লিখতে বসে ১২, ১৩ বছর আগে আমি দেখতে কেমন ছিলাম এই ভাবনাটা মাথার ভেতর ঘুরঘুর করছে। সেই সময়ের কোন একটা ছবি দেখলেই হয়, কিন্তু আমার ভেতরের যে তোলপাড় তা কি ছবি দেখে বোঝার উপায় আছে! এই যখন ভাবছি তখন আমার এক ক্লাসমেট সাজিদের পাঠানো একটা ছবির কথা মনে পড়লো, ওর ফোনে তোলা। ক্যাম্পাসে বসে আছি, কালো টিশার্টে বুকের মধ্যে চে গুয়েভারা! অর্থনীতির যে সমাজতান্ত্রিক মতবাদ তা নিয়ে বিস্তর পড়াশোনা কিংবা কোন সমাজতান্ত্রিক দলের সঙ্গে সক্রিয় না থাকলেও বহু তরুণের মত আমার চোখেও চে গুয়েভারা নায়ক হয়ে ধরা দিয়েছে ততোদিনে এবং দুনিয়া বদলে ফেলার ব্যাকুলতা বুকে নিয়ে ঘুড়ে বেড়াতাম এখানে সেখানে। সেই সময়টায় আমার চারপাশের বাচ্চাদের নিয়ে আমি নানান কিছু করতাম।
বিজয় দিবস উদযাপন, পহেলা বৈশাখে সবাই একসঙ্গে ছবি আঁকা, নিজেরা নিজেরা নাটক করা এমন আরো অনেক কিছু। এমনকি আমার একটা ডিভিডি প্লেয়ার ছিল তখন, “আমাদের সিনেমা হল” নাম দিয়ে নিজের ঘরে একটা সিনেমা হল বানাই। ঋত্বিক ঘটকে বিভোর থাকায় অযান্ত্রিক, মেঘে ডাকা তারা দিয়ে বাচ্চাদের ছবি দেখাতে শুরু করি। এরপর সত্যজিৎসহ পরপর আরো কয়েকজনের ছবি দেখিয়েছি নিয়মিত। একদিন মনে আছে নিজের নস্টালজিক স্মৃতিকে ভর করে আমার বাড়ি এবং আশপাশের কয়েকবাড়ির বাচ্চাদের নিয়ে রাত জেগে ‘দীপু নাম্বার টু’ দেখি। নিজের নস্টালজিক স্মৃতি বলতে খুব ছোটবেলায় শীতের রাতে আমাদের বড়রা ভিডিও প্লেয়ার ভাড়া নিয়ে আসতো, কাঁথায় নিজেদের মুড়িয়ে গাদাগাদি করে একসঙ্গে ছবি দেখতাম সারারাত। আহা! এই আমাদের ঈদ! এই স্মৃতির কাতরতা নতুনদের বোঝানো কঠিন।

তো সেই রাতে বাচ্চাদের কয়েকজন অভিভাবক আমার উপর রাগ করেন। আমার মা, সেও ভীষণ বিরক্ত হয়ে আমাকে বকাবকি করেন। ইতোমধ্যে আমি বাবা মায়ের চূড়ান্ত অবাধ্য সন্তান হয়ে ধরা দিয়েছি, তাই রাগারাগি, বকাবকি কোনকিছুতেই কাজ হয় না। তবে মাঝেমধ্যে তুমুল অস্বস্তিতে ভুগলে ঘর ছাড়ি, ঘড় ছেড়ে এখানে সেখানে চলে যাওয়া আমার তখন নিত্য নৈমিত্যিক ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়। এমনই টালমাটাল পরিস্থিতিতে আমাদেরই একজন, রবিন, যাকে আমরা গিট্টু রবিন বলে ডাকতাম, সে স্থানীয় রাজনৈতিকের প্রশ্রয়ে কিশোর গ্যাংয়ের নেতা হয়ে আবির্ভূত হলো। নেশা, মারামারি, ছিনতাই, ইভটিজিং কোন কাজই তার আয়ত্ত্বের বাইরে না। বিষয়টা আমাকে ভীষণভাবে আহত করে। রবিনের প্রতি আমার ক্ষোভ থাকে না কোন, ওর সঙ্গে দেখা হলেই কথা হয় টুকটাক, বরং আমি ভাবতে থাকি কী এমন বিষয় যা আমার আর রবিনের মধ্যে পার্থক্য করেছে, আমরাতো এক সঙ্গেই বেড়ে উঠলাম! প্রাথমিক ভাবনায় আমার তখন মনে হলো বই আমার আর রবিনের মধ্যে পার্থক্য তৈরী করেছে। ছোট থেকেই পাঠ্যবইয়ের বাইরের বই আমাকে বেশি টানতো, সেই সুবাদে নানান কিসিমের বই পড়তাম, গুনে দেখি ঘরে আমার ৬৯ টা বই। আর এই ৬৯টা বই দিয়েই আমাদের পাঠাগারের যাত্রা শুরু! ৩ মে, ২০১৩। এক্ষেত্রে আমার পিঠাপিঠি বড়ভাই সুমনের একটা বড় ভূমিকা আছে। খুব সম্ভবত এপ্রিলের ২৮ কিংবা ২৯ তারিখে প্রথম পাঠাগারের ভাবনা আমার মাথায় আসে এবং আমি চিন্তা করি কাঠের একটা তক্তা নিয়ে বাড়ির পাশেই বইগুলো রেখে পাঠাগারের কার্যক্রম শুরু করবো।

লিখতে শুরু করে কন্টিনিউ করা আমার জন্য মুশকিলের। লেখার মাঝখানেই আমি ওয়ার্কিং টেবিল ছেড়ে বাড়ির পেছনের ধানক্ষেত ধরে খালি পায়ে দীর্ঘপথ হাঁটতে শুরু করি। ধান কাটা শেষ হলেও ধানগাছের গোড়াগুলো এখনো দাঁড়িয়ে আছে, ইচ্ছে করেই ধানগাছের গোড়াগুলোতে আমি পা মাড়িয়ে চলি, এতে শৈশবের নানান স্মৃতি আমার মনে পড়ে। কয়েকটা ক্ষেতের মাটি বৃষ্টির পানিতে নরম হয়ে থাকলেও, কয়েকটা ক্ষেতের মাটি শক্ত হয়ে আছে। তাই হাঁটতে গিয়ে আমি একেকসময় একেকরকম অনুভূতি টের পাই। পরম আদরে আমি মাটি স্পর্শ করি, গাছের পাতায় চুমু খাই। একটা ধানগাছের গোড়া উপড়ে তুলি, অনেকগুলো নরম মাটি উঠে আসে, আমি এক টুকরা কাদা নিয়ে খেলতে শুরু করি। বিলের পাড়ে বসবাস শুরু করার পর থেকেই আমার এমনটা হয়েছে, লিখতে শুরু করে হঠাৎ লেখা বাদ দিয়ে বিলের পাড় ধরে হাঁটি। বর্ষার বিল শীতে ফসলি ক্ষেতে হয়ে গেছে, এখন আবার বর্ষা হবে হবে ভাব। কিন্তু লিখতে শুরু করা আমার বহু লেখা শেষ হয়নি। তবে এই লেখাটা আমার এখন শেষ করা দরকার নইলে হয়তো কোনদিনই লেখাটা শেষ হবে না, অন্যান্য লেখার মতো মাঝপথে আটকে থাকবে।
আমার ভাই ১ মে ২০১৩ সালে ফ্লেক্সিলোডের দোকান দেয়, ও এখন বড় ব্যবসায়ী হওয়ার পথে। তখন ভাইকে আমি প্রস্তাব দেই “তোর দোকানে আমি দুই ঘণ্টা সময় দিবো, এই দুই ঘণ্টা সময় তোর দোকানে পাঠাগারের কার্যক্রম চলবে।” এই প্রস্তাবে ভাই আনন্দেই রাজি হয়। ৩ মে “অনামা সাহিত্যালয়” নাম দিয়ে আমাদের পাঠাগারের কার্যক্রম শুরু করি। জামান ভাইয়ের (মোহাম্মাদ নূরুজ্জামান, চলচ্চিত্র নির্মাতা) সঙ্গে বিষয়টা শেয়ার করলে সে আমাকে ভীষণ উৎসাহিত করেন, পরামর্শ দেন পাঠাগারের নামটা আরো সহজ করতে। এমন কোন নাম রাখতে যা সহজেই নিজেদের মনে হয়, এরপর “অনামা সাহিত্যালয়” বদলে নাম রাখি “আমাদের পাঠাগার”। জামান ভাই আমাকে আরো উৎসাহিত করে বললেন “আগামী বইমেলায় আমি তোমাদের পাঠাগারে ১০০ বই উপহার দিবো”। আমি তখন মনে মনে ভাবি সবেমাত্র মে মাস, ফেব্রয়ারী আসতে আসতে পাঠাগার থাকবেতো! আজকে মে মাসের ৪, ২০২৫, এক যুগ পার করলাম আমরা!
পাঠাগার দেয়ার কিছুদিন পর সে বছরই জুলাই মাসে আমি একটা উপবৃত্তি পাই। উপবৃত্তির টাকায় একটা বুকসেল্ফ এবং খেলাধুলার সরঞ্জাম, ক্রিকেট ব্যাট, বল, স্ট্যাম্প এবং মেয়েদের জন্য দড়িলাফ খেলার দড়ি আর লুডু কিনে নাম রাখি “আমাদের খেলাঘর”। শর্ত ছিল কেউ খেলাঘর থেকে খেলার সরঞ্জাম নিতে হলে অবশ্যই পাঠাগার থেকে বই নিয়ে পড়তে হবে, ভাবনায় ছিল বাচ্চারা বই আর খেলাধুলা নিয়ে থাকলে কেউ ভিন্ন পথে যাবে না, টঙ্গীতে তখন মাদক আর কিশোর গ্যাংয়ের বাড়াবাড়ি, যদিও তখন কিশোর গ্যায় শব্দটার সঙ্গে আমরা পরিচিত না, কিশোর গ্যাংকে স্থানীয় ভাষায় আমরা ‘মস্তান’ বলতাম। যাইহোক, খেলাঘর দেয়ার কয়েকদিন পর আমি খেয়াল করলাম কেউ কেউ শুধু খেলতে আসে, পাঠাগারের বই তারা ছুঁয়েও দেখে না। এ বিষয়ে আমি লালনের সঙ্গে কথা বলি, জানতে চাই কেন সে বই পড়ে না। এরমধ্যে এলাকার অনেকেই বই উপহার দিয়েছে আমাদের পাঠাগারে, আবার কেউ কেউ আমাদের হাতে টাকা ধরিয়ে দিয়ে বলেছে নিজেদের পছন্দ মতো বই কেনো, এরমধ্যে শ্যামল ভাইয়ের ১ হাজার টাকা দেয়ার কথা মনে আছে, আর টাকা পেলেই আমরা সচেতনভাবে একদম ছোটদেরই বই কিনতাম বেশি, ওরাই আমাদের মূল টার্গেট ছিল। আমরা বলতে বন্ধু সজীব এবং আমার চেয়ে বছর কয়েকের ছোট সুমন আমার সঙ্গে ততোদিনে যোগ দিয়েছে।
লালন আমাকে বললো সে বই পড়তে পারে না। আমি তখন ওর হাতে ছোটদের বই ধরিয়ে দিয়ে পড়তে বলি। লালন জানায় কয়েকটা বাংলা স্বরবর্ণের বাইরে সবই ওর কাছে অপরিচিত। লালনের কথায় আমি ভীষণভাবে বিস্মিত এবং আহত হই, এই সময়ে এসেও কোন বাচ্চা অক্ষরজ্ঞানশূণ্য থাকতে পারে! সামান্য রিডিং পড়বারও সামর্থ থাকবে না! এই একই অভিজ্ঞতা আরেক ছেলে বাদশার ক্ষেত্রে ঘটে। বাদশার সঙ্গে বহুবছর পর সেদিন আমার দেখা হয়েছে, বিয়ে করে এখন সে সন্তানের জনক, তবে লালনের সঙ্গে দেখা হয় না বহুদিন। আমি লালন আর বাদশা দুজনের কাছেই জানতে চাই স্কুলে ভর্তি করালে পড়বে কিনা। তাঁরা জানায় সকাল আটটা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত তাদের অফিস, স্কুলে পড়া সম্ভব না। মূলত ওদের কথা শুনেই প্রথম ‘নৈশ বিদ্যালয়’-এর ভাবনা আমরা মাথায় আসে এবং ততোদিনে আমি একটা চাকরিও করছি। চাকরির সুবাদেই আমাদের পাঠাগারের নিজস্ব একটা রুমও হয়েছে, মায়ের কাছ থেকেই পাঠাগারের রুমটা ভাড়া নেয়া।
আর সেই রুমেই হাসনাত, এনামুল ভাই এবং আরেকজন, নামটা মনে করতে পারছি না, সম্ভবত এই ৩ জনকে নিয়েই ১ জুন ২০১৪ সালে ‘আমাদের নৈশ বিদ্যালয়’-এর যাত্রা শুরু হয়। যাত্রার শুরুতে আমি কয়েকটা ছবি তুলে ফেসবুকে পোস্ট দেই, সেই ফেসবুক পোস্টে প্রিমা আলমের চোখ আটকায়। প্রিমা আপার সঙ্গে আমার পরিচয় ২০১২ সালে। তিনি আমাদের নৈশ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য বই এবং খাতা কলম পাঠান। আমাদের নৈশ বিদ্যালয়ের সঙ্গে প্রিমা আলমের যুক্ত হওয়া খুবই উল্লেখযোগ্য ঘটনা, এই বিষয়ে আমি পরে আসছি।
প্রচণ্ড গরম তখন, আমাদের নৈশ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীসংখ্যাও বেড়েছে, এক রুমে ক্লাশ নেয়া কঠিন। আতিক ভাই (সৈয়দ আতিক, স্থানীয় সাংবাদিক) বিষয়টা খেয়াল করলেন, তিনি তখন আমাদের বাড়ির পাশের একটা স্কুল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেন। রাতে স্কুলের ক্লাশরুমতো ফাঁকাই পড়ে থাকে, কথা হয় ইলেকট্রিসিটি বিল বাবদ ১০০০ টাকা দিতে হবে আমাদের। আমরা স্বানন্দে রাজি হই। আমি তখন অফিস করলেও নাজমুল, মামুন, বীথি, রাজীব, অ্যানি, সোহেল, স্বর্ণাসহ আরো বেশ কয়েকজন আমাদের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় স্কুল এবং পাঠাগারের কার্যক্রমে কোন ব্যাঘাত ঘটে না, শিক্ষার্থীসংখ্যাও বেড়েছে অনেক। এরমধ্যে ফেব্রুয়ারি এসে হাজির হয়, আমরা ২১ ফেব্রুয়ারি উদযাপনের পরিকল্পনা করি।

স্থানীয় চিত্রশিল্পী কামরুল ভাই শিক্ষার্থীদের নিয়ে নাটকে মহড়া শুরু দেন, বাকিদের মধ্যে কেউ কেউ কবিতা আবৃত্তি এবং নৃত্যের প্রস্তুতি শুরু করে দেয়। এখানে একটা আলাপ করে রাখা দরকার তাহলে পরের ঘটনার কানেকশন বুঝতে সুবিধা হবে। নানান বিষয়ে আমার নানান রকম ভিন্ন মতামত, প্রথম স্বল্পদৈর্ঘ্য ‘পুতুল’ শুট করতে গিয়ে হ্যান্ডি ক্যামেরা হাতে নিয়ে এদিক সেদিক ঘোরাফেরা করা, ভীষণ অস্থিরতায় ভুগলে কাদা কিংবা পুকুরে গলাপানিতে দাঁড়িয়ে থাকা এবং এরমধ্যে আমাদের এলাকায় ক্লিমেনটিনে এডারভিনকে (ডাচ, চলচ্চিত্র নির্মাতা) নিয়ে আসা। সবমিলিয়ে আমাকে নিয়ে নানান রকম আপত্তিকর মন্তব্য শুরু হয়। নাস্তিকের চেয়েও পাগল এবং এলাকার বাচ্চাদেরকে দেখিয়ে বড় বড় ভিনদেশী ফান্ড মেরে দিচ্ছি, এ ধরনের মন্তব্য খুব নিষ্ঠুরভাবে এলাকার লোকজন করতে শুরু করে। আমার মা প্রায়ই কান্নাকাটি করতেন তখন, স্কুল পাঠাগার করার ক্ষেত্রে মায়ের ভূমিকা আছে সত্য কিন্তু মা বহুবার অসহায় কণ্ঠস্বরে অনুরোধ করেছেন স্কুল, পাঠাগার আর সিনেমা বানানো বন্ধ করতে এবং বাবা আমার সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করেছেন আরো আগেই। সেই সময়টায় আমি খুব বেশি সাফোকেশনে ভুগতাম, নিজের শরীরের স্বাদ তিতা মনে হতো।
প্রভাতফেরী শেষে আমরা পড়ন্ত বিকেলে সীমা আপা, নিজাম ভাই, শাহী ভাই, শওকত ভাইসহ আরো যারা সবসময় আমাদের কাজে উৎসাহিত করেছেন তাঁদের উপস্থিতিতেই আমাদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শুরু করি। স্থানীয় কোন রাজনৈতিক ব্যক্তিদের আমন্ত্রণ জানাইনি বলে ততক্ষণে কানাঘুষা শুরু হয়েছে। আমার আসলে সেই অর্থে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সঙ্গে কোন পরিচয় কিংবা সম্পর্ক ছিল না কোনকালে, আমি নিজের মতই থেকেছি বরাবর। আর সেটাই হয়তো সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল সেদিন। অনুষ্ঠান চলার মাঝপথে হঠাৎ ইলেকট্রিসিটি বন্ধ! স্কুল কর্তৃপক্ষ উপস্থিত বহু দর্শকের সামনে আমাদেরকে অপমানিত করে বের করে দেয়। আমরা কোনকিছুই বুঝতে পারছিলাম না, স্কুল প্রতিষ্ঠাতা শুভু বেগম কিছুক্ষণ আগেও অনুষ্ঠান চলাকালীন আমার সঙ্গে হাসি দিয়ে কথা বললেন। অথচ এর কিছুক্ষণ পরে তার ব্যবহার পুরোপুরি অপরিচিত, এমন অপমানজনক ব্যবহারের সম্মুখীন আমি কোনদিন হইনি এর আগে। নিজেদের সামলে রাখার চেষ্টা করলেও চোখ ঠিকই ভিজে উঠেছিল আমাদের, টলটল করে পানি পড়ছিল, আমরা স্কুল থেকে বেরিয়ে আসি।
আবার স্কুল শুরু হবে কিনা তা পুরোপুরি অনিশ্চিত। কয়েকদিন বিধ্বস্তভাবে এদিকসেদিক ঘোরাফেরা করলাম। কয়েকজন আশ্বাস দিলেও কাজ হচ্ছে না। এরপর কি মনে করে হঠাৎ রহিম স্যারের (আব্দুল রহিম পাঠান) কথা মনে পড়ে। স্যারের সঙ্গে তখন আমার এতো হৃদ্যতা নেই, দেখা হলে টুকটাক কথা হয়। এক সন্ধ্যায় তাঁর সঙ্গে দেখা করে সব শেয়ার করলাম। স্যার বেশ খোশমেজাজেই বললেন আমার স্কুলে আপনাদের কার্যক্রম শুরু করেন। প্রাথমিকভাবে স্যারের কথায় আমি খুশি হলেও ভেতরে আমার দগদগে পুরানো স্মৃতি সংশয়ে ফেলে, রহিম স্যার বোধহয় তা টের পান। তিনি হাসি দিয়ে আমাকে বলেন “আমি যতদিন বেঁচে আছি আপনারা আমার স্কুলটা নিজেদের মত করে ব্যবহার করেন, কোন সমস্যা নাই”। স্যার তাঁর কথা রেখেছেন সেই ২০১৫ সাল থেকে এখনও আমরা পাগাড় মোহাম্মদ আলী পাঠান স্কুল পুরোপুরি নিজেদের মত করে ব্যবহার করছি। পরবর্তীতে স্যারের বড় মেয়ে জেরিন পাঠান স্কুলের দায়িত্ব নেয়ার পরেও আমাদের নৈশ বিদ্যালয়ের কার্যক্রমে সামান্য ব্যাঘাত ঘটেনি বরং সেও তাঁর বাবার মত আমাদের নৈশ বিদ্যালয়ের প্রতি আন্তরিক।
এরমাঝে প্রিমা আপা আমাকে একদিন নক করে বললেন “ভাইয়া আমার বাবা (হেলাল মোখলেস আলম) একটা অর্গানাইজেশনের সঙ্গে (ওল্ড ফৌজিয়ান এসোসিয়েশন) যুক্ত আছেন, সামনে তাঁদের একটা প্রোগ্রাম আছে। আপনি ঐখানে আপনার স্কুল নিয়ে ছোট্ট একটা স্পিস দেন, স্কুলের জন্য ভালো হবে।” আমি সেদিনের প্রোগামে কী কী যেন বলেছিলাম, মনে নেই। ভেতরে খুব আনইজিও ফিল করছিলাম, একধরনের অবস্থানগত হীনমন্যতাতো আছেই। হেলাল স্যার তা বুঝতে পেরে আমার সঙ্গে খুবই আন্তরিক ব্যবহার করেন, একসঙ্গে খেতে বসি আমরা। খাওয়া শেষে মোমিন স্যার (মোমিন উদ দৌলা) আমাকে বললেন “আমি তোমাদের স্কুলে একদিন যেতে চাই, আমার নাম্বারটা রাখো, কাল আমি দেশের বাইরে যাবো, ২৪ তারিখ (মাসের নামটা মনে করতে পারছি না) ফিরবো, তুমি ২৬ তারিখ কল দিবে আমাকে।” আমি মোমিন স্যারের কার্ডটা হাতে নিলেও সন্দেহ ছিল এত ব্যস্ততার মধ্যে তিনি আদৌ আসবেন কিনা। আমি আমার দায়িত্বের জায়গা থেকে ২৬ তারিখ কল দিলে তিনি ঠিকই তার একদিন কি দুদিন পর আমাদের নৈশ বিদ্যালয়ে এসে হাজির হয়। আমাদের পাঠাগার, স্কুলের কার্যক্রম দেখে স্বভাবতই মোমিন উদ দৌলা স্যার মুগ্ধ হন এবং জানতে চান স্কুল কীভাবে চলছে। আমি তখন জানাই আমরা নিজেদের মধ্য থেকে ১০০ টাকা করে চাঁদা তুলে পাঠাগারের ভাড়াটা ম্যানেজ করছি আর স্কুলের টুকটাক খরচ চলছে শিক্ষার্থীদের মাসিক ৫০ টাকা চাঁদায়। মোমিন স্যার তখন বলেন “আবু বক্কর সিদ্দিক ফাউন্ডেশন নামে আমাদের একটা ফাউন্ডেশন আছে, ফাউন্ডেশন কীভাবে তোমাদের হেল্প করতে পারে?” আমি তখন ভলেন্টিয়ারদের যাতায়াত ভাড়া এবং স্কুলের আনুষাঙ্গিক খরচের কথা বলি। আর সেই হিসাব অনুযায়ী আবু বক্কর সিদ্দিক ফাউন্ডেশন প্রতি মাসে ১০ হাজার টাকা করে দিতে শুরু করেন, যা পরবর্তীতে কয়েক ধাপে বেড়ে ২০ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে!

ছোট্ট একটা ঘটনা দিয়ে লেখাটা শেষ করবো। কিছুদিন আগে আমাদের নৈশ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন এক শিক্ষার্থী মাসুমের সঙ্গে বহুদিন পর আমার দেখা। দুজনের পথ এক হওয়ায় মাসুমকে আমার মোটরবাইকের পেছনে উঠাই। দুজনে নানান কথা বলতে বলতে মাসুম হঠাৎ কথা প্রসঙ্গে আমাকে নিয়ে ওর ছেলেমানুষি আবেগ শেয়ার করতে শুরু করলো। কথার সারমর্মটা এমন, মাসুম এখন গ্র্যাজুয়েশন করছে, যা ওর কল্পনার অতীত এবং নৈশ বিদ্যালয় ছাড়া তা অসম্ভব ছিল। এমন মন্তব্য আমার কাছে নতুন না, অনেকেই আমাদের নৈশ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক শেষ করে এখন গ্র্যাজুয়েশন করছে। কিন্তু সেদিনের উচ্চারিত মাসুমের প্রতিটি শব্দ এত সরল এবং প্রাণভরা যা আমার অন্তর স্পর্শ করে। আমি আর কথা বলতে পারছিলাম না, আমার চোখ ছলছল করছিল, মাসুমকে ওর বাড়ির সামনে রেখে বাইক টান দিয়ে আমি সোজা চলে যাই।








