দুনিয়ার জীবনে আর্থিক প্রবৃদ্ধি এবং পরকালীন জীবনের সুখ-শান্তি লাভের অন্যতম একটি মাধ্যম হচ্ছে দান-সদকাহ। দান-সদকাহ মুমিন জীবনের অন্যতম অনুষঙ্গ।
কুরআন ও হাদিসে দানের বহু ফজিলত উল্লেখ রয়েছে। দান আল্লাহ তা’আলার ক্রোধকে প্রশমিত করে। দান করলে বিপদাপদ দূর হয়। দানের প্রতিদানকে আল্লাহ তা’আলা সাত শ’ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করে দেন; এমনকি কাউকে আরও বেশি পরিমাণে অগণিত নেকি প্রদান করেন। ইমানদারের অনেকগুলো বৈশিষ্ট্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো দানশীলতা।
আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন: যারা অদৃশ্যে বিশ্বাস স্থাপন করে এবং সালাত প্রতিষ্ঠা করে এবং আমি তাদেরকে যে রিজিক প্রদান করেছি তা হতে দান করে। সুরা বাকারা: ৪। যারা দান-সদকাহ করেন তাদেরকেই আল্লাহ তা’আলা প্রকৃত মুমিন হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং তাদের জন্য রয়েছে দুনিয়া ও আখিরাতে উত্তম প্রতিদান।
আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন: সন্দেহ নেই, মুমিন তো তারাই, আল্লাহর নাম উচ্চারিত হলে যাদের অন্তর ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে, যখন তাদের নিকট তাঁর আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করা হয় তখন তা তাদের ইমানকে বাড়িয়ে দেয় এবং তারা তাদের প্রভূর ওপর ভরসা করে; যারা যথারীতি নামায আদায় করে এবং আমি তাদেরকে যে রিযিক দিয়েছি তা থেকে তারা ব্যয় করে। এরাই হচ্ছে প্রকৃত মুমিন। তাদের জন্য তাদের প্রভুর নিকট রয়েছে সুউচ্চ মর্যাদা, ক্ষমা ও সম্মানজনক রিযিক। সূরা আনফাল: ২-৪
এখানে যে বিষয়টি লক্ষণীয় সেটি হচ্ছে, আল্লাহ তা’আলা প্রকৃত মুমিনের পরিচয় হিসেবে দান-সদকার কথা উল্লেখ করেছেন। এই দান-সদকার মধ্যে ফরয দান যাকাত যেমন রয়েছে, ঠিক তেমনি নফল দান-সদকাহও এর অন্তর্ভুক্ত। ফরজ সদকাহ তথা যাকাতের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট পরিমাণ রয়েছে।
কারও কাছে যদি যাকাত আদায়যোগ্য নেসাব পরিমাণ সম্পদ থাকে, তবে তাকে শতকরা আড়াই টাকা হারে যাকাত আদায় করতে হয়। কারও উপর যাকাত ফরজ হলে এর থেকে বিরত থাকার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু নফল দানের ক্ষেত্রে এমন কোনো সীমা নির্ধারিত নেই। নেই বাধ্যবাধকতাও। ধনী-গরীব যে কেউ যখন ইচ্ছা দান-সদকাহ করতে পারে। কম-বেশি যে কোনো পরিমাণই দান করতে পারে। দান প্রকাশ্যে হতে পারে, হতে পারে গোপনেও।
প্রশ্ন হল, কোথায় কখন কীভাবে দান করলে নেকি পাওয়া যাবে? কোন দানটি আল্লাহ তা’আলার নিকট সেরা দান হিসেবে বিবেচিত হবে? এ প্রশ্নের উত্তর আমরা সরাসরি রসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুখ-নিঃসৃত হাদিসে পাকে খুঁজে পাই। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন: সর্বোত্তম সদকাহ সেটাই, যা নিজের সচ্ছলতা বজায় রেখে করা হয়। দাতার হাত গ্রহীতার হাতের তুলনায় উত্তম। আর (যখন সদকাহ করবে) তোমার পোষ্য ও অধীনস্তদের দিয়ে শুরু করবে। সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০৩৪
এই হাদিস শরিফের প্রথমাংশে সেরা দানের পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে, মাঝে দাতার ফজিলত এবং শেষে কাদেরকে দিয়ে দান শুরু করবে, তাদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। নিজের অধীনস্থ কিংবা আশপাশের অসচ্ছল মানুষগুলোই দানের প্রথম হকদার। তাই আগে তাদের প্রয়োজনের দিকে খেয়াল রাখা উচিত।
দান-সদকাহ করতে হবে হালাল ও পবিত্র বস্তু হতে। কেননা হারাম ও অপবিত্র কিছু আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কবুল করেন না। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন: যে ব্যক্তি হালাল উপায়ে অর্জিত মাল সদকাহ করে, আল্লাহ তা’আলা হালাল অর্থাৎ পবিত্রকেই কবুল করেন। তাহলে উক্ত সদকাহ সে আল্লাহর হাতে অর্পণ করল। আল্লাহ্ পাক সেটাকে ঐভাবে লালন-পালন করেন, যেভাবে তোমরা ঘোড়ার বাচ্চা কিংবা উটের বাচ্চা লালন-পালন কর। শেষ পর্যন্ত সেই সদকাবর্ধিত হয়ে পর্বতসমান হয়ে যায়। মুয়াত্তা ইমাম মালিক, হাদিস: ১৮৭২
উদারচিত্তে দান-সদকাহ করা এমন একটি ইবাদত যেটি পর্বত, লোহা, আগুন এমনকি বাতাসের চেয়েও অধিক শক্তিশালী। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন: আল্লাহ তা’আলা যখন পৃথিবী সৃষ্টি করেন তখন তা দুলতে থাকে। অতঃপর আল্লাহ তাতে পর্বত সৃষ্টি করলে তা স্থির হয়ে যায়। তা দেখে ফেরেশতাগণ আশ্চর্যান্বিত হয়ে বলল, হে প্রভু! পর্বতের চেয়ে শক্তিশালী তোমার অপর কোন সৃষ্টি আছে? আল্লাহ বললেন, হ্যাঁ, এর চেয়ে শাক্তিশালী হলো লোহা। তারা বলল, হে প্রভু! লোহার চেয়ে শক্তিশালী আর কিছু আছে? আল্লাহ বললেন, হ্যাঁ, তা হলো আগুন। তারা বলল, হে প্রভু! আগুনের চেয়ে শক্তিশালী কিছু আছে? আল্লাহ বললেন, হ্যাঁ, আগুনের চেয়ে শক্তিশালী হলো বাতাস। তারা আবার বলল, হে প্রভু! বাতাসের চেয়ে শক্তিশালী কিছু আছে? আল্লাহ বললেন, হ্যাঁ, আদম সন্তান উদার চিত্তে যে দান করে তা (বিপদ দূরীকরণের ক্ষেত্রে) বাতাসের চেয়েও অধিক শক্তিশালী। সুনানুত তিরিমিজি, হাদিস: ৩৩৬৯
দান করতে হবে একনিষ্ঠভাবে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে। লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে দান করা কিংবা দান করে খোটা দিলে দান বিফলে যাবে। আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন: হে মুমিনগণ, তোমরা খোঁটা ও কষ্ট দেয়ার মাধ্যমে তোমাদের সদকাহ বাতিল করো না। সে ব্যক্তির মত, যে তার সম্পদ ব্যয় করে লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে এবং বিশ্বাস করে না আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি। অতএব তার উপমা এমন একটি মসৃণ পাথর, যার উপর রয়েছে মাটি। অতঃপর তাতে প্রবল বৃষ্টি পড়ল, ফলে তাকে একেবারে পরিষ্কার করে ফেলল। তারা যা অর্জন করেছে তার মাধ্যমে তারা কোন কিছু করার ক্ষমতা রাখে না। আর আল্লাহ কাফির জাতিকে হিদায়াত দেন না। সুরা বাকারা: ২৬৪
শুধু টাকা পয়সা দান করাই সদকাহ নয়। বরং একজন মুসলিম ভাইয়ের সাথে সদাচরণ করাও সদকাতুল্য। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: তোমার হাস্যোজ্জ্বল মুখ নিয়ে তোমার ভাইয়ের সামনে উপস্থিত হওয়া তোমার জন্য সদকাহস্বরূপ। তোমার সৎকাজের আদেশ এবং তোমার অসৎকাজ হতে বিরত থাকার নির্দেশ তোমার জন্য সদকাহস্বরূপ। পথহারা লোককে পথের সন্ধান দেয়া তোমার জন্য সদকাহস্বরূপ, স্বল্প দৃষ্টি সম্পন্ন লোককে সঠিক দৃষ্টি দেয়া তোমার জন্য সদকাহস্বরূপ। পথ হতে পাথর, কাটা ও হাড় সরানো তোমার জন্য সদকাহস্বরূপ। তোমার বালতি দিয়ে পানি তুলে তোমার ভাইয়ের বালতিতে ঢেলে দেয়া তোমার জন্য সদকাহস্বরূপ। সুনানুত তিরিমিজি, হাদিস: ১৯৫৬
এছাড়াও ইসলামে দান-সদকাহর নানাবিধ ফজিলত রয়েছে। তাই আসুন মাহে রমজানের এই শেষ প্রান্তে আমাদের আশপাশের মানুষদের প্রতি করুণার হাত বাড়িয়ে দিয়ে নিজেকে এই মহান ইবাদতে শরিক করি। আমাদের দান-সদকাহ হোক লৌকিকতা থেকে মুক্ত আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সন্তষ্টির উদ্দেশ্যে।








