আমীরুলকে জিগ্যেশ করলাম, আমার কোনো বই সিরাজী ভাইকে উৎসর্গ করা হয়েছে কি? আমীরুল বলল, হাঁ। আমি সম্প্রতি লেখা একটা বই হাবীবুল্লাহ সিরাজীকে উৎসর্গ করেছি। বইটা নিজ হাতে সিরাজী ভাইকে দেব-এমনই আশা ছিল। কিন্তু করোনা আমাদের স্বাভাবিক জীবনকে এলোমেলো করে দিলো। আমিও নানা অসুখে আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘদিন গৃহবন্দি। আমি ঘর থেকে বের হলে আমার মা রাবেয়া খাতুন খুব দুশ্চিন্তায় পড়ে যান। তাই বাংলা একাডেমি যাব যাব করেও আমার যাওয়া হয়ে ওঠেনি। নিপাট ভদ্রলোক হাবীবুল্লাহ সিরাজীকে উৎসর্গ করা বইটা নিজ হাতে দেয়া হয়নি।
হাবীবুল্লাহ সিরাজী একজন খ্যাতিমান কবি। ষাটের দশকের উজ্জ্বল কবিদের একজন। জাতীয় কবিতা পরিষদে দীর্ঘদিন সভাপতি থেকেছেন। তিনি সাংগঠনিক দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন তখন।
পেশায় তিনি মূলত প্রকৌশলী। বেক্সিমকোর মতো বড় প্রতিষ্ঠানে উচ্চপদে কাজ করেছেন দীর্ঘদিন। তারপর তার কর্মদক্ষতার কারণে তাকে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক পদে নিয়োগ দেয়া হয়।
সিরাজী ভাইকে আমি যখনই দেখতাম অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকতাম। কবিসুলভ কোনো আচরণ তার মধ্যে পাইনি। অসম্ভব কাজের লোক তিনি। জীবনযাপনে খুব পরিচ্ছন্ন। খুব গুছিয়ে কাজ করেন। কাজে খুব দক্ষ। ধীরে ধীরে যখন তার সাথে আলাপ জমে উঠল তখন টের পেলাম অসম্ভব মেধাবী ও বুদ্ধিদীপ্ত মানুষ তিনি। সাহিত্য সম্পর্কে সুগভীর জ্ঞান তার। সহজেই বোঝা যায় তিনি প-িত ব্যক্তি। সাহিত্য তার রক্তের মধ্যে। গভীরভাবে সাহিত্য তিনি পড়েছেন।
চ্যানেল আই ছিল সিরাজী ভাইয়ের আপন কর্মস্থলের মতো। যখন তাকে ডেকেছি তিনি সাড়া দিয়েছেন। জরুরি কাজকর্ম রেখেও ছুটে এসেছেন। আমাদের সঙ্গে অনেক অনুষ্ঠান করেছেন। পাঠক সমাবেশ শিরোনামে বই নিয়ে প্রতিদিনের অনুষ্ঠান তিনি করেছেন প্রায় পাঁচ বছর ধরে। মাত্র ৫ মিনিটে একটি বই নিয়ে আলোচনা। অসম্ভব মার্জিত ও সংযত উপস্থাপনা। অনেকবার তৃতীয়মাত্রায় এসেছেন। গঠনমূলক বক্তব্য রেখেছেন। আমি নিজেও দু চারবার উপস্থাপক ছিলাম। সিরাজী ভাই যখন কথা বলা শুরু করেন তখন আমি চুপচাপ তার কথা শুনতে থাকি।
হাবীবুল্লাহ সিরাজী চ্যানেল আই আয়োজিত অনেক পুরস্কার কমিটির প্রধান বিচারক থাকতেন। তার মতামত চূড়ান্ত বলে গণ্য হতো।
২০১৯ সালে আমেরিকা গিয়েছি মুক্তধারার অতিথি হয়ে। মুক্তধারা বইমেলা। প্রধান অতিথি হিসাবে গিয়েছেন হাবীবুল্লাহ সিরাজী। জ্যাকসন হাইটে একটা ছোটখাটো হোটেল। হাঁটাপথে বইমেলায় আসা যায়। সিরাজী ভাই উঠেছেন আমাদের পাশের রুমে। খুব সহজ ও আন্তরিক তার ব্যবহার। তখন কাছ থেকে দেখেছি, অতি দায়িত্বশীল ব্যক্তি। সারাক্ষণ আমাদের খোঁজ নিয়ে মেলা প্রাঙ্গণে উপস্থিত হয়েছেন। তিনি যে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক এবং নিউইয়র্ক বইমেলার প্রধান অতিথি তা তাঁর আচরণে এতটুকু বোঝার উপায় নাই। তিনি শিশুদের মতো। সহজভাবে ছুটে বেড়াচ্ছেন। কাজ করছেন।
হাবীবুল্লাহ সিরাজীর মেয়ে থাকে কানাডায়। চিকিৎসক কন্যা। ছুটে এল সে কানাডা থেকে বাবার কাছে। বাবা আর মেয়ে নিরিবিলি ঘুরে বেড়ালেন। একসঙ্গে নাশতা খেতেন। পিতা-কন্যার কী অসাধারণ বোঝাপড়া। দৃশ্য দেখেও ভালো লাগত।
দায়িত্বশীল ব্যক্তি সকলখানেই দায়িত্ব নিয়ে কাজ করেন। হাবীবুল্লাহ সিরাজীর মধ্যে তার ব্যতিক্রম দেখিনি। তিনি আমার অসম্ভব ভালোবাসার মানুষ। অসুস্থ হয়ে তিনি হাসপাতালের বেডে শুয়ে থাকবেন, আমার কাছে অকল্পনীয় দৃশ্য। মনে মনে প্রার্থনা করতাম সিরাজী ভাই-সুস্থ হয়ে উঠুন। আমি উৎসর্গ করা বইটা নিয়ে আপনার কাছে ঠিকই হাজির হয়ে যাব। বিশ্বাস দানা বাঁধতো আবার কর্মের মধ্যে ফিরে আসবেন তিনি। সিরাজী ভাই চ্যানেল আইতে আসবেন এবং আড্ডায় মাতিয়ে তুলবেন আমাদের।
কিন্তু হায়! আপনার আর ফেরা হলো না। ওপারের টানে আপনি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন।








