হরমুজে হামলা চালিয়ে সাফল্যের দাবি ইরানের, বাড়ছে তেল পরিবহন

ছবি: সংগৃহীত
হরমুজ প্রণালির কাছে বিভিন্ন জাহাজে হামলা চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজগুলোকে ইরানের উপকূল থেকে আরও দূরে সরে যেতে বাধ্য করার দাবি করেছে ইরান। এর মধ্যেই সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহনের পরিমাণ আবারও বেড়েছে।
সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ১৪ সেপ্টেম্বর হরমুজ প্রণালিতে ইরানের একটি জাহাজবিধ্বংসী ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের হামলায় আট মার্কিন মেরিন সেনা সম্ভাব্য ট্রমাটিক ব্রেন ইনজুরিতে আক্রান্ত হন। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) মন্তব্য জানতে চাওয়া হলে কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
এর আগে সেন্টকম জানিয়েছিল, চলতি মাসের শুরুতে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে মার্কিন জাহাজগুলো নিরাপদে সরে যেতে সক্ষম হয়। আহত মার্কিন মেরিনদের বিষয়ে উদ্ধৃত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হামলার সময় তারা যে জাহাজে ছিলেন সেটি মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজ ছিল না।
এর আগে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর ২৯ জন নাবিক ও আটজন মেরিন সেনাকে যুদ্ধাহতদের তালিকায় যুক্ত করে। এতে ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে আহত মার্কিন সেনাসদস্যের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৮৬১ জনে। এ পর্যন্ত অন্তত ১৯ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, চলতি মাসের শুরুতে হরমুজ প্রণালিতে অবরোধের আগের অবস্থান থেকে মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলো পিছু হটেছে। আগে ইরানের চাবাহার বন্দর ও ওমান উপসাগরের প্রবেশমুখের কাছাকাছি অবস্থান করলেও এখন সেগুলো মধ্য আরব সাগরের দিকে সরে গেছে বলে দাবি করা হয়েছে। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র এড়াতেই যুদ্ধজাহাজগুলো অবস্থান পরিবর্তন করেছে বলে দাবি করেছে দেশটির গণমাধ্যম।
সোমবার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতাবা খামেনির নামে প্রচারিত এক বার্তাতেও মার্কিন নৌবাহিনীর গতিবিধির বিষয়টি উঠে এসেছে।
বার্তায় তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালির সাহসী যোদ্ধা ও রক্ষকদের হাতে আঘাত পাওয়ার কারণে মার্কিন বাহিনী এখন আর সামনে এগোচ্ছে না। ঝুঁকি নিয়ে এগোলেই তারা নিজেদের ক্ষতির মুখে ফেলেছে বলেও বার্তায় উল্লেখ করা হয়।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র এখনো ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরগুলোতে কোনো না কোনো ধরনের নৌ অবরোধ বজায় রেখেছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে ইরানের সর্বশেষ প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যান করেছে ওয়াশিংটন।
তবে তেহরান জানিয়েছে, প্রয়োজন হলে তারা প্রতিরক্ষামূলক ও আক্রমণাত্মক দুই ধরনের সামরিক পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত। বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতিতে নিয়ন্ত্রিত উত্তেজনা বাড়তে পারে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে আবার পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরুর সম্ভাবনা কম বলেও তারা মনে করছেন।
সামুদ্রিক আইন ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ইয়ান রালবি বলেন, হরমুজ প্রণালির আশপাশে জাহাজে হামলা চালানো ইরানের কৌশলের অংশ হয়ে থাকতে পারে। তার মতে, ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুতিরাও প্রায় তিন বছর ধরে একই ধরনের কৌশল ব্যবহার করে এসেছে।
আল জাজিরাকে রালবি বলেন, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা তুলনামূলক দুর্বল সামরিক শক্তির জন্য বড় কৌশলগত সুবিধা তৈরি এবং বৈশ্বিক বাজারে প্রভাব ফেলার একটি উপায় হয়ে উঠেছে।
হরমুজ দিয়ে বাড়ছে তেল পরিবহন
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের উত্তেজনা বাড়লেও সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তবে যুদ্ধ শুরুর আগের মতো নির্বিঘ্ন অবস্থায় এখনো ফেরেনি গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ।
রোববার মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট বলেন, প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাচ্ছে। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টের হিসাবে এ পরিমাণ ১ কোটি ৫০ লাখ থেকে ২ কোটি ২০ লাখ ব্যারেল। যুদ্ধের আগে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল এই পথ দিয়ে পরিবহন হতো।
বেসেন্ট আরও দাবি করেন, অবরোধের কারণে ইরান নিজস্ব তেলও হরমুজ দিয়ে রপ্তানি করতে পারছে না। সমুদ্রে সংরক্ষিত প্রায় দেড় কোটি ব্যারেল তেল রয়েছে, যা দুই সপ্তাহের মধ্যে চীনে পাঠানো সম্ভব বলেও তিনি দাবি করেন।
কে-প্লারের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৭৪ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিবহনের প্রত্যাশা করা হচ্ছে। ২৭ সেপ্টেম্বর শেষ হওয়া সপ্তাহে ১৯টি তেলবাহী জাহাজ প্রণালিটি অতিক্রম করেছে। এর মধ্যে ১৭টি ছিল ভেরি লার্জ ক্রুড ক্যারিয়ার বা ভিএলসিসি, যেগুলোর প্রতিটি প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল তেল বহন করতে পারে।
সেপ্টেম্বরে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরাক, ওমান, কাতার, কুয়েত ও ইরানসহ অঞ্চলটির দেশগুলোর তেল রপ্তানি বেড়ে প্রতিদিন ১ কোটি ২৮ লাখ ব্যারেলে পৌঁছেছে। যুদ্ধ শুরুর পর এটিই সর্বোচ্চ।
উত্তেজনা কমাতে কূটনৈতিক তৎপরতা
হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে ইরানের দেওয়া শর্ত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রত্যাখ্যান করেছেন বলে জানানোর পর দুই দেশের মধ্যে নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতার খবর পাওয়া গেছে। সোমবার ও চলতি সপ্তাহজুড়ে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে দুই পক্ষের মধ্যে আরও আলোচনা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা হবে না। বরং জুনে ওয়াশিংটনের সঙ্গে হওয়া সমঝোতা এবং ওমানের মধ্যস্থতায় চূড়ান্ত হওয়া দ্বিপক্ষীয় হরমুজ চুক্তিকে ভবিষ্যৎ সমঝোতার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করতে চায় তেহরান।
ক্রাইসিস গ্রুপের ইরানবিষয়ক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক হামিদরেজা আজিজি বলেন, কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে এবং মার্কিন অবরোধ অব্যাহত থাকলে হরমুজ প্রণালি ও এর আশপাশে আরও বেশি হামলার ওপর নির্ভর করতে পারে ইরান।
তার মতে, এর অর্থ এই নয় যে ইরান ইতোমধ্যে মার্কিন যুদ্ধজাহাজের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে এমন পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের আগের তুলনায় কম দ্বিধা থাকতে পারে।
তিনি বলেন, হরমুজের ওপর ইরানের প্রভাব কমে যাচ্ছে এবং নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধের মাধ্যমে ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন রেখেই যুক্তরাষ্ট্র সমুদ্রপথে স্বাভাবিক যোগাযোগ ফিরিয়ে আনতে পারবে, এমন ধারণা ওয়াশিংটনে তৈরি হতে দিতে চায় না তেহরান।
এ কারণে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার সংখ্যা ও তীব্রতা বাড়ানো, একেকটি হামলায় বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার, জাহাজকে পাহারা দেওয়া নৌযানকে লক্ষ্যবস্তু করা কিংবা মার্কিন সেনাদের হতাহত করার চেষ্টা করা হতে পারে বলে মনে করেন আজিজি।
তবে বড় ধরনের মার্কিন হতাহতের ঘটনা ঘটলে পরিস্থিতি এমন মাত্রায় উত্তপ্ত হতে পারে, যা ইরানও এড়াতে চায়। একই সঙ্গে অতিরিক্ত হামলা সৌদি আরবসহ অন্যান্য দেশকে যুক্তরাষ্ট্রের আরও কাছে নিয়ে যেতে পারে। ফলে ইরানের পদক্ষেপ নিয়ন্ত্রিত থাকলেও আগের তুলনায় আরও আক্রমণাত্মক হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
রালবির মতে, এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষই সহিংসতার মাধ্যমে দীর্ঘস্থায়ী অশান্তির পথে যেতে রাজি নয়। ইরান যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ চালিয়ে যেতে পারায় ওয়াশিংটনের কিছু বক্তব্যও দুর্বল হয়েছে। তবে এতে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছানোর পথ দ্রুততর হচ্ছে না।





