পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের গ্রেপ্তার নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে পাকিস্তানে। আজ মঙ্গলবার বিকেলে দুটি মামলার শুনানির জন্য ইসলামাবাদ হাইকোর্টে (আইএইচসি) উপস্থিত হলে আদালত প্রাঙ্গণ থেকে আধাসামরিক বাহিনী তাকে গ্রেপ্তার করে।
ঘটনার সময় ধারণ করা একটি ভিডিওতে দেখা যায়, ইমরান খানকে ঘিরে থাকা আধাসামরিক কর্মীদের একটি দল তাকে সাঁজোয়া যানের দিকে নিয়ে যাচ্ছিল।
এই বিষয়ে ইসলামাবাদ পুলিশ ইন্সপেক্টর জেনারেল (আইজি) আকবর নাসির খানের বরাত দিয়ে এক বিবৃতিতে বলা হয়, কাদির ট্রাস্ট মামলায় ইমরান খানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ‘বাহরিয়া টাউন’ পিটিআই চেয়ারম্যান ইমরান খান ও তার স্ত্রীর মালিকানাধীন আল-কাদির ট্রাস্টকে ৫৩০ মিলিয়ন রুপি মূল্যের জমি বরাদ্দ করেছে। কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে ইসলামাবাদে ১৪৪ ধারা জারির কথাও জানানো হয়েছে।
দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রানা সানাউল্লাহ বলেছেন, ইমরান খানকে একাধিক নোটিশ জারি করা সত্ত্বেও তিনি আদালতে হাজির হতে ব্যর্থ হয়েছেন। ‘জাতীয় জবাবদিহি ব্যুরোর’ সদস্যরা তাকে গ্রেপ্তার করেছে। তার প্রতি কোনো সহিংসতা করা হয়নি।
এদিকে আইএইচসি প্রধান বিচারপতি আমের ফারুক ইমরানের গ্রেপ্তারের ব্যাখ্যা দিতে ইসলামাবাদের পুলিশ প্রধান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেলকে তলব করেছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, ইসলামাবাদের পুলিশ প্রধান আদালতে হাজির না হলে তিনি প্রধানমন্ত্রীকে ‘তলব’ করবেন।
রয়টার্সের একজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেছেন, ইমরান আইএইচসি’র গেটে প্রবেশ করার কিছুক্ষণ পরেই আধা-সামরিক বাহিনী এবং সাঁজোয়া যান আদালত প্রাঙ্গণে প্রবেশ করে। সাঁজোয়া যানটি দিয়ে গেট অবরুদ্ধ করা হয়েছিল।
ইমরান খানের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা:
ইমরান খানের গ্রেপ্তারি পরোয়ানার একটি অনুলিপি প্রকাশ করে সংবাদ মাধ্যম ‘ডন’। সেখানে দেখা যায়, এটি পহেলা মে জারি করা হয়েছিল। এতে বলা হয়েছে যে, ইমরান খানকে জাতীয় জবাবদিহি অধ্যাদেশ, ১৯৯৯ এর ধারা ৯(এ) এর অধীনে দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে।

গ্রেপ্তার নিয়ে দলের নেতারা যা বলছে:
ব্যারিস্টার গওহর খান, যিনি পিটিআই প্রধানের গ্রেপ্তারের সময় আইএইচসিতে উপস্থিত ছিলেন তিনি বলেন, ইমরানকে ‘নির্যাতন’ করা হয়েছে। তারা ইমরানের মাথায় ও পায়ে আঘাত করেছে। গ্রেপ্তারের সময় পিটিআই চেয়ারম্যানের হুইলচেয়ারটিও ফেলে দেওয়া হয়েছিল।

পিটিআই সহ-সভাপতি ফাওয়াদ চৌধুরী টুইটে জানান, আইএইচসি রেঞ্জার্স দ্বারা দখল করা হয়েছে এবং আইনজীবীরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। ইমরান খানের গাড়ি ঘেরাও করা হয়েছে।
পিটিআই মহাসচিব আসাদ উমর টুইট করেছেন, পিটিআই ভাইস চেয়ারম্যান শাহ মাহমুদ কুরেশির নেতৃত্বে একটি ছয় সদস্যের কমিটি পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করবে।
উমর বলেন, পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সারাবিশ্বকে দেখানো হচ্ছে দেশে আইন নেই।
পিটিআই নেতা হাম্মাদ আজহার বলেছেন, ইমরানের গ্রেপ্তার ‘গ্রহণযোগ্য নয়’ এবং জোর দিয়েছিলেন যে পিটিআই প্রধান ‘আমাদের রেড লাইন’। তিনি ইমরানের গ্রেপ্তারের বিরুদ্ধে রাজপথে নামার জন্য জাতির প্রতি আহ্বান জানান।
পিটিআইয়ের আজহার মাশওয়ানি অভিযোগ করেছেন, ইমরানকে রেঞ্জার্সরা আদালতের ভেতর থেকে ‘অপহরণ’ করেছে। তিনি বলেন, দলটি তাৎক্ষণিকভাবে দেশে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে।
পিটিআই নেতা মুসাররাত চিমা টুইটারে একটি ভিডিও বার্তায় বলেছেন, তারা এখন ইমরান খানকে নির্যাতন করছে।
বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভের খবর পাওয়া গেছে:
এদিকে দেশের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভের খবর পাওয়া গেছে। লাহোরের সিনেটর এজাজ চৌধুরীর নেতৃত্বে পিটিআই সমর্থকরা লিবার্টি চকে জড়ো হয়। কর্মীরা আকবর চক, পেকো রোড, মেইন ক্যানাল রোড এবং ফয়সাল টাউন এলাকা বন্ধ করে দিয়েছে।
বিক্ষোভকারীরা টায়ার জ্বালিয়ে জোট সরকারের বিরুদ্ধে স্লোগান দেয়। ইমরানের জামান পার্কের বাসার বাইরে পিটিআই সমর্থকরা সরকারি ব্যানারও ছিঁড়ে ফেলে।
করাচিতে, পিটিআই নেতারা শারা ফয়সালের উভয় লেন অবরুদ্ধ করে ফেলে। পেশোয়ারের হাতনগরীতেও বিক্ষোভের খবর পাওয়া গেছে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রীর আটক ও তাকে গ্রেফতার করতে লাহোরের জামান পার্কে তার বাসভবনে একটি পুলিশ অভিযানসহ বেশ কয়েকটি ব্যর্থ প্রচেষ্টা অনুসরণ করে, যা তিনি এড়াতে সক্ষম হয়েছিলেন।
আল-কাদির ট্রাস্ট মামলা:
আল কাদির ট্রাস্টের যৌথ মালিক ইমরান খান ও তার স্ত্রী বুশেরা বিবি। আল-কাদির বিশ্ববিদ্যালয় তৈরির জন্য জমি সংক্রান্ত বিষয়ে নানান দুর্নীতির অভিযোগে এই মামলা করা হয়েছিল। অভিযোগ রয়েছে ইমরান খান ও বুশেরা বিবিসহ পিটিআইয়ের অন্যান্য নেতাদের বিরুদ্ধে। ইমরান খান যখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, তখন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য এক বাণিজ্যিক গোষ্ঠীর সঙ্গে বোঝাপড়ার জন্য পাকিস্তান সরকারের ক্ষতি হয়েছিল কয়েক হাজার কোটি টাকা। যা পাকিস্তানের অর্থনীতিকে আরও ভেঙে দিয়েছিল। ইমরান খান এবং তার মন্ত্রিসভার বেশ কয়েকজন মন্ত্রী ওই টাকার অপব্যবহার করেছিলেন।
এছাড়াও আল কাদির বিশ্ববিদ্যালয় তৈরির জন্য সোহাওয়ার মৌজা বাকরালার ৫৭ দশমিক ২৫ একর জমির অপব্যবহার করেছিলেন একাধিক নেতা।







