বাংলাদেশের উদ্বেগজনক সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও নাজুক করে তুলেছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মৃত্যুর উচ্চ পরিসংখ্যান। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় ‘স্ট্যান্ডার্ড হেলমেট অ্যাডভোকেসি ইভেন্ট’ আয়োজন করেছে বিশ্বব্যাংক, ব্র্যাক এবং বাংলাদেশ সরকারের যৌথ উদ্যোগ। এতে হেলমেট ব্যবহারের গুরত্ব দিতে গিয়ে বক্তারা বলেছেন, হেলমেট শুধু আমাদের আইন মানার জন্য নয়, বরং জীবন রক্ষার জন্য হওয়া উচিৎ।
এই উদ্যোগের লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) এর সনদপ্রাপ্ত মানসম্পন্ন হেলমেট ব্যবহারের প্রচার করা যেন হেলমেট শুধুমাত্র আইনগত বাধ্যবাধকতা হিসেবে নয় বরং জীবন রক্ষাকারী উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৪ সালে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় এক হাজার ৭০৬ জন প্রাণ হারিয়েছেন, যা মোট সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ৩১.১৩ শতাংশ। অন্যদিকে, বাংলাদেশ রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য আরও ভয়াবহ, তাদের হিসেবে এই মৃত্যুর সংখ্যা দুই হাজার ৬০৯, যা দুর্ঘটনায় মোট মৃত্যুর ৩৫.৭৬ শতাংশ। এ বছর এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার সড়ক দুর্ঘটনায় মোট মৃত্যুর ৪৩.৪২ শতাংশ। দুর্ঘটনা রোধে বিদ্যমান আইনগুলোর দুর্বল বাস্তবায়নের ফলে নিম্নমানের হেলমেট বাজারে ছড়িয়ে পড়েছে, যা লাখো চালকের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলেছে।
ঢাকা ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের ক্রিস্টাল বলরুমে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে উপদেষ্টা, সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, উন্নয়ন অংশীদার এবং বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণকারীরা মানসম্পন্ন হেলমেট ব্যবহারে জনসচেতনতা সৃষ্টি এবং এটি ব্যবহারে জনসাধারণকে উৎসাহিত করতে বিভিন্ন কৌশল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।
এতে প্রধান অতিথি ছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান। বিশেষ অতিথ ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ, বিএসটিআই-এর মহাপরিচালক এস এম ফেরদৌস আলম, বিআরটিএ-এর চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইয়াসিন এবং বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন কান্ট্রি ডিরেক্টর গেইল মার্টিন।
দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্র্যাকটিস ম্যানেজার, ট্রান্সপোর্ট, ফেই ডেং অনলাইনে স্বাগত বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেন, মোটরসাইকেল চালকরা সড়কে ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে অন্যতম। মানসম্পন্ন হেলমেট ব্যবহারের মাধ্যমে এই ঝুঁকি কমানো সম্ভব। মানসম্পন্ন হেলমেটের ব্যবহার দুর্ঘটনায় গুরুতর মাথার আঘাতের আশঙ্কা ৬৯ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে সক্ষম।
প্রধান অতিথি মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তায় গুরুত্ব আরোপ করে বলেন, এ বিষয়ে প্রথমেই যে বিষয়গুলোতে গুরুত্ব দিতে হবে, তার মধ্যে রয়েছে মোটরসাইকেল চালকদের প্রশিক্ষণ, দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকা চিহ্নিতকরণ ও চিহ্ন স্থাপন, পথচারীদের নিরাপত্তা জোরদার, গতি পর্যবেক্ষণ এবং চালকদের মধ্যে কেউ মাদকসেবী কি না তা চিহ্নিত করতে ডোপ টেস্টিং বাস্তবায়ন।

তিনি বলেন, দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকায় জরুরি চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা এবং অ্যাম্বুলেন্স থাকা প্রয়োজন। তিনি দুর্ঘটনা রোধে সকলকে সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান।
অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ আইন বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জসমূহ তুলে ধরে বলেন, সহনশীল দামে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত স্ট্যান্ডার্ড হেলমেটের সহজলভ্যতা বাড়াতে হবে। একইসঙ্গে আমদানি করা হেলমেটের জন্য প্রয়োজনীয় মানদণ্ড নিশ্চিত করা জরুরি। সার্টিফিকেশন প্রক্রিয়াকে সহজ করতে হবে, যেন চালকরা সহজেই মানসম্পন্ন এবং আন্তর্জাতিকভাবে সনদপ্রাপ্ত হেলমেট চিনতে পারেন।
বিএসটিআই মহাপরিচালক এস এম ফেরদৌস আলম বলেন, একটি হেলমেট একাধিক উপাদান দিয়ে তৈরি হয়, যেখানে প্রতিটি উপাদান সুরক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিএসটিআই উন্নতমানের প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রতিটি হেলমেটের আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার মানদণ্ড নিশ্চিত করে।
বিআরটিএ চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইয়াসিন বলেন, সড়ক নিরাপত্তা একটি সমন্বিত দায়িত্ব এবং উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর জন্য বিশেষ কৌশল নির্ধারণ করা প্রয়োজন, যেমন পূর্বাচলমুখী ৩০০ ফিট সড়ক। তরুণ মোটরসাইকেল চালকদের মধ্যে মানসম্পন্ন হেলমেট ব্যবহারের প্রচলন বাড়ানোর জন্য সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বিশ্বব্যাংকের অন্তর্বর্তীকালীন কান্ট্রি ডিরেক্টর গেইল মার্টিন বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের সড়ক নিরাপত্তা উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, মানসম্পন্ন হেলমেট ব্যবহার বাড়াতে এর সরবরাহ এবং দাম সম্পর্কিত যে চ্যালেঞ্জগুলো রয়েছে তার সমাধান করতে হবে। তিনি বলেন, সকলের সমন্বয়ে হেলমেট নির্মাতাদের সম্পৃক্ত করে এমন কৌশল নির্ধারণ করতে হবে, যা হেলমেটের মান এবং সাশ্রয়ী মূল্য নিশ্চিত করবে।
ব্র্যাকের সড়ক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিচালক আহমেদ নাজমুল হুসেইন তার বক্তব্যে মানসম্পন্ন হেলমেট ব্যবহারের বর্তমান জনসচেতনতা ও আইন প্রয়োগের অবস্থা তুলে ধরেন। তিনি সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সকল অংশীজনদের বিএসটিআই এর সনদপ্রাপ্ত হেলমেটের ব্যবহার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান এবং কর্তব্যরত ট্রাফিক পুলিশকে বিএসটিআই অনুমোদিত হেলমেট চেনার জন্য প্রশিক্ষণ, এ সংক্রান্ত আইন সম্পর্কে জানা ও আইনভঙ্গকারীদের কাছ থেকে জরিমানা আদায়ের ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করেন।
বিশ্বব্যাংকের গ্লোবাল রোড সেফটি ফ্যাসিলিটির পরিবহন বিশেষজ্ঞ আরিফ উদ্দিন অনলাইনে বিশ্বব্যাপী কার্যকর কৌশল উপস্থাপন করেন, যা সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তিনি বলেন, মানসম্পন্ন হেলমেটের ব্যবহার বাস্তবায়ন ও সচেতনতা এবং এর সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দেশের হেলমেট আমদানিকারকদের পক্ষে বক্তব্য রাখেন ভলকান লাইফস্টাইল লিমিটেডের চেয়ারম্যান এস এম সাফাত ইশতিয়াক। তিনি এইচএসসি এর পাঠ্যক্রমে হেলমেট ও সড়ক নিরাপত্তার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানান। শিশুদের জন্য বাধ্যতামূলক হেলমেট ব্যবহারের ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, চালক এবং যাত্রীদের যে সুরক্ষা প্রয়োজন, শিশুদের জন্যও সেটি জরুরি।
সমাপনী বক্তব্যে বিশ্বব্যাংকের প্রোগ্রাম অফিসার দিলশাদ দোসানী সড়ক নিরাপত্তাকে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও উন্নয়নমূলক অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি সড়ক নিরাপাত্তা নিশ্চিত করতে ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা ঠিক করার জন্য পরামর্শ তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল কার্যকর আইন প্রয়োগের জন্য একটি কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানো। অনুষ্ঠানে জাতিসংঘের ‘স্ট্যান্ডার্ড হেলমেট’ প্রদর্শন করা হয় এবং পুলিশ, উবার, পাঠাও ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইনফ্লুয়েন্সারদের মাঝে তা বিতরণ করা হয়।








