২০২৪ এর ৫ আগস্ট পতন হলো স্বৈরাচার শেখ হাসিনার। এরপর ঘটনার ধারাবাহিকতায় শেখ হাসিনা সরকারের অপরাধ ও দুর্নীতির মুখোশ উন্মোচন হতে থাকে এক এক করে। কিন্তু এদেশের জনগণের মনে এখনও একটি হৃদয়বিদারক ঘটনার ব্যাপারে রয়েছে নানা প্রশ্ন। সে ঘটনাটি হল ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি ঘটে যাওয়া বিডিআর বিদ্রোহ।
তবে এই ঘটনাকে ‘বিদ্রোহ’ না বলে প্ল্যান্ড মার্ডার বা পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বললে আরও বেশি যৌক্তিক মনে হবে সাধারণ জনগণের কাছে। এক এক করে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে বাংলাদেশের ইতিহাসের সেই কালো অধ্যায়ের নেপথ্যের ঘটনাগুলো। ঢাকায় তৎকালীন সীমান্তরক্ষী বাহিনী বাংলাদেশ রাইফেলসের (বিডিআর) সদর দপ্তর পিলখানায় বিদ্রোহী জওয়ানদের হামলায় নিহত হন ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ মোট ৭৪ জন।
‘বিডিআর বিদ্রোহ’ নিয়ে আমার দেশ পত্রিকা একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, বিডিআর সদর দপ্তর রাজধানীর পিলখানায় ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি সকালে অস্ত্রাগার খুলে দিয়ে বিডিআরের বিপথগামী সদস্যদের হাতে অস্ত্র ও গোলাবারুদ তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন তৎকালীন ৪৪ রাইফেলস ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল শামসুল আলম চৌধুরী। তিনি কর্নেল শামস নামে পরিচিত। এই সেনা কর্মকর্তা বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল।

২৫ ফেব্রুয়ারি বিডিআর দরবার শুরু হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যে ৪৪ ব্যাটালিয়নের সদস্য সিপাহি মঈন একটি অস্ত্র নিয়ে মঞ্চে উঠে বিডিআরের ডিরেক্টর জেনারেল (ডিজি) মেজর জেনারেল শাকিলের মাথায় তাক করেছিলেন। একজন অফিসার তাকে নিরস্ত্র করেন। সিপাহি মঈনের হাতে থাকা অস্ত্রটি দেখে বিডিআর ডিজি তখন কর্নেল শামসকে লক্ষ্য করে বলেছিলেন, ‘শামস, এই অস্ত্র তোমার ব্যাটালিয়নের।’ আমার দেশ অনুসন্ধানে এই তথ্য বেরিয়ে এসেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, নৃশংস বিডিআর হত্যাকাণ্ডের মাস্টারমাইন্ড ছিলেন স্বয়ং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর সরাসরি তত্ত্বাবধানে এই ম্যাসাকার সংঘটিত হয়। আর এই ষড়যন্ত্রমূলক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তাদের সঙ্গে জড়িত ছিলেন কর্নেল শামস। পরিকল্পনা বাস্তবায়নের বিষয়ে তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর ইশারায় কাজ করেছেন এবং তার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করেছেন।
এদিকে বিডিআর হত্যাকাণ্ড নিয়ে এবার মুখ খুলেছেন সে সময়ের সেনাপ্রধান জেনারেল মঈন উ আহমেদ। বিডিআর হত্যাকাণ্ড নিয়ে এই সাবেক সেনাপ্রধান ‘পিলখানায় পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড’ শিরোনামে একটি বই লিখেছেন। এছাড়াও নিজের ইউটিউব চ্যানেলে একটি ভিডিওর মাধ্যমে তিনি জনগণকে জানান সেই সময় কি কি ঘটেছিল তার সাথে এবং এই বিদ্রোহ দমনে তার কি ভূমিকা ছিল।

মইন ইউ আহমেদ বলেন, বিদ্রোহের শেষ দিকে তিনি শেখ হাসিনাকে বলেন ‘অনেকে নিহত হয়েছেন। তাই বিদ্রোহীদের কোনো দাবি মানা যাবে না। আপনি তাদের বলবেন, প্রথমত, অফিসার হত্যা এই মুহূর্তে বন্ধ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, যাদের আটক করা হয়েছে, তাঁদের সবাইকে এখনই মুক্তি দিতে হবে। তৃতীয়ত, অস্ত্রসহ বিদ্রোহীদের আত্মসমর্পণ করতে হবে এবং চতুর্থত, সাধারণ ক্ষমা দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।’
সেদিনের হত্যাযজ্ঞের সময় পিলখানার ভেতরে আটকা পড়েছিলেন অনেকে। তেমনই একজন হলেন নবম শ্রেণির ছাত্রী ফাবলিহা বুশরা। তার বাবা তৎকালীন বিডিআর হাসপাতালের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ লেফটেন্যান্ট কর্নেল লুৎফর রহমান খানও জওয়ানদের হাতে খুন হন। ওই হৃদয়বিদারক ঘটনা এখনো তাড়া করে বেড়ায় ফাবলিহা বুশরাকে। ২০০৯ সালে ১৪ বছর বয়সী বুশরা দেখতে পায় সৈনিকরা কেউ মুখে কাপড় বেঁধে, কেউ মাস্ক পরে ছিল। এতবেশি সৈনিক পিলখানায় এর আগে তারা কখনো দেখেনি। তখন পর্যন্ত ধারণাও করতে পারেননি আসলে কী ঘটছে, বা তাদের জন্য কী অপেক্ষা করছে।
বুশরা জানান, দুজন সৈনিক এসে আমাদেরকে ঘর থেকে বের করে নিয়ে যাচ্ছিল। এসময় এক সৈনিক এসে আমার মায়ের বুকে বন্দুক ধরে বলছিল ‘তুই শেষ, তুই শেষ। তোর জামাই কে? তোর জামাইতো শেষ।’ এসময় মা’র দুই হাতে আমি ও আমার ছোট ভাই ধরা। সবচেয়ে বীভৎস যেটা লাগছিল যে, ওনারা বেধড়কভাবে অফিসারের মিসেস যারা, ইভেন মা এবং সন্তানদের পেটাচ্ছিল। তখন আমার পেছনে একটা লাথি লাগে। আমার কানের পেছনে বন্দুকের বাঁট দিয়ে একটা আঘাত করে। একটা রুমে ৭০/৮০ জনকে গাদাগাদি করে রাখা হয়। এসময় বিডিআর জওয়ানরা উল্লাস করছিল। কে কয়জনকে মেরেছে সেটি জানান দিচ্ছিল।
এদিকে ২০০৯ সালে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ছিলেন সোহেল তাজ। বিডিআর বিদ্রোহের ষড়যন্ত্রের পেছনের একজন তাকে মনে করা হলেও তিনি বলেছেন ভিন্ন কথা। তিনি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রে বসে যখন ঘটনার খবর পান তখনই তিনি পুলিশের আইজি’র সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুনের সঙ্গে কথা বলেন। একপর্যায়ে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী তার পরামর্শ না শুনে তাকে ধমক দিয়ে বলেছিলেন, ‘তুমি আমেরিকায় বসে বসে বেশি বুইঝো না। আমি দেখতেছি।’ তখন সোহেল তাজের আর কিছু করার ছিল না।
এই গণহত্যার নেপথে শেখ হাসিনা ছিল কি না এই নিয়ে যখন নানা জল্পনা কল্পনা, তখন কফিনে শেষ পেরেক ঠোকার কাজটি করেছে প্রণব মুখার্জি। তার আত্মজীবনীমূলক বই, যেখানে তিনি ওয়ান-ইলেভেন এবং শেখ হাসিনার ক্ষমতায় আসা নিয়ে লিখেছেন। অতীতে দেখা গেছে, এ ধরনের দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রগুলো বাস্তবায়নের পথে সব সময় প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়ায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও বিডিআর। তারা নানা পদক্ষেপ নিয়ে ষড়যন্ত্র ভণ্ডুল করে দিয়েছে। এজন্য ভারতের পক্ষ থেকে পরিকল্পিতভাবেই সেনাবাহিনী ও বিডিআরকে দুর্বল বাহিনী করে রাখার জন্য ষড়যন্ত্র করা হয়।
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কর্নেল শামসকে এ ঘটনায় তদন্ত কমিটিতে আসা বিভিন্ন প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও জড়াতে দেননি। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে তদন্ত কমিটির রিপোর্ট থেকে আওয়ামী লীগ নেতাদের সংশ্লিষ্টতা এবং কর্নেল শামস সম্পর্কে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বাদ দেওয়া হয়। শেখ হাসিনা উপরন্তু কর্নেল শামসকে একের পর এক পদোন্নতি দিয়েছেন।
চৌকস সেনা অফিসারদের হত্যার জন্য বিডিআর-এ বদলি করে এনে এক জায়গায় তাদের জড়ো করা হয়। এরপর তাদের হত্যা করা হয়। পদোয়া এবং রৌমারীর যুদ্ধে বিএসএফ হত্যার পর থেকেই বিডিআর ধ্বংসে নিয়োজিত হয় ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’। রৌমারীর ঘটনার নেতৃত্ব দেন রংপুরের তৎকালীন সেক্টর কমান্ডার পরবর্তী সময়ে বিডিআর ডিজি মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদ।
এরই ফল ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি তাকেসহ ৫৭ সেনাকর্মকর্তা হত্যা। বিডিআর হত্যাকাণ্ডের আগে ডানপন্থি ও দেশপ্রেমিক চৌকস অফিসারদের বিডিআর-এ বদলি করে জড়ো করা হয়। এরপর পরিকল্পিত ওই ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে তাদের হত্যা করা হয়। বিডিআর হত্যাকাণ্ডে ৫৭ সেনা কর্মকর্তাকে হত্যা করা হয়, যারা ছিলেন সেনাবাহিনীর অত্যন্ত চৌকস অফিসার। এমন হত্যাকাণ্ড ইতিহাসে নজিরবিহীন।








