অভিবাসীদের দমনে যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইস) এর ভয়াবহ প্রশিক্ষণ পদ্ধতি ও বলপ্রয়োগ নীতিকে ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। দেশটির মিনেসোটার মিনিয়াপোলিসে রেনি নিকোল গুড হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আইস এজেন্ট জড়িত থাকার অভিযোগের পর সংস্থাটির জবাবদিহি ও কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন জোরালো হয়েছে।
শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে আল জাজিরা জানিয়েছে, অনুসন্ধানী সাংবাদিক লিলা হাসানের প্রকাশিত একটি নথি অনিয়মিত অভিবাসী শনাক্ত, গ্রেপ্তার, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, জাল কাগজপত্র ও মানবপাচার তদন্ত এবং অপরাধীদের আটক ও প্রেরণকারী সংস্থা আইসের প্রশিক্ষণ ও অভ্যন্তরীণ নীতির গোপন দিকগুলো সামনে এনেছে। ২০২৪ সালের ওই অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০১৫ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে আইস এজেন্টরা অন্তত ৫৯ বার আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করেছে।
এতে আহত হন ২৪ জন এবং নিহত হন ২৩ জন। শুধু ২০২৩ ও ২০২৪ সালেই আইস এজেন্টদের গুলিতে অন্তত ১২ জন আহত বা নিহত হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটির (ডিএইচএস) তথ্য অনুযায়ী, গুড নিহত হওয়ার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই আরেক আইস এজেন্ট একজন লাতিনো ব্যক্তিকে গুলি করে আহত করেন। তবে এসব ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো আইস এজেন্টের বিরুদ্ধে ফেডারেল বা অঙ্গরাজ্য পর্যায়ে অভিযোগ গঠন হয়নি।
কেন আইস কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এত কঠিন সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে লিলা হাসান আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে সংস্থাটির অভ্যন্তরীণ নথি সংগ্রহ করেন। নথিগুলোতে দেখা যায়, কীভাবে প্রশিক্ষণের সময় থেকেই এজেন্টদের সম্ভাব্য তদন্ত ও মামলা মোকাবিলার কৌশল শেখানো হয়। আইসের বলপ্রয়োগ ও আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের নীতিমালা সাধারণ জনগণের জন্য প্রকাশ করা হয় না। সংস্থাটি এসব নথিকে ‘সংরক্ষিত আইন প্রয়োগকারী দলিল’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করে রেখেছে। তবে ২০০৭ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে ব্যবহৃত কিছু প্রশিক্ষণ সামগ্রী হাতে পান হাসান।
যদিও সেগুলো পুরোনো, তবুও এগুলোই আইস এজেন্টদের বলপ্রয়োগ প্রশিক্ষণ সম্পর্কে সবচেয়ে স্পষ্ট ধারণা দেয়। নথি অনুযায়ী, আইস এজেন্টদের শেখানো হয় যেন তারা নিজেদের অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকিতে না ফেলেন। ফেডারেল ল’ এনফোর্সমেন্ট ট্রেনিং সেন্টারের (এফএলইটিসি) এক পাঠে বলা হয়েছে, ‘প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগ কেবল শেষ অবলম্বন’ এই ধারণা একটি মিথ। সেখানে উল্লেখ করা হয়, আইন কর্মকর্তাদের নমনীয় নয়, বরং বস্তুনিষ্ঠভাবে যুক্তিসংগত বলপ্রয়োগ করতে আইন অনুমতি দেয়। সতর্কবার্তা দেওয়া বা ধাপে ধাপে বলপ্রয়োগের চেষ্টা কর্মকর্তার নিজের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে বলেও প্রশিক্ষণে বলা হয়েছে।
আইস তাদের বলপ্রয়োগের হালনাগাদ নীতিমালা প্রকাশ করে না এবং আইনে তা প্রকাশের বাধ্যবাধকতাও নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই গোপনীয়তাই আইস এজেন্টদের জবাবদিহির বাইরে রাখার একটি বড় কারণ। ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটির আইন অধ্যাপক সিজার কুয়াউতেমোক গার্সিয়া হার্নান্দেজ বলেন, পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা জনসমক্ষে না এলে বোঝা সম্ভব নয়, কখন আইস এজেন্টরা সংস্থার নিজস্ব নিয়ম লঙ্ঘন করছেন। যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের গবেষণা সংস্থা গভর্নমেন্ট অ্যাকাউন্টেবিলিটি অফিসের ২০২৩ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, আইসের বলপ্রয়োগ সংক্রান্ত নথিতে অনেক ক্ষেত্রে নিয়ম ভাঙার বিস্তারিত তথ্যই নেই। ফলে প্রশিক্ষণ উন্নয়ন বা সংশোধনের সুযোগও সীমিত হয়ে পড়ে। নথিগুলোতে আরও উঠে এসেছে, এজেন্টদের কীভাবে মামলার দায় এড়াতে হয়, সে বিষয়ে আলাদা গুরুত্ব দেওয়া হয়।
মিনিয়াপোলিসে আইসের অভিযানের বিরুদ্ধে এখনও ব্যাপক বিক্ষোভ চলছে। শহরজুড়ে হাজার হাজার ফেডারেল ইমিগ্রেশন এজেন্ট মোতায়েন রয়েছে। বাড়িতে বাড়িতে অভিযান, গাড়ি থেকে মানুষ টেনে নামানোর ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা আতঙ্কে ঘর ছাড়তে ভয় পাচ্ছেন।








