দেশে সম্প্রতি নতুন করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটছে। এবারের রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ এমন এক সময় ঘটছে, যখন দেশে গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তবর্তী সরকার দেশ পরিচালনা করছে। তবে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন বলেছেন, ‘বাংলাদেশ নতুন করে আসা কোনও রোহিঙ্গা গ্রহণ করবে না।’
শনিবার (২১ সেপ্টেম্বর) বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মিয়ানমারে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে বাংলাদেশের উপর বিশ্ব সম্প্রদায়ের চাপ থাকলেও শেখ হাসিনা সরকার সেটা অগ্রাহ্য করেছে। কিন্তু নতুন সরকার সেটা কতটা পারবে তা নিয়ে প্রশ্ন আছে।
তবে গত সোমবার পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন এক সাক্ষাতকারে সাফ জানিয়ে দেন, বাংলাদেশ নতুন করে আসা কোনও রোহিঙ্গা গ্রহণ করবে না।
তিনি বলেন, গত সাত/ আট বছর ধরে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কী করেছে? এটার সমাধান তো ঐপারে (মিয়ানমারে)। তারা শুধু আমাদের উপর চাপ সৃষ্টি করে গেছে, মিয়ানমারের উপর তেমন কোনও চাপ সৃষ্টি হয়নি। এটা এভাবে চলতে পারে না। আমাদের পক্ষে আর কাউকে নেয়া সম্ভব না। এমনকি যারা এসেছে, আমরা তাদেরকে নিবন্ধন করাবো না।
তিনি বলেন, নতুন রোহিঙ্গাদের নিবন্ধন করলে, সেটা আরও রোহিঙ্গার অনুপ্রবেশে উৎসাহিত করবে। আমরা জানি, রোহিঙ্গারা সমস্যার কারণে এসেছে। কিন্তু এই সমস্যা শুধু আমাদের দেশের জন্য নয়, এটা গোটা পৃথিবীর জন্য সমস্যা। পৃথিবীকেই এর দায়িত্ব নিতে হবে। যারা ঢুকে গেছে, আমরা তাদের ফেরত পাঠানোর চেষ্টা করবো। কিন্তু আমরা তাদের আনুষ্ঠানিক কোনও রেজিস্ট্রেশনের সুযোগ দেবো না এটাই আমাদের সিদ্ধান্ত।
কিন্তু রোহিঙ্গারা বিজিবি এবং কোস্টগার্ডের চোখ ফাঁকি দিয়ে কীভাবে ঢুকছে এমন প্রশ্নে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা ‘কিছু দুর্বলতা’ থাকার কথা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, একটা বিরাট এলাকা দিয়ে সমুদ্র বা নদীপথে তারা ঢুকছে। অনুপ্রবেশের সংখ্যা এলার্মিং না। কিন্তু আমরা তাদের ঠেকানোর চেষ্টা করছি। এখানে কিছু দুর্বলতা তো অবশ্যই আছে। কারণ নদী এবং সাগর মিলিয়ে এলাকাটা তো বিশাল। আমরা তো আমাদের পুরো বর্ডার গার্ডকে সেখানে মোতায়েন করতে পারবো না। আমাদের তো অন্যদিকেও সীমান্ত আছে।
একদিকে বাংলাদেশ নতুন করে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে ইচ্ছুক নয়। অন্যদিকে নানামুখী চেষ্টার পরও রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর কোনও উদ্যোগ সফল হয়নি। এরমধ্যে মিয়ানমারে সংঘাতের সমাধানও দেখা যাচ্ছে না। ফলে এটা স্পষ্ট যে, বাংলাদেশ না চাইলেও দেশটিতে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের চেষ্টা থেমে থাকছে না।
সরকারি স্বীকৃতি নেই, তাহলে কোথায় থাকছেন রোহিঙ্গারা?
সম্প্রতি অন্তবর্তীকালীন সরকারের পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন সংবাদ মাধ্যমকে জানান, গত দেড় মাসে নতুন করে যেসব রোহিঙ্গা ঢুকেছে, সরকারি হিসেবে তাদের সংখ্যা আট হাজারেরও বেশি।
কিন্তু স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, বাস্তবে এ সংখ্যা সরকারি হিসেবের চেয়ে দ্বিগুণ। নতুন আসা রোহিঙ্গাদের সরকার আশ্রয় না দেয়ায় তারা গোপনে বিভিন্ন আত্মীয় স্বজন এবং পূর্বপরিচিতদের ঘরে আশ্রয় নিয়েছেন। এতে করে আগে থেকেই গাদাগাদি অবস্থায় থাকা পরিবারগুলো নতুন করে চাপে পড়েছে।

রুহুল আমিন নামে একজন জানাচ্ছেন, তার পাঁচ সদস্যের পরিবারে নতুন করে আসা আত্মীয় অবস্থান করছেন চারজন। কিন্তু এখন পুরো ৯জনের খাবার চলছে, পাঁচজনের জন্য যে বরাদ্দ আসে সেখান থেকে। এভাবে কতদিন চলবে তা নিয়ে সন্দিহান রুহুল আমিন।
তার দাবি, নতুন আসা রোহিঙ্গাদের যেন বাংলাদেশ সরকার স্বীকৃতি দেয়। তাহলে তারা নতুন ঘর এবং খাবারসহ অন্যান্য বারদ্দ পাবে।
সীমান্ত পেরিয়ে কীভাবে অনুপ্রবেশ ঘটছে?
নতুন রোহিঙ্গারা জানাচ্ছেন, সীমান্তের ওপারে মিয়ানমার অংশে এখনও অনেক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ঢোকার অপেক্ষায় আছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ এড়াতে তারা রাতের বেলায় নৌকায় করে নাফ নদী পেরিয়ে ঢোকার চেষ্টা করে।
জেসমিন জানাচ্ছেন, তার ভাষায়, গুরুতর আহত হওয়ায় ‘মিয়ানমারের সেনা সদস্যরাই তাকে পরিবারসহ একটি ছোট নৌকায় উঠিয়ে দেয়’। ভোর ৪টার দিকে তাদের নৌকা নদী পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এজন্য নৌকার মাঝিকে দিতে হয়েছে চল্লিশ হাজার টাকা।
জেসমিনের মতোই সপ্তাহ দুয়েক আগে বাংলাদেশে ঢুকেছেন আছিয়া। ২০১৭ সালে তার বাবা-মা বাংলাদেশে আসলেও আছিয়া তার স্বামীর সঙ্গে মিয়ানমারেই থেকে যান। কিন্তু এখন মিয়ানমার জান্তার সঙ্গে বিদ্রোহীদের সংঘর্ষের তীব্রতা বাড়ায় জীবন নিয়ে মিয়ানমারে বেঁচে থাকার উপায় নেই।
আছিয়ার স্বামী ওসমান গনি বলছেন, যুদ্ধের মধ্যে এখন মিয়ানমারে থাকা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, আমরা কিন্তু এর আগেরবার বাংলাদেশে আসিনি। সেখানে আমাদের বাড়িঘর আছে, জমি আছে, সম্পদ আছে। কিন্তু এখন যেভাবে দুই পক্ষ গোলাগুলি করছে, তারা দেখছে না যে কে সাধারণ মানুষ আর কে যোদ্ধা। আমাদের গ্রামে যখন বোমায় মানুষ মারা গেল, তখন আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম যে মিয়ানমারে আর থাকা যাবে না।
কিন্তু তারা বাংলাদেশে ঢুকলেন কীভাবে? ওসমান গনি জানাচ্ছেন, প্রথমে হেটে তারা বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে এসেছেন। আমাদের গ্রামে প্রথমে আরাকান আর্মি ড্রোন হামলা করে। তখন আমরা গ্রামের বেশ কিছু লোক দুই দিন পাশের একটা বনে লুকিয়ে ছিলাম। কোনও খাবার ছিল না। কিন্তু সেখানেও আরাকান আমি ড্রোন দিয়ে বোমা মেরেছে। পরে আমরা নদীতে গলা পানিতে ডুবে থেকে কোনোমতে জীবন বাঁচাই। আমরা সীমান্তের কাছে চলে আসি।
ওসমান গনি বলছেন, নদী পারাপারের জন্য তাদের কাছে কোনও টাকা ছিল না। কিন্তু তারা বহু কষ্টে নদী পার হওয়ার জন্য একজন মাঝির সঙ্গে চুক্তি করেন। চুক্তি অনুযায়ী, স্বামী-স্ত্রী এবং সন্তানের জন্য বিশ হাজার টাকা দিতে হয় মাঝিকে।
ওসমান বলেন, আমরা যেন বাংলাদেশের কোস্টগার্ডের কাছে ধরা না পড়ি সেজন্য মধ্যরাতে নৌকা ছাড়ে। আমাদেরকে নামানো হয় শাহপরী দ্বীপের কাছে। পরে নৌকার মাঝি আমাদেরকে স্থানীয় একটি গ্রামে একটা ঘরে নিয়ে রশি দিয়ে বেঁধে রাখে। ক্যাম্পে আমাদের আত্মীয়ের কাছে ফোন দিলে তারা এসে চুক্তির ২০ হাজার টাকা তুলে দেয় মাঝিকে। এরপর তারা আমাদের ছেড়ে দেয়।








