ছাত্রজীবনের সকল সুখকর মুহূর্তগুলো যেই একটি শব্দ শোনার পর বিষাদে রূপ নেই তারই নাম পরীক্ষা। অনেকের কাছে এটা এতটাই বিভীষিকাময় যে, পরীক্ষার নাম শুনলেই জ্বর চলে আসে। যেই বিষয়টি নিয়ে দুশ্চিন্তা, প্রস্তুতি, আগ্রহ তার সূচনাটা আমাদের অনেকেরই অজানা।
পরীক্ষার জনক
আধুনিক পরীক্ষাপদ্ধতির জনক বলা হয় হেনরি এ ফিশেলকে। ১৯১৩ সালের ২০ নভেম্বর হেনরি ফিশেল জন্মগ্রহণ করেন। আর মৃত্যুবরণ করেন ২০০৮ সালের ২ মার্চ। তিনি ছিলেন ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক। তিনি গ্রীক ও ইহুদি সাহিত্যের ওপর বই লিখেছেন।

হেনরি ফিশেল ১৯ শতকে প্রথম পরীক্ষার ধারণার সূচনা করেন। তিনি একটি পরীক্ষা ব্যবস্থা প্রস্তুত করেছিলেন, যার মাধ্যমে একটি সাধারণ বিষয়ে শিক্ষার্থীদের জ্ঞান পরীক্ষা করা যায়।
পরীক্ষা সম্পর্কে তিনি যে দার্শনিক ধারণা দেন তা হল , কোন বিষয়ে উপসংহারে পৌছানোর পূর্বে সেই বিষয় নিয়ে খুব বিচক্ষনতার সাথে পরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিৎ। ধারনা করা হয় মিশেল হেনরিই সর্বপ্রথম দার্শনিক যিনি পরীক্ষার দর্শন নিয়ে আলোচনা করেছেন।
ইতিহাসে শুরুটা আরও আগে
ইতিহাস বলছে, পরীক্ষার পদ্ধতির সূত্রপাত হয়েছে প্রাচীন চীনে। ৬০৫ খ্রিষ্টাব্দের দিকে সরকারি চাকরিতে নিয়োগ দেওয়ার জন্য ‘স্ট্যান্ডার্ডাইজ টেস্ট’ বা সার্বভৌম পরীক্ষার শুরু করেছিলেন সুই রাজবংশের রাজারা। এই পরীক্ষার ছিল মূলত একটি বাছাই পরীক্ষা।
এর প্রায় ১৩০০ বছর পরে কুইং রাজবংশ ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দে এই পদ্ধতি বাতিল করে। কিন্তু ১৮০৬ সালে ইংল্যান্ড এই পরীক্ষা পদ্ধতি গ্রহণ করে এবং সরকারি বিভিন্ন কাজে প্রার্থী নিয়োগের জন্য এই পদ্ধতি অবলম্বন করে। পরবর্তীতে তারা ইংল্যান্ডের শিক্ষাব্যবস্থায় পরীক্ষা পদ্ধতির সংযোজন করে। এইভাবে আস্তে আস্তে বিভিন্ন দেশে পরীক্ষা পদ্ধতি ছড়িয়ে পড়ে এবং দেশে দেশে গ্রহণযোগ্যতাও পেতে থাকে। বিশ্বব্যাপী ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য পরীক্ষা পদ্ধতির সূচনা হয়।
তবে পরীক্ষা বা ইংরেজি এক্সামিনেশন শব্দটি কিন্তু চীন থেকে আসেনি। লাতিন শব্দ ‘এক্সামিনেশনেম’কে গ্রহণ করেছিল ফরাসিরা। তারা উচ্চারণ করত ‘এক্সামিনাছিওন’। সেখান থেকে নানা পথ ঘুরে ইউরোপে গিয়ে হয়েছে এক্সামিনেশন।
ভারতবর্ষে পরীক্ষার প্রচলন
ব্রিটিশ শাসনামলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এটিকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়। ১৮০৬ সালে ইংল্যান্ডে শাসকরা তাদের রাজ্যের বেসামরিক পদে লোকবল নিয়োগের জন্য অনেকটা চীনের পরীক্ষা পদ্ধতি চালু করে। এক সময় পুরো বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে পরীক্ষা পদ্ধতি। ১৮৫৮ সালে উপমহাদেশে প্রথমবারের মতো মেট্রিকুলেশন পরীক্ষা চালু হয়।

আমাদের এ অঞ্চল দীর্ঘদিন শাসন করেছে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। ফলে তাদের শিক্ষাব্যবস্থা, পরীক্ষা পদ্ধতি অনেক কিছুই চালু আছে এ অঞ্চলে। আমাদের স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পরীক্ষা কিংবা চাকরির নিয়োগ পরীক্ষাগুলো যে পদ্ধতিতে হয়, তা অনেকটা ওই পুরোনো ব্রিটিশদের শেখানো।
কীভাবে এলো ৩৩ নম্বরের পাস
অনলাইনে ঘাটাঘাঁটি করে জানা যায়, ১৮৫৮ সালে যখন উপমহাদেশে প্রথমবারের মতো মেট্রিকুলেশন পরীক্ষা চালু করা হয় তখন পাস নম্বর কত হবে তা নিয়ে বোর্ড কর্তৃপক্ষ দ্বিধায় পড়েন। পরে যুক্তরাজ্যের কনসাল্টেশনের জন্য চিঠি দেওয়া হয়। তখন যুক্তরাজ্যের স্থানীয় ছাত্রদের জন্য পাশের নম্বর ছিল ৬৫। সে সময় ইংরেজ সমাজে একটা প্রচলিত ধারণা ছিল ‘বুদ্ধি ও দক্ষতায় উপমহাদেশের মানুষকে ইংরেজদের তুলনায় অর্ধেক বলে মনে করা হতো’। এরই ধারাবাহিকতায় মেট্রিকুলেশনের পাস নম্বর ৬৫ এর অর্ধেক ৩২.৫ নির্ধারণ করা হয়। ১৮৫৮-১৮৬১ সাল পর্যন্ত পাস নম্বর ৩২.৫ ছিল। ১৮৬২ সালে তা গণনার সুবিধার্থে বৃদ্ধি করে ৩৩ করা হয়। সেই থেকে এই ৩৩ নম্বরই চলছে।







