ্রুতই ক্যানসারের ওষুধ আবিষ্কার করবে, উন্নত করবে জলবায়ু মডেলিং, কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে দেবে ব্যক্তিকেন্দ্রিক শিক্ষা, গতি বাড়িয়ে দেবে বৈজ্ঞানিক গবেষণার। বাংলাদেশের কথাই ধরা যাক। এআই যদি শ্রমবাজার বদলায়, আমাদের তরুণদের চাকরির বাজার বদলাবে। পাশাপাশি যদি এআইয়ের ভুল তথ্য ছড়ানোর ক্ষমতা বাড়ে, তবে তা মানবজাতির জন্য ভয়ংকর ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
ব্যক্তি ও বিভিন্ন খাতের প্রতিষ্ঠানের মতো বাংলাদেশেও অনেক গণমাধ্যমে মানুষের কাজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার টুল দিয়ে করানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এ কারণে হয়তো অনেকে চাকরি হারিয়েছেন। কিন্তু বড় পরিসরে এরকম ঘটনা না ঘটায় এখন পর্যন্ত তা দৃশ্যমান হয়নি।
নানা সমস্যা, সংকট ও ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশসহ বিশ্বের গণমাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। বরং এ বিষয়ে যথাযথ প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন। যার মাধ্যমে প্রযুক্তির অভিঘাত মোকাবিলা করে আগামী দিনে সুন্দরভাবে পথ চলা সম্ভব হয়।
তবে একথা ভুলে গেলে চলবে না যে, প্রযুক্তি মানুষের সৃষ্টি। মানুষই পারে তার সৃষ্টিকে জয় করতে। সুতরাং, প্রযুক্তি যতই আসুক, দিন শেষে জীবনকে প্রবহমান রাখার পাশাপাশি মানুষের সৃজনশীল সত্তা, ঔচিত্যবোধ, দায়িত্বশীলতা ও জীবনের সৌন্দর্য টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব মানুষকেই পালন করতে হয়। সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হওয়ার সুযোগ নেই।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)






