ডিজিটাল জালিয়াতিতে ২০২৫ সালে প্রায় ২৫ লাখ মানুষ প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার হারিয়েছে, যা ২০২১ সালের তুলনায় চার হাজার ৩০০ শতাংশ বেশি। এই বিস্ফোরক বৃদ্ধিতে এই বিষয়ে অবশেষে ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক, রিজার্ভ ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া (আরবিআই) হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) সংবাদমাধ্যম বিবিসিতে এ তথ্য প্রকাশ করেছে।
গত ফেব্রুয়ারিতে পশ্চিম ভারতের পুনে শহরের এক বিজনেস অ্যানালিস্ট অলক (ছদ্মনাম), একটি টেক্সট মেসেজ পান যেখানে তাকে অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোর জন্য এক হাজার রুপি (১০ দশমিক ৭৫ ডলার, ৭ দশমিক ৯ পাউন্ড) জরিমানা পরিশোধ করতে বলা হয়।
মেসেজটিতে সতর্ক করা হয়েছিল যে, দ্রুত অর্থ প্রদান না করলে তার ড্রাইভিং লাইসেন্স স্থগিত করা হতে পারে। এটি দেখে অলক দ্রুত অর্থ প্রদানের লিংকে ক্লিক করেন এবং পেমেন্ট সম্পন্ন করতে একটি ওটিপি (ওয়ান-টাইম পাসওয়ার্ড) শেয়ার করেন।
কয়েক মিনিট পরেই, তার ক্রেডিট কার্ড থেকে তিন হাজার ২২৫ ডলার কেটে নেওয়া হয়, যা ছিল তার লেনদেনের সর্বোচ্চ সীমা।
অলক অজান্তেই জরিমানার চেয়ে অনেক বড় অঙ্কের অর্থ অনুমোদনের মাধ্যমে ভারতে প্রচলিত একটি সাধারণ স্ক্যামের শিকার হন। এই জালিয়াতিতে প্রতারকরা সরকারি ওয়েবসাইটের মতো দেখতে ভুয়া মেসেজ পাঠিয়ে সাধারণ মানুষকে ফিশিং লিংকে নিয়ে যায় এবং তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খালি করে দেয়।
বিশেষজ্ঞরা এই ধরনের জালিয়াতিকে ‘সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং’ বা সামাজিক প্রকৌশল বলেন, যেখানে প্রতারকরা মনস্তাত্ত্বিক কারসাজি ব্যবহার করে এবং ভুক্তভোগীর মনে ভয় ও জরুরি অবস্থার সৃষ্টি করে তাদের ধোঁকা দেয়।
গত অর্ধ দশকে দেশজুড়ে ডিজিটাল পেমেন্টের অভূতপূর্ব প্রসারের সাথে সাথে ভারতে এই ধরনের জালিয়াতি আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
২০২৫ সালে প্রায় ২৫ লাখ মানুষ প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার হারিয়েছে, যা ২০২১ সালের তুলনায় চার হাজার ৩০০ শতাংশ বেশি। এই ব্যাপক বৃদ্ধির ফলে ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক, রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (আরবিআই), অবশেষে হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য হয়েছে।
এই মাসের শুরুর দিকে প্রকাশিত একটি আলোচনা পত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই সমস্যা মোকাবিলায় বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে—অ্যাকাউন্ট-টু-অ্যাকাউন্ট লেনদেনে প্রেরকের দিক থেকে এক ঘণ্টার বিলম্ব এবং বয়স্কদের মতো ঝুঁকিপূর্ণ শ্রেণির জন্য উচ্চমূল্যের ডিজিটাল পেমেন্টে “বিশ্বস্ত ব্যক্তি” দ্বারা অতিরিক্ত যাচাইকরণ।
আলোচনা পত্রে বড় অঙ্কের ক্রেডিটের সীমা এবং পর্যালোচনার কথাও বলা হয়েছে যাতে নিশ্চিত করা যায় যে এগুলো ‘মিউল অ্যাকাউন্ট’ (অবৈধ অর্থ হস্তান্তরের জন্য ব্যবহৃত অ্যাকাউন্ট) নয়। এছাড়া কার্ডের মতো ডিজিটাল পেমেন্ট চালু/বন্ধ করা এবং সীমা নির্ধারণের ওপর গ্রাহকদের আরও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
তবে বিবিসি-র সাথে আলাপকালে বেশ কয়েকজন বিশেষজ্ঞ বলেছেন, যদিও আরবিআই-এর সক্রিয় ভূমিকা ইতিবাচক হলেও এসব প্রস্তাবের প্রভাব সীমিত হতে পারে।
প্রথম প্রস্তাবটি, উদাহরণস্বরূপ, বিলম্বিত পেমেন্ট অলকের মতো ওটিপি জালিয়াতি প্রতিরোধে কার্যকর হতে পারে।
তবে আরবিআই-এর ইনোভেশন হাবের সাবেক সিইও রাজেশ বনসাল বিবিসি-কে জানিয়েছেন যে, সামগ্রিক জালিয়াতির প্রেক্ষাপটে এই ধরনের স্ক্যামগুলো অত্যন্ত নগণ্য।
তিনি বলেন, “তিন-চার বছর আগে এই স্ক্যামগুলোই ছিল প্রধান প্রকার, কিন্তু জালিয়াতি এখন অন্য স্তরে চলে গেছে এবং অনেক বেশি পরিশীলিত হয়ে উঠেছে।”
একটি শীর্ষস্থানীয় রেগুলেটরি প্রযুক্তি সংস্থা আইডিফাই-এর ঋজু রায় বলেন, ‘পেমেন্ট নেটওয়ার্কের সাথে অনেক পক্ষ জড়িত থাকায় পেমেন্টে বিলম্ব বাস্তবায়ন করা সহজ হবে না। বর্তমান আর্কিটেকচার পরিবর্তন না করে এটি করার কোনো সহজ উপায় নেই।’
আরবিআই আলোচনা পত্রে এটি স্বীকার করেছে যে, এই বিলম্ব প্রবর্তন করতে পুরো সিস্টেম জুড়ে পরিবর্তনের প্রয়োজন হবে—ট্রানজ্যাকশন কিউয়িং থেকে শুরু করে বাতিল করার মেকানিজম পর্যন্ত—যা সময় ও ব্যয়সাপেক্ষ।
এছাড়া এটি ডিজিটাল পেমেন্টের মূল বৈশিষ্ট্য ‘তাৎক্ষণিকতা’র সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
বনসাল বলেন, ‘এটি অনেকটা এক্সপ্রেসওয়ে তৈরি করে প্রতি কয়েক কিলোমিটারে স্পিড ব্রেকার বসানোর মতো এবং এই বাধা খুব একটা কাজে আসবে না।’
ঋজু রায়ের মতে, ‘প্রতারকরা এই ল্যাগ বা বিলম্ব অতিক্রম করার কোনো না কোনো উপায় বের করে নেবে। উদাহরণস্বরূপ, তারা গ্রাহককে পেমেন্ট করতে বলতে পারে এবং এক ঘণ্টা অপেক্ষা করতে বলতে পারে যাতে কোনো সতর্কতা সংকেত না ওঠে।’
তার মতে, বিবেচনাধীন অন্যান্য পদক্ষেপগুলো ন্যায়সংগত হলেও বেশ কিছু প্রশ্ন থেকে যায়।
তিনি প্রশ্ন করেন, ‘প্রবীণ নাগরিকদের জন্য অতিরিক্ত চেক অবশ্যই সুপারিশযোগ্য, কিন্তু কেউ এটি কীভাবে প্রতিপালন করবে? যদি আপনার তথাকথিত ‘বিশ্বস্ত উপদেষ্টা’ বিদেশে থাকেন তবে কী হবে? আর তারা যদি আপনাকে একটি লেনদেন করতে বলে যা শেষ পর্যন্ত জালিয়াতি হিসেবে প্রমাণিত হয়? তখন দায়বদ্ধতা কার ওপর বর্তাবে?’
ক্রেডিট সীমিত করা এবং যথাযথ তদারকি বাড়ানোর মাধ্যমে মিউল অ্যাকাউন্ট শনাক্তকরণ জোরদার করার প্রস্তাব কার্যকর হতে পারে, তবে এটি ব্যয়বহুল এবং শেষ পর্যন্ত সেই খরচ গ্রাহকদের ওপরই পড়বে।
বনসালের মতে, আরবিআই-এর কাছে ইতোমধ্যে ‘মিউল-হান্টার ডট এআই’ নামে একটি মিউল শনাক্তকরণ প্ল্যাটফর্ম রয়েছে যা সুবিধাভোগী অ্যাকাউন্ট সম্পর্কে তথ্য প্রদান করে।
তিনি বলেন, ‘এটি আমি সিইও থাকাকালে তৈরি হয়েছিল। এটি ব্যাংকিং সিস্টেমে প্রায় রিয়েল-টাইমে চালু করা প্রয়োজন, কিন্তু তা এখনো হয়নি।’ তিনি এটি দ্রুত বাস্তবায়নের আহ্বান জানান।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু নিয়ম-কানুন দিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। এই ব্যবস্থাগুলোর পাশাপাশি মানুষকে সচেতন করা এবং শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া জরুরি। ভারতের মানুষ দ্রুত ডিজিটাল হচ্ছে, কিন্তু নিরাপত্তা ও সচেতনতা সেই হারে বাড়ছে না।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক অমিতাভ বচ্চনের মতো মহাতারকাদের যুক্ত করে এবং আইপিএল-এর মতো জনপ্রিয় ক্রিকেট খেলা ব্যবহার করে শিক্ষামূলক প্রচারণা চালাচ্ছে। তবে ঋজু রায়ের মতে, ডিজিটাল সাক্ষরতা উন্নত করার জন্য আরও বিনিয়োগ প্রয়োজন।
বনসাল বলেন, এই সমস্যার মূলে আঘাত করার জন্য আরবিআই-কে পুলিশ, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং অন্যান্যদের সাথে আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমানে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—এই সমস্যার দায়ভার কার?’
তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা একটি আলোচনার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই ক্রমবর্ধমান সমস্যার কথা পুনরায় স্বীকার করেছে—এটি একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ বলে মনে করেন ঋজু রায়।
তিনি বলেন, ‘এই আলোচনা শেষ পর্যন্ত নতুন নিয়ম-নীতিতে রূপ নেবে। আগে আরবিআই হঠাৎ করে নির্দেশ দিত, এখন তা বদলেছে—এটাই বড় পরিবর্তন।’








