প্রতি বছর পহেলা জানুয়ারি এলেই সারা বিশ্বে আতশবাজি, উৎসব আর আনন্দ-উল্লাসের মধ্য দিয়ে ইংরেজি নতুন বছরকে স্বাগত জানানো হয়। কিন্তু কেন জানুয়ারির প্রথম দিন থেকেই বছরের শুরু এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হয় প্রাচীন রোমান সভ্যতা, পৌরাণিক বিশ্বাস এবং ক্যালেন্ডার সংস্কারের দীর্ঘ ইতিহাসে।
আজ (১ জানুয়ারি) বৃহস্পতিবার প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বিবিসি জানিয়েছে, এক সময় বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বছরের শুরু ধরা হতো ভিন্ন ভিন্ন দিনে কখনও ২৫ মার্চ, কখনও ২৫ ডিসেম্বর। শেষ পর্যন্ত পহেলা জানুয়ারি কীভাবে বছরের প্রথম দিন হয়ে উঠল, তার পেছনে রয়েছে রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজার, দেবতা জানুস এবং পোপ গ্রেগরি ত্রয়োদশের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
জানুস: অতীত ও ভবিষ্যতের দেবতা
প্রাচীন রোমানদের কাছে জানুয়ারি ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি মাস। এই মাসটি উৎসর্গ করা হয়েছিল রোমান দেবতা জানুসের নামে। ল্যাটিন ভাষায় ‘ইয়ানুরিয়াস’ শব্দ থেকেই এসেছে জানুয়ারি নামটি। রোমান পুরাণে জানুসকে দেখা যায় দ্বিমুখী দেবতা হিসেবে। একটি মুখ অতীতের দিকে, অন্যটি ভবিষ্যতের দিকে তাকানো। তিনি পরিবর্তন, রূপান্তর, শুরু ও শেষের প্রতীক। ইতিহাসবিদদের মতে, বছরের এমন একটি সময়, যেখানে মানুষ পেছনের দিকে তাকিয়ে হিসাব-নিকাশ করে এবং সামনে এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, সেই সময়ের সঙ্গে জানুয়ারির গভীর প্রতীকী মিল রয়েছে।

ইংল্যান্ডের বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডায়ানা স্পেনসার বলেন, জানুয়ারিকে বছরের প্রথম মাস হিসেবে ধরা যুক্তিসংগত, কারণ এটি অতীত ও ভবিষ্যৎ উভয়ের সংযোগস্থল।
প্রকৃতি ও সময়ের মিল
জানুয়ারিকে বছরের শুরু করার পেছনে প্রকৃতির ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। ২২ ডিসেম্বরের দীর্ঘতম রাতের পর ধীরে ধীরে দিনের দৈর্ঘ্য বাড়তে থাকে। ইউরোপে জানুয়ারির শুরু মানেই শীতের অন্ধকার সময় পেরিয়ে আলো ফেরার ইঙ্গিত। প্রাচীন রোমানদের কাছে এটি ছিল নতুন আশা ও প্রতিফলনের সময়।

২৫ মার্চ থেকে পহেলা জানুয়ারি
মধ্যযুগে রোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর খ্রিস্টধর্মের প্রভাব বাড়ে। ক্যাথলিক চার্চ অনেক দেশে ২৫ মার্চকে নববর্ষের সূচনা হিসেবে মান্যতা দেয়। খ্রিস্টান বিশ্বাস অনুযায়ী, এদিন দেবদূত গ্যাব্রিয়েল ভার্জিন মেরির কাছে যিশুর জন্মের সংবাদ দিয়েছিলেন। ফলে এই দিনটিকে নতুন সূচনার প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হতো। তবে প্রথম শতকে রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজার দেবতা জানুসের সম্মানে জানুয়ারিকে বছরের প্রথম মাস হিসেবে চিহ্নিত করে ‘জুলিয়ান ক্যালেন্ডার’ চালু করেন।

গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের জন্ম
জুলিয়ান ক্যালেন্ডারে সময় গণনায় কিছু ত্রুটি ছিল। প্রতি বছরে প্রায় ১১ সেকেন্ড বেশি ধরা হওয়ায় শতাব্দী ধরে ঋতুর সঙ্গে ক্যালেন্ডারের গরমিল তৈরি হয়। এর ফলে ইস্টারের মতো গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসবের তারিখ নির্ধারণে সমস্যা দেখা দেয়। এই সমস্যা সমাধানে ১৫৮২ সালে পোপ গ্রেগরি ত্রয়োদশ ‘গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার’ প্রবর্তন করেন। নতুন এই ক্যালেন্ডারে সূর্যের চারপাশে পৃথিবীর প্রকৃত পরিভ্রমণের সময়ের সঙ্গে মিল রেখে লিপ ইয়ারের নিয়ম সংশোধন করা হয়। এর মাধ্যমে পহেলা জানুয়ারিকে আবারও আনুষ্ঠানিকভাবে বছরের প্রথম দিন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়।
ধীরে ধীরে বিশ্বব্যাপী গ্রহণ
ইটালি, স্পেন ও পর্তুগালের মতো ক্যাথলিক দেশগুলো দ্রুত গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার গ্রহণ করলেও প্রোটেস্ট্যান্ট ও অর্থোডক্স দেশগুলো এতে দেরি করে। ইংল্যান্ড ১৭৫২ সাল পর্যন্ত ২৫ মার্চকেই নববর্ষ হিসেবে মানত। পরে পার্লামেন্টের সিদ্ধান্তে তারা গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারে যুক্ত হয়। এরপর ধাপে ধাপে সুইডেন, জাপান, চীন, রাশিয়া এবং সবশেষে ১৯২৩ সালে গ্রিস এই ক্যালেন্ডার গ্রহণ করে।

বর্তমানে বিশ্বের বেশিরভাগ দেশ সরকারি ও আন্তর্জাতিক কাজে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার ব্যবহার করলেও অনেক দেশের নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী বর্ষপঞ্জি রয়েছে। বাংলাদেশে বাংলা নববর্ষ, মুসলিম দেশগুলোতে হিজরি নববর্ষ, চীনা চন্দ্র নববর্ষ কিংবা ইথিওপিয়ার এনকুটাটাশ, সবই নিজ নিজ সংস্কৃতির অংশ।
তবুও বৈশ্বিক যোগাযোগ, অর্থনীতি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থায় গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারই প্রধান হয়ে উঠেছে। আর সেই কারণেই প্রতিবছর পহেলা জানুয়ারি সারা বিশ্ব একসঙ্গে নতুন বছর উদযাপন করে। প্রাচীন দেবতা জানুসের দুই মুখের প্রতীকী ভাবনা থেকে শুরু হয়ে আধুনিক বৈশ্বিক সময় গণনার কেন্দ্রবিন্দু। জানুয়ারি আজ শুধু একটি মাস নয়, বরং অতীত থেকে ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে যাওয়ার এক সার্বজনিক প্রতীক।







