ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন দেশটির সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও প্রবীণ সংসদ সদস্য মাসুদ পেজেশকিয়ান। দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির পছন্দের প্রার্থী রক্ষণশীল সাঈদ জালিলিকে বড় ব্যবধানে হারিয়ে ইরানের নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন তিনি।
আজ (৬ জুলাই) শনিবার ইরানের নবম প্রেসিডেন্ট হিসেবে সংস্কারপন্থি মাসুদ পেজেশকিয়ানের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। গত ১৯ মে হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় ইরানের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসেইন আমির আব্দুল্লাহিয়ানসহ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তার মৃত্যু হওয়ার পর এই নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হয়।
এই নির্বাচনে ইরানের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান পেয়েছেন ১ কোটি ৬৩ লাখ ৮৪ হাজার ৪০৩ ভোট। অন্যদিকে তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী সাঈদ জালিলির প্রাপ্ত ভোট সংখ্যা ১ কোটি ৩৫ লাখ ৩৮ হাজার ১৭৯। ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এবছর চারজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। তবে কেউ এককভাবে শতকরা ৫০ ভাগের বেশি ভোট না পাওয়ায় নির্বাচন রান অফে গড়িয়েছে।
জন্ম ও শিক্ষা
১৯৫৪ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর ইরানের মাহাবাদে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা আজারবাইজানীয় এবং মা একজন কুর্দি। পেজেশকিয়ান আজারবাইজানি এবং কুর্দি উভয় ভাষাতেই সাবলীল। ১৯৭৩ সালে তিনি তার ডিপ্লোমা অর্জন করেন। এরপর কাজের দায়িত্ব পালনের জন্য তিনি মাহাবাদ ছেড়ে জাবোলে চলে যান। এই সময়েই তিনি ওষুধের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। একসময় তিনি তার নিজ প্রদেশে ফিরে আসেন এবং মেডিকেল স্কুলে ভর্তি হন।
যোদ্ধা এবং চিকিৎসক
১৯৮০ থেকে ১৯৮৮ সালে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় পেজেশকিয়ান ফ্রন্ট লাইন যোদ্ধা হিসেবে কাজ করতেন। যেখানে তিনি একই সাথে মেডিকেল টিম পাঠানো, একজন যোদ্ধা এবং ডাক্তার হিসাবে কাজ করতেন। পেজেশকিয়ান ১৯৮৫ সালে তিনি তার জেনারেল প্র্যাকটিশনার কোর্স শেষ করেন এবং মেডিকেল কলেজে ফিজিওলজি পড়া শুরু করেন।
যুদ্ধের পর তিনি তাবরিজ ইউনিভার্সিটি অফ মেডিকেল সায়েন্সে সাধারণ অস্ত্রোপচারে মেজর নিয়ে তার শিক্ষা চালিয়ে যান। ১৯৯৩ সালে পেজেশকিয়ান ইরান ইউনিভার্সিটি অফ মেডিক্যাল সায়েন্সেস থেকে কার্ডিয়াক সার্জারিতে একটি উপ-স্পেশালিটি পান। পরবর্তীতে তিনি একজন হার্ট সার্জারির বিশেষজ্ঞ হয়ে ওঠেন। তিনি ১৯৯৪ সালে তাবরিজ ইউনিভার্সিটি অফ মেডিক্যাল সায়েন্সেস এর প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন, এই পদে তিনি ৫ বছর কাজ করেন।
রাজনীতি
মাসুদ পেজেশকিয়ানের রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয় ১৯৯৭ সালে মোহাম্মদ খাতামির প্রশাসনে উপ-স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে যোগদানের মাধ্যমে। এর ৪ বছর পর তিনি ইরানের স্বাস্থ্যমন্ত্রী পদে নিযুক্ত হন। ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত ৫ বছর এই পদে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এরপর পেজেশকিয়ান ইরানের পার্লামেন্টে তাবরিজ, ওস্কু এবং আজারশাহর নির্বাচনী জেলার প্রতিনিধিত্ব করেন। ২০১৬ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ডেপুটি স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

প্রেসিডেন্ট প্রার্থী
পেজেশকিয়ান এর আগে ২০১৩ এবং ২০২১ সালেও ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন। ২০১৩ সালে তিনি হাসেমি রাফসানজানিকে সমর্থন দিয়ে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেন এবং ২০২১ সালে গার্ডিয়ান কাউন্সিল তার প্রার্থিতা বাতিল করে। গত মে মাসে হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় ইরানের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি নিহত হওয়ার পর আবারও দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নেন মাসুদ পেজেশকিয়ান।
ব্যক্তিগত জীবন
পেজেশকিয়ানের স্ত্রীও একজন চিকিৎসক, তিনি স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ছিলেন। ১৯৯৩ সালে একটি গাড়ি দুর্ঘটনায় স্ত্রী এবং এক সন্তানকে হারান পেজেশকিয়ানে। তিনি তার বাকী দুই ছেলে ও মেয়েকে একা বড় করেছেন এবং দ্বিতীয় বিয়ে করেননি।
পেজেশকিয়ান একজন কুরআন শিক্ষক এবং নাহজ আল-বালাঘার আবৃত্তিকার, যা ইরানের শিয়া মুসলমানদের একটি মূল পাঠ্য। তিনি ইরান-তুরস্ক ফ্রেন্ডশিপ সোসাইটিরও একজন সদস্য।
সংস্কারপন্থিদের আশার আলো
ইরানের ক্ষমতা বেশ কয়েক বছর ধরে কট্টরপন্থিদের হাতেই থেকেছে। এবছর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পেজেশকিয়ান ছাড়া বাকি তিনজন প্রার্থীই ছিলেন কট্টরপন্থি। তবে একমাত্র সংস্কারপন্থি প্রার্থী পেজেশকিয়ান জয়ী হওয়ায় আশার আলো দেখছেন সংস্কারপন্থিরা।








