এই খবরটি পডকাস্টে শুনুনঃ
ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরত পাঠানোর জন্য ভারতের কাছে বাংলাদেশ সরকার আবারও অনুরোধ জানালেও বিষয়টির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ভারতের আদালতই নেবে বলে জানিয়েছেন দেশটির শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তারা। তবে ঢাকার সঙ্গে এ বিষয়ে নিবিড় আলোচনা চলছে এবং সর্বোচ্চ বা কঠোর অবস্থান থেকে সরে আসার পথ খোঁজা হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন তারা।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ঈন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
ভারতের এক জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা বলেন, শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত আদালতই নেবে। এটি রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত হবে না। আদালতের প্রক্রিয়ায় মূলত যাচাই করা হবে, বাংলাদেশে তার বিরুদ্ধে যে অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে, সেগুলো ভারতের আইনেও অপরাধ হিসেবে গণ্য হয় কি না।
আরেক কর্মকর্তা বলেন, শেখ হাসিনা নিজেই জানিয়েছিলেন, চলতি বছরের ডিসেম্বরে দেশে ফেরার পরিকল্পনা রয়েছে তার। গত ৫ আগস্ট এক সংবাদ সম্মেলনে দেশে ফেরার সময় সম্পর্কে জানতে চাইলে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ডিসেম্বর আমাদের বিজয়ের মাস। তাই আমি ডিসেম্বর মাসেই ফিরে যেতে চাই।
শেখ হাসিনা বর্তমানে মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি এবং তার দল আওয়ামী লীগের কার্যক্রমও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রত্যর্পণ অনুরোধের বিষয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র এর আগে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে বলেছিলেন, আমরা আমাদের প্রচলিত প্রক্রিয়া অনুযায়ী বিষয়টি পর্যালোচনা করছি। এ বিষয়ে কোনো তথ্য জানানোর মতো হলে আমি আপনাদের জানাব।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে পাঠানো প্রত্যর্পণ অনুরোধের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সব আইনি নথি সংযুক্ত করা হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে ২০১৩ সালে স্বাক্ষরিত প্রত্যর্পণ চুক্তির বিধান অনুযায়ী এসব নথি দেওয়া হয়েছে।
২০২৪ সালের আগস্টে ঢাকায় গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে প্রায় দুই বছর ধরে শেখ হাসিনা নয়াদিল্লির একটি গোপন স্থানে আশ্রয় ও নিরাপত্তায় রয়েছেন। গত ৫ আগস্ট ভারতের রাজধানী থেকে ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে তিনি দেশে ফেরার ব্যাপারে ‘দৃঢ়প্রতিজ্ঞ’ থাকার কথা জানান।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের বর্তমান ও সাবেক সংসদ সদস্যদের দাবি, ভারতে অবস্থান করলেও শেখ হাসিনা নিয়মিত বাংলাদেশে দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। মাঝে মাঝে তিনি সরাসরি বৈঠকও করছেন এবং নিয়মিত টেবিল টেনিস খেলছেন। ৭৮ বছর বয়সী এই নেত্রী বছরের শেষ দিকে ঢাকায় ফেরার পরিকল্পনা করছেন বলেও তারা জানান।
এদিকে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনা চলছে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধে’ দোষী সাব্যস্ত হয়ে শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড পাওয়ার বিষয়টিকে ভিত্তি করে ঢাকা তার প্রত্যর্পণের দাবি জানিয়ে আসছে।
তবে আওয়ামী লীগের নেতারা বলছেন, ভারতের আদালতে প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া শুরু হলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ওই রায়কে বিভিন্ন দিক থেকে চ্যালেঞ্জ করা হতে পারে। এর মধ্যে অন্যতম যুক্তি হতে পারে, বাংলাদেশে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ওই রায় দেওয়া হয়েছিল।
ভারত ও বাংলাদেশ ২০১৩ সালে প্রত্যর্পণ চুক্তি স্বাক্ষর করে। চুক্তিতে এমন ব্যক্তিকে ফেরত দেওয়ার বিষয়ে ‘বাধ্যবাধকতা’র কথা বলা হয়েছে, যার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, যিনি দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন অথবা আদালতের দেওয়া সাজা কার্যকর করার জন্য যাকে খোঁজা হচ্ছে।
চুক্তিতে আরও বলা হয়েছে, কোনো প্রত্যর্পণযোগ্য অপরাধের বিষয় থাকলে সেটি অপর চুক্তিবদ্ধ দেশের বিচারিক কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হবে।
চুক্তির ৬ নম্বর ধারায় রাজনৈতিক চরিত্রের অপরাধের ক্ষেত্রে প্রত্যর্পণের আবেদন গ্রহণ না করার কথা বলা হয়েছে। তবে হত্যা, নরহত্যা, হামলা, আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার ও হত্যায় প্ররোচনাসহ ১২ ধরনের অপরাধকে রাজনৈতিক অপরাধ হিসেবে বিবেচনা না করার কথাও এতে উল্লেখ রয়েছে।
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের ক্ষেত্রে ভারতের ১৯৬২ সালের প্রত্যর্পণ আইনও গুরুত্বপূর্ণ। ওই আইনে দেশটিতে অবস্থানরত পলাতক আসামিদের প্রত্যর্পণের আইনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত বলা হয়েছে।
আইন অনুযায়ী, ভারতের কনস্যুলার, পাসপোর্ট ও ভিসা (সিপিভি) বিভাগ প্রত্যর্পণ-সংক্রান্ত বিষয় দেখভালের কেন্দ্রীয় দপ্তর হিসেবে কাজ করে। সংশ্লিষ্ট প্রত্যর্পণ চুক্তি বা ব্যবস্থার বিষয় বিবেচনার পর মন্ত্রণালয় প্রয়োজন মনে করলে একজন তদন্ত ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করতে পারে।
তদন্ত শেষে ম্যাজিস্ট্রেট যদি মনে করেন, বিদেশি রাষ্ট্রের অনুরোধের ভিত্তিতে পলাতক ব্যক্তিকে হস্তান্তরের মতো যথেষ্ট ভিত্তি রয়েছে, তাহলে তিনি প্রত্যর্পণের সুপারিশ করতে পারেন। অন্যদিকে তদন্ত শেষে যদি তিনি মনে করেন, বিদেশি রাষ্ট্রের দাবির পক্ষে প্রাথমিকভাবে গ্রহণযোগ্য কোনো মামলা প্রতিষ্ঠিত হয়নি, তাহলে ওই ব্যক্তিকে মুক্তি দেওয়ার ক্ষমতাও তার রয়েছে।










