এই খবরটি পডকাস্টে শুনুনঃ
চলতি বছর ডেঙ্গুতে ২০ থেকে ৩০ বছর বয়সীদের মৃত্যুহার এবার সবচেয়ে বেশি। ডেঙ্গুতে মৃত্যুর মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি হয়েছে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে। ডেঙ্গুতে এ বছর মোট ১৮৮ জনের মৃত্যু হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তরুণরা অনেক সময় জ্বরকে গুরুত্ব দেন না, ফলে দেরিতে চিকিৎসা নিতে আসেন। শরীরে পানিশূন্যতা ও প্লেটলেট কমে গেলে এবং রক্তচাপ কমে গেলে পরিস্থিতি জটিল হয়ে যায়। সময়মতো চিকিৎসা না পেলে প্রাণ বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়ে।
গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে কারও মৃত্যু না হলেও নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন আরও ৫১৪ জন রোগী। তাতে এ বছর হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ৪৫ হাজার ২০৬ জনে। গত ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি নতুন রোগীদের মধ্যে ১৭৫ জনই ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকার।
এ ছাড়া ঢাকা বিভাগে ১১১ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ১৫ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ৯০ জন, রাজশাহী বিভাগে আট জন এবং বরিশাল বিভাগে ১১৫ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন।
ডেঙ্গু নিয়ে বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন ২০৪৭ জন রোগী। তাদের মধ্যে ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে ৭৪৭ জন, ঢাকার বাইরের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি ১৩০০ জন। ডেঙ্গুতে এ বছর মোট ১৮৮ জনের মৃত্যু হয়েছে।
ডেঙ্গুতে মৃত্যুর বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নথি বিশ্লেষণে দেখা গেছে ডেঙ্গুতে ১০৭টি মৃত্যুর কারণ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০ থেকে ৩০ বছর বয়সী ২০ জন মারা গেছেন। এ ছাড়া ১০ বছরের কম বয়সী ১৬ জন, ১০ থেকে ২০ বছরের মধ্যে ১০ জন, ৩০ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে ১৫ জন, ৪০ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে ১৬ জন, ৫০ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে ১৫ জন, ৬০ থেকে ৭০ বছরের মধ্যে ১৩ জন, ৭০ থেকে ৮০ বছরের মধ্যে একজন এবং ৮০ থেকে ৯০ বছরের মধ্যে দুইজনের মৃত্যু হয়েছে এ বছর।
বেশির ভাগ মৃত্যু শক সিনড্রোমে
চলতি বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ১১৩ জনের মৃত্যুর কারণ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে রোগী মৃত্যুর আগে শক, অঙ্গ বিকল বা জটিল উপসর্গে ভুগছিলেন। ৫৬ জন শক সিনড্রোমে মারা গেছেন। মৃত্যুর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ কারণ এক্সপান্ডেড ডেঙ্গু সিনড্রোম। এতে মারা যান ৩৬ জন। উভয় সমস্যা ছিল ৯ জনের। ডেঙ্গু হেমোরেজিক সিনড্রোমে একজন। এ ছাড়া ডেঙ্গুর সঙ্গে কার্ডিয়াক শকে মারা যান ছয়জন এবং বহু অঙ্গ বিকলে পাঁচজন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. আহমদ পারভেজ জাবীন চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, ডেঙ্গু এখন অনেকটাই পরিবর্তন হয়েছে। এখনকার সময়ে ব্যক্তি আক্রান্ত হলে শরীরের একাধিক অত্যাবশ্যক অঙ্গ যেমন – হৃদপিণ্ড, ফুসফুস, কিডনি বা যকৃৎ কার্যকরভাবে কাজ করা বন্ধ করে দেয়। এদের সময়মতো প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না পাওয়ায় ‘শক সিনড্রোম’ তৈরি হয়। যারা মারা যাচ্ছে তাদের মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম।
মৃত্যুর ৬০ শতাংশ ঢাকায়
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ডেঙ্গুতে সবচেয়ে বেশি ১০৮ জনের মৃত্যু হয়েছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকায়, যা মোট মৃত্যুর ৫৯.৬৬ শতাংশ। বরিশাল বিভাগে ২৮ জন, চট্টগ্রামে বিভাগে ২৩, রাজশাহী বিভাগে ১০, ময়মনসিংহ বিভাগে ৬, খুলনা বিভাগে ৫, ঢাকা বিভাগে (দুই সিটি করপোরেশন এলাকার বাইরে) ২ জন মারা গেছেন। রংপুর, সিলেট বিভাগে কোনো মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়নি।
ত্রিশের নীচে আক্রান্ত ও মৃত্যু বেশি
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, গত জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত সারাদেশে ডেঙ্গুতে প্রাণ হারানো ১৮৮ জনের মধ্যে ৯৪ জনেরই বয়স ৩০ বছরের নিচে। আজ শনিবার পর্যন্ত ২১ থেকে ২৫ বয়সীরা সর্বমোট ৬০১৪ জন আক্রান্ত হয়েছেন। এদের মধ্যে ৩৭৭৬ জন পুরুষ ও ২২৩৮ জন নারী। মৃত্যুর দিক দিয়েও ২১ থেকে ২৫ বয়সীরা এগিয়ে। মোট ২৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে ১৫ জন তরুণ ও ১১ জন তরুণী। এছাড়া ২৬ থেকে ৩০ বয়সীদের মধ্যে ১৮ জন মারা গেছেন। তাদের মধ্যে ১১ জন তরুণ ও ৭ জন তরুণী।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, জীবন-জীবিকায় জড়িত থাকার কারণে এই বয়সীরা সবসময়ই ডেঙ্গু আক্রান্তের বাড়তি ঝুঁকিতে থাকেন।
সেপ্টেম্বরেই সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত ও মৃত্যু
গত বছরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জুনে মারা যান ৮ জন, জুলাইয়ে ১৪ জন, আগস্টে ৩০ জন এবং সেপ্টেম্বরে মারা যান ৮৭ জন। সে বছরের জুনে রোগী ভর্তি হয়েছিলেন ৭৯৮ জন, জুলাইয়ে ২,৬৬৯, আগস্টে ৬,৫২১ এবং সেপ্টেম্বরে ১,৮৯৭ জন। এ বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে সবচেয়ে বেশি ৬৬ জনের মৃত্যুও হয়েছে সেপ্টেম্বর মাসে। এর আগে জুলাই মাসে ৪১ জনের মৃত্যু হয়েছিল। এ ছাড়া জানুয়ারিতে ১০ জন, ফেব্রুয়ারিতে তিন জন, এপ্রিলে সাত জন, মে মাসে তিন জন, জুন মাসে ১৯ জন, অগাস্ট মাসে ৩৯ জন মারা যান। মার্চ মাসে কোনো রোগীর মৃত্যু হয়নি। সেপ্টেম্বর মাসে ভর্তি রোগীর সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১৩ হাজার ৭৩০ জন। এর আগে জুলাই মাসে ১০ হাজার ৬৮৪ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন।
জানুয়ারিতে ১১৬১ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৩৭৪ জন, মার্চে ৩৩৬ জন, এপ্রিলে ৭০১ জন, মে মাসে ১৭৭৩ জন, এ ছাড়া জুন মাসে ৫৯৫১ জন, অগাস্টে ১০ হাজার ৪৯৬ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১০ হাজার ৩৫৫ জন রোগী।
এ পরিসংখ্যান দেখে বলা যায়, সেপ্টেম্বরেই সবচেয়ে বেশি রোগী আক্রান্ত হয়েছে এবং মৃত্যুও ঘটেছে বেশি।
করণীয় কী?
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবু জাফর বলেন, ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার পরপরই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া দরকার। প্রয়োজনে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি হলে কমতে পারে মৃত্যুর হার।
আইইডিসিআর-এর উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, জ্বর ও ডেঙ্গু উপসর্গ থাকলে জরুরী ভিত্তিতে সরকারী ব্যবস্থাপনায় নিকটস্থ হাসপাতালে পরীক্ষা করাতে হবে। রোগীকে পূর্ণাঙ্গ বিশ্রামে থাকতে হবে। প্রয়োজনে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা নিতে হবে। সর্বপরি আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থা বিকেন্দ্রীয়করণ করতে হবে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. আহমদ পারভেজ জাবীন বলেন, তরুণরা জ্বর হলে প্রাথমিক উপসর্গকে গুরুত্ব না দিয়ে কাজ কিংবা পড়াশোনা চালিয়ে যান। তরুণদের স্বাস্থ্য সচেতনার দিকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন—পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, প্রথম থেকেই সঠিক চিকিৎসা এবং সর্বোপরি সচেতনতা ছাড়া এ সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়।








