মোহাম্মদ সাদউদ্দিন: ভারতের সংসদের লোকসভা ও রাজ্যভায় ২ ও ৩ এপ্রিল পরপর দু’দিন বর্তমান কেন্দ্রের বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকারের পেশ করা ওয়াকফ সংশোধনী বিল ধ্বনি ভোটে গৃহীত হয়েছে। এর ফলে ওয়াকফ সংশোধনী বিল ২০২৪ ভারতীয় সংসদে পুরোপুরি পাশ হয়ে গেল। যদিও এই বিল নিয়ে বিরোধীরা আলোচনার সুযোগ পেলেও বিজেপি সরকার তার গরিষ্ঠতারে জোরে জবরদস্তি পাশ করিয়ে নিয়েছে। এই সংক্রান্ত বেশ কিছু আলোচনা অনবরত দেখছি।
সেখানে অবশ্য একতরফা আবেগই কাজ করছে। এই সংক্রান্ত কিছু কথা বলতে গেলে অবশ্যই সাধারণ কিছু বিষয় সকলের কাছে পরিষ্কার হওয়া দরকার। নিচে অল্প কিছু তথ্য দেওয়া হলো:
- প্রথম পেশ: ওয়াকফ সংশোধনী বিল ২০২৪ প্রথমবার ভারতীয় লোকসভায় ৮ আগস্ট ২০২৪ তারিখে কেন্দ্রীয় সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু পেশ করেন। এই বিলের উদ্দেশ্য ছিল ১৯২৩ সালের মুসলমান ওয়াকফ আইন বাতিল করা এবং ১৯৯৫ সালের ওয়াকফ আইন সংশোধন করা।
- বিরোধিতা ও যৌথ সংসদীয় কমিটিতে প্রেরণ: বিলটি পেশের পর বিরোধী দলগুলোর তীব্র প্রতিবাদের মুখে এটি সরাসরি পাশ করা সম্ভব হয়নি। ফলে, ৯ আগস্ট ২০২৪-এ বিলটি ৩১ সদস্যের একটি যৌথ সংসদীয় কমিটি (জেপিসি)’তে পাঠানো হয়। এই কমিটিতে লোকসভার ২১ জন এবং রাজ্যসভার ১০ জন সদস্য ছিলেন।
- জেপিসি’র রিপোর্ট: ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে জেপিসি এই বিলের উপর তাদের রিপোর্ট তৈরি করে। ৩০ জানুয়ারি ৬৫৫ পৃষ্ঠার এই রিপোর্ট লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার কাছে জমা দেওয়া হয়। জেপিসি বিলটিতে ১৪টি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনের সুপারিশ করে এবং ১৪-১১ ভোটে এটি গৃহীত হয়। বিরোধী সদস্যদের কিছু আপত্তি থাকলেও, সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে রিপোর্টটি পাশ হয়।
- কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার অনুমোদন: ফেব্রুয়ারি ২০২৫-এ কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা জেপিসি’র সুপারিশকৃত ১৪টি সংশোধনসহ বিলটির সংশোধিত রূপ অনুমোদন করে। এরপর বিলটি সংসদে পাশের জন্য প্রস্তুত করা হয়।
- সংসদে পেশ: ২০২৫ সালের বাজেট অধিবেশনের দ্বিতীয় পর্বে (যা মার্চ-এপ্রিল ২০২৫-এ চলছে) এই বিলটি লোকসভায় পেশ করা হয়েছে। এখনও এটি চূড়ান্তভাবে পাশ হয়েছে কিনা, তার নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
- নাম পরিবর্তন: ১৯৯৫ সালের ওয়াকফ আইনের নাম পরিবর্তন করে ‘একীভূত ওয়াকফ ব্যবস্থাপনা, ক্ষমতায়ন, দক্ষতা এবং উন্নয়ন আইন, ১৯৯৫’ করার প্রস্তাব।
- ওয়াকফ ঘোষণার শর্ত: শুধুমাত্র ৫ বছর ধরে ইসলাম পালনকারী এবং সম্পত্তির মালিক ব্যক্তি ওয়াকফ ঘোষণা করতে পারবেন।
- সম্পত্তি জরিপ: জেলা কালেক্টরের অধীনে ওয়াকফ সম্পত্তির জরিপ করা হবে।
- কেন্দ্রীয় ওয়াকফ কাউন্সিল: এতে অমুসলিম সদস্যদের অন্তর্ভুক্তি এবং মহিলা সদস্যদের জন্য সংরক্ষণ।
- ওয়াকফ বোর্ডের ক্ষমতা হ্রাস: সম্পত্তি ওয়াকফ কি না তা নির্ধারণের ক্ষমতা বোর্ডের হাত থেকে সরিয়ে সরকারি কর্তৃপক্ষের হাতে দেওয়া।
- বিতর্ক ও বিরোধিতা: বিরোধী দলগুলোর দাবি, এই বিল সংবিধানবিরোধী এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অধিকারে হস্তক্ষেপ করছে। এটি সংবিধান বিরোধী এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অধিকারের উপরে হস্তক্ষেপ করছে কিনা সে বিষয়ে আমি মতামত দেব না। সংসদের বিরোধীরা ও কথা বলেছেন।
আমি আমার কথা বলি
প্রথমত: ওয়াকফ ঘোষণার শর্ত “পাঁচ বছর ধরে ইসলাম পালনকারী এবং সম্পত্তির মালিক ব্যক্তি ওয়াকফ ঘোষণা করতে পারবেন।” এমন কেন? যদি এমন করতেই হয় তবে তা সব ধরনের ধর্মীয় সম্পত্তির ক্ষেত্রে করা উচিত ছিল কিনা?
দ্বিতীয়ত: কেন্দ্রীয় ওয়াকফ কাউন্সিল, এতে অমুসলিম সদস্যদের অন্তর্ভুক্তি এবং মহিলা সদস্যদের জন্য সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে। এই বিষয়টিকে আমরা তো এমনই ভাবব, নিশ্চিতভাবে সরকারের অসৎ উদ্দেশ্য রয়েছে যাতে সরকারের পছন্দের লোককে সদস্যভুক্ত করে সরকারের কথা মতো কাউন্সিল চালানোর জন্যই এমন ভাবনা ।
তৃতীয়ত: ওয়াকফ বোর্ডের ক্ষমতা হ্রাস: সম্পত্তি ওয়াকফ কিনা তা নির্ধারণের ক্ষমতা বোর্ডের হাত থেকে সরিয়ে সরকারি কর্তৃপক্ষের হাতে দেওয়া। স্বাধীন স্বতন্ত্র বোর্ডের ক্ষমতা হ্রাস করা কি এক কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার আস্ফালন নয়? এভাবেই বহু ওয়াকফ সম্পত্তি সরকারি কর্তৃপক্ষকে দিয়ে এক নম্বর খতিয়ানের অন্তর্ভুক্ত করে তা কুক্ষিগত করা আসল উদ্দেশ্য, এমনই তো মনে হয়।
আপনারা কী ভাবছেন?
এই বিলের জেরে ন্যাশনাল ওয়াকফ বোর্ড বা ভারতের প্রতিটি রাজ্যের যে ওয়াকফ বোর্ড একটা স্বাধীন অটোনমাস বডি হিসাবে কাজ করছিল, যেখানে সরকারের কোনো খবরদারি চলছিল না, সেটাই এবার থেকে হবে। তবে এই বিলের বিরোধিতা করে আদালতের শরণাপন্ন খোদ তামিলনাড়ু সরকার, জাতীয় কংগ্রেস, অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল’বোর্ড, সোস্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি অফ ইন্ডিয়া (এসডিপিআই), মিমি-এর সাংসদ ব্যারিস্টার আসাদউদ্দিন ওয়েসি সহ অনেক দল, সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান। কলকাতা সহ সারা ভারতে ব্যাপক আন্দোলন চলছে বিলের বিরোধিতা করে।
লেখক: ভারতীয় সাংবাদিক ও সাহিত্যিক।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








