“অঞ্জনের অনেক কিছু আমার পছন্দ না হতে পারে। একজন শিক্ষক, চলচ্চিত্র নির্মাতা শিল্পী হিসেবে তাকে সবসময়ই আমি মূল্যায়ণ করতে পেরেছি, অন্তত নিজের কাছে। এটা বলতে দ্বিধা নেই যে আমরা যারা চলচ্চিত্র বানাই, সবাই সবার প্রতিদ্বন্দ্বী। তারফলে যেটা দাঁড়ায়, এক ধরনের ঈর্ষা বোধ থেকে কারো অ্যাচিভমেন্টগুলোকে মূল্যায়ণ করি না। কিন্তু অঞ্জন এ ব্যাপারে ছিলেন স্পষ্টবাদী। তার যেটা ভালো লাগতো, সেটাকে তিনি গভীরভাবে ভালোবাসতেন; আর যেটা ভালো লাগতো না সেটাকেও উচ্চস্বরে বলতে পারার মতো সাহসী ছিলেন। তাই আমার কাছে যখন অঞ্জনের মৃত্যুর খবর এলো, তখন মনে হলো -অন্য অনেক কিছুর মতো মৃত্যুকেও যদি তুড়ি মেরে দূরে সরিয়ে দিতে পারতো অঞ্জন…!”
সদ্য প্রয়াত চলচ্চিত্র আন্দোলনকর্মী, শিক্ষক ও নির্মাতা জাহিদুর রহিম অঞ্জনের স্মরণ সভায় কথাগুলো বলছিলেন গুণী চলচ্চিত্র নির্মাতা, শিক্ষক মানজারেহাসীন মুরাদ। তিন দশকের বেশী সময় থেকে অঞ্জনকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন তিনি। স্বভাবতই অঞ্জনের সমস্ত বোধবুদ্ধির অলিগলি নিজ হাতের রেখার মতো চেনা!
কেমন ছিলো অঞ্জনের স্বভাব? এ বিষয়ে বলতে গিয়ে অগ্রজ এই নির্মাতা এসময় বলেন,“যতো জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতেন না কেন, অঞ্জন সব তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে পারতেন।” তাইতো অঞ্জনকে নিয়ে হওয়া স্মরণ সভার ভাবগাম্ভীর্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করলেন মানজারেহাসীন মুরাদ! বললেন, “এখানে সবাই এতো চুপচাপ! অথচ অঞ্জন খুবই সরব ছিলেন। পুরো পরিবেশটাকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিতে পারতেন। কখনোই মন খারাপ করে থাকতেন না।”
জাহিদুর রহিম অঞ্জনের স্মরণ সভায় এদিন তার পরিবার পরিজনের বাইরে এমন বহু গুণী কৃতি মানুষেরা উপস্থিত হন। তাদের কেউ হয়তো ছিলেন অঞ্জনের ঘনিষ্ট বন্ধু, সহকর্মী, ছাত্র কিংবা নিতান্তই পানশালার শুভাকাঙ্খী!
শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় চিত্রশালা মিলনায়তনে অঞ্জনকে নিয়ে এই স্মরণসভাটি আয়োজন করে বাংলাদেশ শর্ট ফিল্ম ফোরাম। পুরো অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনায় ছিলেন ফোরামের সাধারণ সম্পাদক রাকিবুল হাসান।
অঞ্জনের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় অনুষ্ঠান। এরপর স্মরণাঞ্জলি পড়ে শোনান শিল্প সমালোচক মইনুদ্দীন খালেদ। অঞ্জনকে নিয়ে তার দাম্পত্যসঙ্গী ও জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক শাহীন আখতারের একটি লেখা পাঠ করেন আবৃত্তিকার ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়।
পরে মঞ্চে আসেন নির্মাতা অঞ্জনের ছোট ভাই সাজ্জাদুর রহিম ও ছোট বোন সোনিয়া নিজাম। এসময় অঞ্জনের ছোটবেলার স্মৃতির কথা বলেন সাজ্জাদুর রহিম। তিনি বলেন,“নিয়মের বেড়াজালে ভাইয়াকে বাঁধা যায়নি, সেই ছোটবেলাতেও। সারাটা জীবন নতুনের সন্ধান করে গেছেন।”
পরে একে একে মঞ্চে এসে অঞ্জনের স্মৃতিচারণ করেন খ ম হারুন, চলচ্চিত্র নির্মাতা এন রাশেদ চৌধুরী, সলিমুল্লাহ খান, ঢালী আল মামুন, জুনায়েদ হালিম, তরুণ ঘোষ, নুরুল আলম আতিক, আকরাম খান, জয়ীতা মহলানবিশ, শহীদুজ্জামান সেলিম, জুয়েইরিযাহ মউ, গিয়াস উদ্দিন সেলিম, ড.জাকির হোসেন রাজু, বিধান রিবেরুসহ আরও অনেকে বক্তব্য দেন।
অঞ্জনের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘মেঘমল্লার’-এ কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেন শহীদুজ্জামান সেলিম। সিনেমাটির শুটিং সময়ের অভিজ্ঞতা এসময় স্মৃতি থেকে দর্শকদের শোনান তিনি। ‘মেঘমল্লার’-এর একটি দৃশ্যের জন্য দুদিন বসে থেকে ঠিক দৃশ্যটি ধারণ করার মতো নির্মাতা অঞ্জনের একরোখা রূপ যেমন দেখেছেন সেলিম, তেমনি ব্যক্তি মানুষ হিসেবে কতোটা শিশু প্রকৃতি ছিলেন অঞ্জন সে কথাও শোনান তিনি।
শহীদুজ্জামান সেলিম বলেন, “ওর যে শিশুসুলভ হাসি শিশুর মতো মন, তা আমি দেখেছি মেঘমল্লার এর শুটিং সেটে। এটা আমি সারা জীবন মনে রেখেছি। অঞ্জনের আরেকটা দিক, ও খুব সাহায্য করতো মানুষকে। যে কোনো বিষয়ে কেউ সহায়তা চাইলে সেটা খুবই সিরিয়াসলি নিয়ে করে দিতো। আমি যে শিশুসুলভ অঞ্জনকে দেখেছি, সেটা কোনোদিনই ভুলতে পারবো না। ও আমার মনে থেকে যাবে।”
অঞ্জনের ঘনিষ্ট বন্ধুদের একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা গিয়াস উদ্দিন সেলিম। এদিন স্মৃতিচারণ না করে শর্ট ফিল্ম ফোরামের উদ্দেশে তিনি বলেন, অঞ্জন দীর্ঘদিন ধরে চলচ্চিত্র আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলেন। ফোরামের সভাপতিও ছিলেন। ফোরাম যেহেতু প্রতি দুই বছর পর পর একটি উৎসব আয়োজন করে, সেখানে তার নামে কোনো পদক/পুরস্কার প্রবর্তন করা যায় কিনা, ভেবে দেখবেন।
পুনে ফিল্ম ইনস্টিটিউটে অধ্যয়ন করার সময় ডিপ্লোমা ফিল্ম (স্বল্পদৈর্ঘ্য) করেছিলেন অঞ্জন। যেখানে প্রথমবার অভিনয় করেছিলেন সেই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও বলিউড অভিনেতা ইরফান খান। শিক্ষক অঞ্জনের ছাত্র তরুণ চলচ্চিত্র নির্মাতা জুয়েইরিযাহ মউ দাবি করেন, অঞ্জনের সেইসব দিনে বানানো (স্টুডেন্ট ফিল্ম) চলচ্চিত্রগুলো এবং বিভিন্ন সভা সেমিনারে দেয়া বক্তব্যগুলো সংরক্ষণ করে যেন বর্তমান সময়ের চলচ্চিত্র শিক্ষার্থীদের দেখানোর উদ্যোগ নেয়া হয়।
চলচ্চিত্র আন্দোলনকর্মী, শিক্ষক কিংবা চলচ্চিত্র নির্মাতা পরিচয়ের বাইরেও তার যে সমকালীন সাহিত্য জগতের সাথেও যোগ ছিলো, সেটাও স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে বহুজনের কথায়। বিশেষ করে প্রতিষ্ঠানবিরোধী বাংলাদেশের আলোচিত লিটলম্যাগ ‘গাণ্ডীব’, ছোট কাগজের নামটিও দিয়েছিলেন অঞ্জন। শুধু তাই নয়, গল্পও লিখেছেন তিনি।
লেখক, অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান অঞ্জনকে নিয়ে বলেন, “অঞ্জনকে আমি চিনি ৪৫ বছর ধরে। ১৯৮০ সালে তার সাথে পরিচয় হয়েছিলো। তার ‘মেঘমল্লার’ দেখে আমি একটি লেখাও লিখেছিলাম। এই কয়েক মাস আগে ‘চাঁদের অমবস্যা’ নামে অঞ্জনের দ্বিতীয় ছবিটির একটি প্রাইভেট শো হয়েছিলো, সেটিও দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। তবে তার ছবির চাইতে আমি বেশী শিখেছি তার সাথে আলাপ আলোচনা করে। হাসতে হাসতে অঞ্জন নির্মমভাবে সমালোচনা করতে পারতেন। চলচ্চিত্র সংক্রান্ত অনেক কথাই আমি তার কাছ থেকে শিখেছি।”
সাহিত্যঅঙ্গনে অঞ্জনের আরেক বন্ধু কবি সাজ্জাদ শরিফ। তিনি বলেন, ‘আমরা বলি, যখন আমাদের বন্ধুরা চলে যায় তখন আমাদেরও কিছু মৃত্যু ঘটে। কারণ, আমাদের বন্ধুরা আমাদের অংশ। আবার এটাও সত্য, বন্ধুরা যখন চলে যায়, বন্ধুদের কিছু অংশ আমাদের মধ্যে থেকেও যায়। আমরা হয়তো কিছু পরিমাণে বহনও করে চলি।’
এসময় বাংলাদেশের ছোট কাগজের ইতিহাস ও আন্দোলনের সাথে অঞ্জন যে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন সে কথাও তুলে ধরেন সাজ্জাদ শরিফ, ‘সংবেদ’-এর পারভেজ হোসেনসহ অনেকে।
প্রচলিত গণমাধ্যমের বিপরীতে দাঁড়িয়ে ছোট কাগজ আন্দোলন, স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র আন্দোলন, নতুন ধারার চিত্রকলার আন্দোলনে বিশেষ ভূমিকা ছিলো অঞ্জনের। চলচ্চিত্র আন্দোলনের পাশাপাশি গেল শতকের মধ্য আশিতে ছোট কাগজ ‘গাণ্ডীব’-এর মাধ্যমে তৈরী হয় নতুন যুগ। সেই ‘গাণ্ডীব’ নামটিও দিয়েছিলেন জাহিদুর রহিম অঞ্জন। মঞ্চে এমনটাই বললেন সাজ্জাদ শরিফ। এসময় অঞ্জনের দাম্পত্য সঙ্গী এবং কথাসাহিত্যিক শাহীন আখতারেরও প্রশংসা করেন বক্তারা।

ইফতারের বিরতির পর দেখানো হয় অঞ্জনের উপর বানানো ১১ মিনিটের একটি ভিডিওচিত্র। যেখানে শাহীন আখতারের কথনে উঠে আসে অঞ্জনের অন্তিম মুহূর্তের কথা! অপারেশন থিয়েটারে যাওয়ার আগ মুহূর্তেও নিজের দেখা একটি প্রিয় সিনেমার কথা তিনি শোনাচ্ছিলেন দাম্পত্য সঙ্গীকে! আনুষ্ঠানিক বিদায় বলা হয়নি তাদের!
শাহীন আখতারের কথার সাথে সমানতালে স্থির ও চলমান চিত্রে পর্দায় দেখা যায় সিনেমার অঞ্জনকে! এমন প্রাণবন্ত অঞ্জনের চির অনুপস্থিতি মেনে নিয়েই হলভর্তি আমন্ত্রিত অতিথিরা দেখতে শুরু করেন ‘মেঘমল্লার’!








