এই খবরটি পডকাস্টে শুনুনঃ
এ প্লাস দিয়ে শিক্ষার মান মাপার এই প্রতিযোগিতা কতটা যৌক্তিক? মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে লটারি পদ্ধতিটি আমার কাছে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকর পদ্ধতি মনে হয়।
কারণ, লটারির মাধ্যমে বিভিন্ন আর্থসামাজিক ও শিক্ষাগত পটভূমির শিক্ষার্থীরা যখন একটি প্রতিষ্ঠানে আসে, তখনই একটি বিদ্যালয়ের প্রকৃত চিত্র অনেকটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ভালো শিক্ষার্থীকে পড়ানো কঠিন নয়। কঠিন হলো দুর্বল শিক্ষার্থীকে ভালো করে তোলা। কিন্তু আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় এই কঠিন কাজটির মূল্যায়ন কোথায়?
জেলা ও উপজেলা শহরের নামকরা সরকারি, এমপিওভুক্ত কিংবা স্বনামধন্য বেসরকারি বিদ্যালয়গুলোতে ভর্তির জন্য শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা থাকে। সেখানে তুলনামূলকভাবে ভালো ফলাফল করা, নিয়মিত পড়াশোনা করা এবং শিক্ষাবান্ধব পারিবারিক পরিবেশ থেকে আসা শিক্ষার্থীরাই বেশি সুযোগ পায়। অভিভাবকেরাও সচেতন। সন্তানের পড়াশোনার খোঁজ রাখেন। প্রয়োজনে অতিরিক্ত শিক্ষক বা কোচিংয়ের ব্যবস্থা করেন। বই-খাতা, শিক্ষা উপকরণ, যাতায়াত সবকিছুতেই যথেষ্ট বিনিয়োগ করতে পারেন। এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে বিবেচনা করা দরকার শিক্ষার পেছনে পরিবারের আর্থিক বিনিয়োগ।
জেলা ও উপজেলা শহরের অনেক শিক্ষার্থীর পেছনে পরিবার প্রতি মাসে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে, মফস্বলের একটি দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীর পেছনে হয়তো পুরো বছরেও সেই পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা সম্ভব হয় না। কথাটা একটু কঠিন হলেও বাস্তবতা হলো জেলা-উপজেলার অনেক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থীর এক মাসের শিক্ষা-সংক্রান্ত খরচ, মফস্বলের একটি দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীর পুরো এক বছরের খরচের কাছাকাছি।
কারও অতিরিক্ত শিক্ষক আছে, কারও কোচিং আছে, কারও ব্যক্তিগত পড়ার পরিবেশ আছে, কারও প্রতিদিনের যাতায়াত ও শিক্ষা উপকরণের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ আছে। অন্যদিকে মফস্বলের অনেক শিক্ষার্থীকে হয়তো একটি পুরোনো বই দিয়ে বছর পার করতে হয়। পরিবারের অর্থনৈতিক সংকটের কারণে অতিরিক্ত শিক্ষক রাখার সুযোগ নেই। অনেক সময় বিদ্যালয়ে আসার যাতায়াত খরচও পরিবারের জন্য একটি বড় বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
তাহলে প্রশ্ন হলো দুই ধরনের শিক্ষার্থীকে একই জায়গা থেকে শুরু করা ধরে নিয়ে শুধু পরীক্ষার ফলাফল দিয়ে কি দুই ধরনের প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান বিচার করা ন্যায়সংগত? প্রত্যন্ত মফস্বলের নন-এমপিও বিদ্যালয়গুলোর বাস্তবতা আরও কঠিন। শহরের নামকরা বিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ না পাওয়া শিক্ষার্থীদের অনেকেই শেষ ভরসা হিসেবে এসব প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়। তাদের অনেকের মৌলিক শিক্ষাগত ভিত্তি দুর্বল। অনেকে নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসে না। অনেকের পড়ার অভ্যাস নেই।
অনেকের অভিভাবক সন্তানের পড়াশোনার খবরই রাখেন না। কারও পরিবার আর্থিক সংকটে জর্জরিত। কারও পরিবারে শিক্ষার পরিবেশ নেই। এখানেই একজন শিক্ষকের প্রকৃত পরীক্ষা শুরু হয়। শিক্ষককে প্রথমে শুধু পাঠ্যবই পড়াতে হয় না। শিক্ষার্থীকে স্কুলমুখী করতে হয়। স্কুলমুখী শিক্ষার্থীকে নিয়মিত করতে হয়।
নিয়মিত শিক্ষার্থীকে পড়ার অভ্যাস করাতে হয়। তারপর তাকে বুঝতে, লিখতে, চিন্তা করতে এবং পরীক্ষার উপযোগী হতে শেখাতে হয়। এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে যখন কোনো শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে, তখন তার পেছনে শুধু পাঠ্যবই শেষ করার গল্প থাকে না; থাকে একজন শিক্ষকের বছরের পর বছর শ্রম, ধৈর্য, ত্যাগ ও নিবিড় পরিচর্যার গল্প। কিন্তু ফলাফল প্রকাশের দিন? তখন সব হিসাব যেন এক মুহূর্তে বদলে যায়। প্রশ্ন ওঠে “এ প্লাস কয়টা?” “রেজাল্ট এত খারাপ কেন?” “অমুক স্কুলে এত এ প্লাস, এখানে নেই কেন?” “শিক্ষকেরা সারা বছর কী করেছেন?” কিন্তু কেউ কি একবারও প্রশ্ন করেনা, এই শিক্ষার্থীরা কোথা থেকে এসেছিল? কেউ কি দেখেছেন তাদের ষষ্ঠ, সপ্তম কিংবা অষ্টম শ্রেণির ভিত্তি কতটা দুর্বল ছিল?
কেউ কি দেখেছেন তাদের কতজন নিয়মিত স্কুলে আসত? কেউ কি দেখেছেন তাদের অভিভাবকেরা সন্তানকে পড়ানোর জন্য বছরে কত টাকা ব্যয় করতে পেরেছেন? কেউ কি হিসাব করেছেন একজন শিক্ষককে একটি শিক্ষার্থীকে এসএসসি পর্যন্ত নিয়ে আসতে কতটা অতিরিক্ত শ্রম দিতে হয়েছে? না। আমরা শুধু ফলাফল দেখি। শিক্ষার্থী দেখি না, শুধু ফলাফল দেখি। শিক্ষকের পরিশ্রম দেখি না, শুধু এ প্লাস দেখি। শুরুর অবস্থান দেখি না, শুধু শেষের অবস্থান দেখি। আর্থিক বৈষম্য দেখি না, শুধু মার্কশিট দেখি। এভাবে কি সত্যিই শিক্ষার মান বিচার করা যায়? শহরের একটি নামকরা বিদ্যালয়ের শিক্ষক বছরের শুরুতেই হয়তো ভাবেন
“কীভাবে আরও বেশি এ প্লাস পাওয়া যায়?”। আর মফস্বলের একটি নন-এমপিও বিদ্যালয়ের শিক্ষককে হয়তো ভাবতে হয় “এই শিক্ষার্থীকে কীভাবে নিয়মিত স্কুলে আনা যায়?” “কীভাবে তাকে পড়তে শেখানো যায়?” “কীভাবে তার দুর্বল ভিত্তি পূরণ করা যায়?” এই দুই শিক্ষককে একই মাপকাঠিতে বিচার করা কতটা ন্যায়সংগত?
একজন শিক্ষার্থী যার পেছনে পরিবার মাসে কয়েক হাজার কিংবা তারও বেশি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় করতে পারে, আরেকজন শিক্ষার্থী যার পরিবার সারা বছর সেই পরিমাণ অর্থ ব্যয় করার সামর্থ্য রাখে না—তাদের কাছ থেকে একই ধরনের ফলাফল প্রত্যাশা করা বাস্তবতার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ? শিক্ষা শুধু বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে হয় না।
শিক্ষার্থীর পারিবারিক পরিবেশ, অর্থনৈতিক সামর্থ্য, অভিভাবকের সচেতনতা, অতিরিক্ত শিক্ষার সুযোগ, প্রযুক্তির ব্যবহার, বই পড়ার সুযোগ—সবকিছু মিলেই একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষাগত সক্ষমতা তৈরি হয়। তাই একটি বিদ্যালয়ের ফলাফল মূল্যায়নের সময় শুধু এ প্লাসের সংখ্যা নয়, শিক্ষার্থীদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পটভূমিও বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
কারণ ভালো শিক্ষার্থীকে আরও ভালো করা এক ধরনের দক্ষতা; আর দুর্বল, দরিদ্র ও পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থীকে শিক্ষার মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনা একজন শিক্ষকের আরও বড় দায়িত্ব। মফস্বলের নন-এমপিও প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা হয়তো সবসময় এ প্লাসের ঝলমলে সংখ্যা উপহার দিতে পারেন না। কিন্তু তারা প্রতিদিন এমন অনেক শিক্ষার্থীকে নিয়ে কাজ করেন, যাদের পেছনে পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য সীমিত, যাদের শিক্ষার সুযোগ সীমিত, যাদের অভিভাবকের সময় ও সচেতনতা সীমিত। তারপরও তারা চেষ্টা করেন। একজন শিক্ষার্থীকে ধরে রাখেন। পড়তে শেখান। স্বপ্ন দেখতে শেখান। এসএসসি পরীক্ষার হলে পৌঁছে দেন। এই সাফল্য কোনো মার্কশিটে আলাদা করে লেখা থাকে না। তাই ফলাফল প্রকাশের পর মফস্বলের একটি বিদ্যালয়কে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর আগে একবার প্রশ্ন করুন- “এই শিক্ষার্থীরা যে অবস্থান থেকে শুরু করেছিল, সেখান থেকে শিক্ষকরা তাদের কতটা এগিয়ে নিতে পেরেছেন?” হয়তো সেই উত্তরটি একটি এ প্লাসের চেয়েও অনেক বেশি মূল্যবান।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








