ফিলিপ চিয়ার সঙ্গে সিনেমালায়া ফিলিপাইন ইন্ডিপেনডেন্ট ফিল্ম ফেস্টিভালে আমার দেখা হয়। এমন না যে উৎসবটিতে প্রদর্শিত আমার চলচ্চিত্রটি দেখে চিয়া পছন্দ করেছিলেন বরং একমাত্র চিয়াই চলচ্চিত্রটি সম্পর্কে তাঁর অপছন্দের কথা আমাকে অকপটে বলেন। তবু এই মানুষটার হৃদয়ের কি এক উষ্ণতা আমার হৃদয়ে এসে পৌঁছায় তখন, বোধকরি উনার ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছিল। সে কারণেই হয়তো তৎকালীন এত এত মানুষের সঙ্গে পরিচয় ঘটলেও শুধু চিয়ার সঙ্গে সম্পর্কটা থেকে যায় এবং দিনে দিনে তা আরো সুন্দর হয়ে ওঠে। যদিও এশিয়ার এই প্রভাবশালী প্রোগ্রামার এবং ফিল্ম ক্রিটিক সম্পর্কে আমি কিছুই জানতাম না, বহু পরে এসে যখন অন্য এক মাধ্যমে চিয়া সম্পর্কে জানতে পারি তখন ভিতরে কিছুটা শরমিন্দা অনুভব করি।
ফিলিপ চিয়া সিঙ্গাপুর আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, তিনি ২০০৮ সাল পর্যন্ত এর দায়িত্বে ছিলেন। এছাড়া তিনি সিঙ্গাপুর ভিত্তিক চলচ্চিত্র সমালোচক এবং সে দেশের একমাত্র স্বাধীন পপ কালচার ম্যাগাজিন BigO-র সম্পাদক। তিনি NETPAC এর উপদেষ্টা এবং এশিয়া প্যাসিফিক স্ক্রিন অ্যাওয়ার্ডসহ বহু চলচ্চিত্র উৎসবের জুরি ও নির্বাচনী কমিটির সদস্য হিসেবে কাজ করেছেন। মোটকথা অতি সাধারণ বেশভূষার এই মানুষটা এশীয় চলচ্চিত্রে তার অবদানের জন্য তিনি ব্যাপকভাবে স্বীকৃত এবং বহু পুরুষ্কারে ভূষিত হয়েছেন।
সম্প্রতি জাপান ফাউন্ডেশন এশিয়া সেন্টারের ডিজিটাল প্লাটফর্মে চিয়ার প্রকাশিত একটি সাক্ষাৎকার আমার চোখে পড়ে। টোকিও চলচ্চিত্র বিদ্যালয়ের সহ পরিচালক মাসামিচি মাতসুমতো মূলত চিয়ার কাছ থেকে চলচ্চিত্র শিল্পের পরিবর্তন এবং পরবর্তী প্রজন্ম নিয়ে ভাবনা, সেই সঙ্গে চলচ্চিত্রে এশিয়ার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আলাপ করেন। যেখানে মোটাদাগে এশিয়ান ফিল্মমেকার এবং ফেস্টিভ্যাল প্রোগ্রামদের পরিচয় খুঁজে বেড় করার তাড়না রয়েছে। তাই সঙ্গতকারণেই সাক্ষাৎকারটি পড়তে পড়তে তা বাংলায় তর্জমা করার তাগিদ অনুভব করি।

মাতসুমতো: ১৯৮৭ সাল থেকে, মানে একদম সিঙ্গাপুর আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব(SIFF) এর সূচনা থেকে আপনি যুক্ত ছিলেন, প্রায় ত্রিশ বছর! এ সময়ের মধ্যে আপনি চলচ্চিত্রের নানা বিষয়ের সঙ্গে ছিলেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় যে পরিবর্তনগুলো আপনি দেখেছেন, সেগুলো কী?
চিয়া: সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটা প্রজন্মগত এবং আমি সবসময়ই তাই বলে আসছি। আমাদের প্রজন্ম এখন বড় বড় অবস্থানগুলো ছেড়ে দিচ্ছে, আর গত পাঁচ বছরে তরুণ প্রোগ্রামারদের একটি নতুন প্রজন্ম উঠে আসছে। কিন্তু আমার কাছে অদ্ভুত লাগে একটা বিষয়, আমরা যেন আবার চাকা নতুন করে আবিষ্কার করার পর্যায়ে চলে গেছি । যদি অন্যভাবে বলি, নতুন প্রজন্মকে আবার সবকিছু একেবারে শুরু থেকে শিখতে হচ্ছে, আর ইতিহাস শেখানো খুবই কঠিন বিষয়। আমি যখনই আমার বন্ধুদের সাথে কথা বলি, যারা ফিল্ম স্কুলে পড়ান, তারা একই কথা বলেন: “চলচ্চিত্র শিক্ষার্থীরা সিনেমা দেখতে পছন্দ করে না।” এটা খুবই অদ্ভুত ব্যাপার। যদি সিনেমা দেখতে ভালো না লাগে, তাহলে কেন চলচ্চিত্র অধ্যয়ন করবে? এটা ভয়ংকর বিষয়। তাহলে চলচ্চিত্র প্রোগ্রামারদের কী হবে? তারা কি সিনেমা দেখতে ভালোবাসে না?
এক্ষেত্রে সত্যি আমি জানি না কী করা উচিত। কারণ আমরা এখন এমন এক দুনিয়ায় আছি যেখানে তথ্যের প্রাচুর্য: গণমাধ্যমের বিপুল বিকল্প, নানা ভিউয়িং প্ল্যাটফর্ম আরো নানান কিছু। সবকিছুই এখন এত বেশি, যে ছোট ছোট বিষয়ে গভীর আগ্রহ তৈরি করার সময়ই নেই। কারণ সবাইকে নিয়ে একসাথে দৌড়াতে হচ্ছে, আর সবাই সবকিছু তাড়াহুড়া করে পেতে চাইছে। এর সমাধান কী, আমি সত্যিই জানি না।

মাতসুমতো: আমি আপনার কথার সঙ্গে একমত। বিশেষ করে ফিল্ম স্কুলের ছাত্রদের ব্যাপারে। অনেকেই আছেন যারা চান তাদের নিজের সিনেমা সবাই দেখুক, কিন্তু অন্যের সিনেমা দেখতে তারা আগ্রহী নন। এবং একেকজনকে ধরে ধরে একেকটা সিনেমা সম্পর্কে বলাও কঠিন। তাই আমি কয়েকজনকে একসাথে নিয়ে সিনেমা দেখে তা আলোচনা করতাম। আমার মনে হয়, এখন আমি যে কাজ করছি, সেটা আসলে তারই এক বর্ধিত রূপ।
চিয়া: হ্যাঁ, এটা সত্যিই দারুণ পদ্ধতি!
মাতসুমতো: আপনি সবসময়ই বলেন আপনি কাজের মাধ্যমেই শিখেছেন। আপনি কী মনে করেন, তরুণ প্রজন্ম যারা প্রোগ্রামার হতে চায় তারা কীভাবে এই ক্ষেত্রে আরো দুর্দান্ত হয়ে উঠতে পারে ? আর আপনি কি আগ্রহী কিনা নতুন প্রজন্মের আগ্রহী প্রোগ্রামারদের গড়ে তুলতে?
চিয়া: আমি যেসব উৎসবের সঙ্গে কাজ করি, তাদের মাধ্যমে আসলে এটাই করে আসছি। এক্ষেত্রে বলতে পারি, ইন্দোনেশিয়ায় যোগজা-নেটপ্যাক এশিয়ান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের কথা, আমি তাদের সঙ্গে সহ-প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে প্রোগ্রামারদের নিয়ে কাজ করেছি। আর মূলত আমার পদ্ধতি হলো অনধিকারচর্চা না করা। অর্থাৎ, আমি কিছু চলচ্চিত্র সাজেস্ট করতাম, কিন্তু সিদ্ধান্ত তাদেরই নিতে দিতাম, আমি পর্যবেক্ষণ করতাম শুধু। আমি ততক্ষণ কিছুই বলতাম না, যদি না মনে হতো তারা সত্যিই কোনো ভীষণ বেমানান সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। এরপরেও আমি যে খুব বেশি কিছু বলতাম তা না, শুধু বলতাম—আরেকবার ভেবে দেখতে। আমার পদ্ধতি আসলে অনেকটা ‘জেন’-ধারার মতো। আমি মানুষকে কী করতে হবে সেটা বলতে পছন্দ করি না। বরং আমি চাই তারা নিজেরা শিখুক। আমি কেবল তাদের চিন্তাকে উৎসাহিত করতে পারি মাত্র।
মাতসুমতো: হ্যাঁ , এটা আসলে সত্যি প্রোগ্রামিংয়ের কোনো একক পদ্ধতি নেই। প্রত্যেকেই কেবল নিজের আবিষ্কার ও চলচ্চিত্রের সঙ্গে সাক্ষাতের মাধ্যমে এই অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারে। আসলে প্রতিটি চলচ্চিত্রই একেকজনের কাছে একেকভাবে ধরা দেয়। তাই সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব ব্যক্তির, চলচ্চিত্রের নয়।
চিয়া: আমার কাছে প্রোগ্রামার হিসেবে চলচ্চিত্র নির্বাচন করার একটা ইমেজ মাথার মধ্যে প্রায়ই ঘুরপাক খায়। আমি যেন ডুবে যাওয়া টাইটানিকের বেঁচে যাওয়া সেই মানুষটা, যে একটা নৌকায় উঠতে পেরেছি। আর আমার চারপাশে সবগুলো চলচ্চিত্র পানির ওপর ভেসে যাচ্ছে। কোনটা আমি বাঁচাই?
মাতসুমতো: আমি জানি আপনি জীবনে বহু প্রোগ্রাম করেছেন। আপনার স্মৃতিতে কোন প্রোগ্রামটা এখনও রয়ে গেছে কিংবা প্রায়ই মনে পড়ে?
চিয়া: একদম শুরুর দিকে আমরা যখন প্রথম দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পরিচালকদের রেট্রোস্পেকটিভ দেখানো শুরু করেছিলাম। তো সেইসময়ে আমি পরিচালকের সঙ্গে থিয়েটারের সামনে দাঁড়িয়ে ভাবতাম, আমরা কি দর্শক পাবো? প্রতি বার আমরা যখন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পরিচালকদের রেট্রোস্পেকটিভ করতাম, আমি স্বভাবতই খুব এক্সসাইটেড থাকতাম। এ ব্যাপারে দর্শকদের আগ্রহী করে তুলতে সম্ভবত আমাদের বছর ছয় লেগেছিল। এরপর থেকে তারা সহজেই আসতে শুরু করে। আসলে রুচি তৈরিতে সত্যিই অনেক সময় লাগে।

মাতসুমতো: আরেহ্ আমারও এমন অভিজ্ঞতা আছে। আমিও তো অনেক প্রোগ্রামের আয়োজন করেছি যেখানে দর্শক আসেনি। একবারের ঘটনা মনে আছে, একটা শোতে একজন মাত্র দর্শক, সে চলে যেতে চাইলো, আমি তখন তাকে বললাম, “কেউ আসতে পারে, হয়তো পথে আছে, আরেকটু অপেক্ষা করুন” কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে একাই ছিল। যাইহোক, খুবই সাধারণ একটা প্রশ্ন, তবু প্রশ্নটা আমি আপনাকে করতে চাই। আপনি এশীয় চলচ্চিত্রের ভবিষ্যৎটাকে কীভাবে দেখছেন?
চিয়া: এশিয়ার ভবিষ্যৎ খুবই উজ্জ্বল, আবার ভয়েরও। কারণ আমার মনে হয় অনেক এশীয় এখনও তাদের পরিচয় খুঁজে পাচ্ছে না। এক্ষেত্রে, অনেক এশীয় চলচ্চিত্র নির্মাতা এবং ডিস্ট্রিবিউটররা বুঝতে পারছে না যে বাজার আসলে এশিয়াতেই। অথচ তারা এখনো নিজেদের চলচ্চিত্র নিয়ে পশ্চিমা বাজারের ব্যাপারে আগ্রহী। যা তাদের নিয়ন্ত্রণে নাই এবং নিয়ন্ত্রণ যেহেতু নাই তাই তারা নিজেদের জন্য দামও ঠিক করতে পারে না। আবার পশ্চিমা বাজার মাথায় থাকায় তারা বুঝতেও পারে না তাদের নিজেদের চলচ্চিত্র নিজেদের জনগণের জন্য কতটুকু সাশ্রয়ী হওয়া দরকার।
এশীয় নির্মাতারা দাবি করেন তারা এশীয় পরিচালক। কিন্তু তারা নিজেদের ছবির ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ারের জন্য পশ্চিমা উৎসবের দিকে ছুটে যান। তখন আমার মনে হয়, “আপনার আত্মমর্যাদার যে অনুভূতি, তার কী হয়েছে? কেন আপনি এশীয়ার উৎসবগুলো নিয়ে ভাবছেন না?”
১৯৮০-এর দশকে, এশীয় উৎসব ততটা ছিল না। কিন্তু এখন! অনেক চমৎকার এশীয় উৎসব আছে। তাই এখনই কি সময় না! আমাদের অবস্থান আসলে কোথায় আমরা এতটুকু বুঝি?
আমি আগের বিষয়টা রিপিট করেই বলছি- দর্শকসংখ্যা কম হলে অনুভূতিটা কেমন হয় আমি সত্যিই তা বুঝতে পারি।
মাতসুমতো: ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে, আমার এক জাপানি চলচ্চিত্র নির্মাতার সঙ্গে কথা হয়। এরআগে তার সঙ্গে আমি কখনো কথা বলিনি। তো তিনি সেদিন বললেন, ১৯৮০-এর দশকে তিনি প্রায়ই আমার এখানে সিনেমা দেখার জন্য আসতেন। বিষয়টায় আমি খুবই আপ্লুত হই। সাম্প্রতিক এটাই আমার সবচেয়ে মূল্যবান অভিজ্ঞতাগুলোর একটি।
চিয়া: আরেহ্ বাহ্! এ ধরনের বিষয়গুলো সত্যি দারুণ! আমাদের এগিয়ে যেতে প্রেরণা জোগায়।
মাতসুমতো: আসলেই, এটাই আমাদের প্রেরণা। –জাপান ফাউন্ডেশন









