ক্রিকেট গৌরবময় অনিশ্চয়তার খেলা- চিরন্তন কথাটি আবারও সত্য প্রমাণ করে ছাড়ল এম চিন্নাস্বামী স্টেডিয়ামের মঞ্চ। চার শতাধিক রানের ম্যাচের ফল শেষ বলের রোমাঞ্চে গিয়ে ঠেকে। মোড় ঘুরতে থাকা একের পর এক হৃদস্পন্দন কাঁপানো খেলায় রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালোরের বিপক্ষে ১ উইকেটের ক্ল্যাসিক জয় পেল লক্ষ্ণৌ সুপার জায়ান্টস।
সোমবার চিন্নাস্বামী স্টেডিয়ামে টসে হেরে আগে ব্যাট করা রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালোর ২ উইকেটে ২১২ রানের বড় সংগ্রহ দাঁড় করায়। জবাবে লক্ষ্ণৌ সুপার জায়ান্টস ৯ উইকেট হারিয়ে জয়ের বন্দরে নোঙর ফেলে।
ঘরের মাঠে বেঙ্গালোরকে উড়ন্ত সূচনা এনে দেন বিরাট কোহলি এবং অধিনায়ক ফ্যাফ ডু প্লেসিস। দুই ওপেনার গড়েন ৯৬ রানের জুটি। দ্বাদশ ওভারে অমিত মিশ্রর বলে মার্কাস স্টয়নিসের হাতে মিডউইকেটে ধরা পড়ার আগে ৪৪ বলে ৪টি চার ও ৪টি ছক্কায় ৬১ রান করেন কোহলি।
দ্বিতীয় উইকেট জুটিতে গ্লেন ম্যাক্সওয়েলকে নিয়ে ১১৫ রানের জুটি গড়েন ডু প্লেসিস। বাইশ গজে ঝড় তুলে ম্যাক্সওয়েল ৩টি চার ও ৬টি ছকায় ৫৯ রানের টর্নেডো ইনিংস খেলেন। শেষ ওভারে মার্ক উডের বলে বোল্ড হয়ে সাজঘরে ফেরেন অজি ব্যাটার।
ডু প্লেসিস অপরাজিত থেকে ৪৬ বলে ৫টি চার ও ৫টি ছক্কায় করেন ৭৯ রান। চারে নামা দীনেশ কার্তিক একটি বল খেলার সুযোগ পেয়ে এক রান করেন।
বড় লক্ষ্য তাড়ায় নেমে ৪ ওভারে ২৩ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে ফেলে লক্ষ্ণৌ। বড় ব্যবধানে পরাজয় উঁকি দিচ্ছিল। কাইল মেয়ার্স রানের খাতা না খুলেই মোহাম্মদ সিরাজের বলে হন বোল্ড। দীপক হুদা ৯ ও ক্রুনাল পান্ডিয়া শুন্য রানে ড্রেসিংরুমের পথ ধরেন।
ওপেনিংয়ে নামা অধিনায়ক লোকেশ রাহুল ধীরগতির ব্যাটিং করলেও স্টয়নিস ছিলেন আগ্রাসী। দুজনে চতুর্থ উইকেটে যোগ করেন ৭৬ রান। ফিফটি তুলে নেয়া স্টয়নিস ৩০ বলে ৬ চার ও ৫ ছক্কায় ৬৫ রানের ঝড়ো ইনিংস খেলে ম্যাচের মোড় ঘোরানোর কাজটা করেন। ডিপ পয়েন্টে শাহবাজ আহমেদের হাতে ধরা পড়ে থামে তার ইনিংস।
১২তম ওভারের প্রথম বলে ১৮ রান করা রাহুল আউট হলে লক্ষ্ণৌর স্কোর দাঁড়ায় ৫ উইকেটে ১০৫ রান। জয়ের জন্য তখনও দরকার ছিল ৫৩ বলে ১০৮ রান। ম্যাচের বাকি অংশে অবিশ্বাস্য চিত্রনাট্যের দেখা মেলে।
নিকোলাস পুরান ক্রিজে এসেই বেঙ্গালোর বোলারদের নাকের জল চোখের জল এক করে মাত্র ১৫ বলে তোলেন ফিফটি। ইমপ্যাক্ট খেলোয়াড় হিসেবে নামা আয়ুষ বাদোনিকে নিয়ে চোখের পলকে গড়েন ৮৯ রানের জুটি।
১৯ বলে ৪টি চার ও ৭টি ছক্কায় ৬২ রানের টর্নেডো ইনিংস খেলা পুরান ব্যাকওয়ার্ড স্কয়ার লেগে সিরাজের বলে শাহবাজের তালুবন্দি হন। জয়ের জন্য লক্ষ্ণৌর তখন দরকার ছিল ১৮ বলে ২৪ রান।
হারতে বসা ম্যাচে অবিশ্বাস্যভাবে প্রত্যাবর্তনের মঞ্চায়ন ঘটায় বেঙ্গালোর। ১৯তম ওভারের চতুর্থ বলে আয়ুষ মারেন ছক্কা। কিন্তু তার ব্যাট স্টাম্পে আঘাত করায় ছয় রান স্কোরবোর্ডে জমা না হয়ে উল্টো হিট উইকেটের শিকার হয়ে মাঠ ছাড়েন। এখান থেকেই যেন সূচনা হয় মহানাটকীয় ম্যাচের রুদ্ধশ্বাস উপাখ্যান।
এরপরও লক্ষ্ণৌর পক্ষে সমীকরণ সহজই ছিল, শেষ ওভারে জয়ের জন্য দরকার ছিল ৫ রান। হার্শাল প্যাটেলের প্রথম বলে এক রান নেন জয়দেব উনাদকাট। দ্বিতীয় বলে বোল্ড হন মার্ক উড। সমীকরণ দাঁড়ায় ৪ বলে চার রান।
ওভারের তৃতীয় বলে দুই ও চতুর্থ বলে এক রান নেন রবি বিষ্ণোই। পঞ্চম বলে পুল শট খেলে লংঅনে ডু প্লেসিসের হাতে ধরা পড়েন। দর্শকদের চোখ তখন কপালে ওঠার জোগাড়। সমীকরণ এক বলে এক রান, হাতে এক উইকেট। সুপার ওভারের সম্ভাবনা চোখ রাঙানি দিচ্ছিল।
ম্যাচের শেষ বলে যা ঘটল, তাকে মহানাটকীয় শব্দ দিয়েও হয়তো পরিস্থিতির প্রকৃত বাস্তবতা বোঝানো কঠিন। হার্শালের বলে ব্যাট লাগাতে পারেননি আভেশ খান। বল প্রথম চেষ্টার ধরতে পারেননি উইকেটরক্ষক দীনেশ কার্তিক। ততক্ষণে ক্রিজের অর্ধেক পথ দৌড়ে আসেন বিষ্ণোই। গ্লাভসে বল জমা করে কার্তিক থ্রো করতে করতে দুই ব্যাটার করে ফেলেন প্রান্ত বদল। হেলমেট ছুঁড়ে ফেলে দুই হাত প্রসারিত করে দৌড়ে জয়ের আনন্দে সতীর্থদের কাছে ছুটে যান আভেশ।
বেঙ্গালোরের পক্ষে তিনটি করে উইকেট পান সিরাজ এবং ওয়েইন পার্নেল। হার্শাল দুটি ও কর্ণ শর্মা পান একটি উইকেট।







