“তোমারে বধিবে যে, গোকুলে বাড়িছে সে” প্রবাদটি মহাভারতের। আলোচ্য প্রবাদটির অন্তর্নিহিত অর্থ হল- মানুষ তার নিয়তির অমোঘ পরিণতি থেকে কোনভাবেই রক্ষা পায় না।
মহাভারতে দুষ্টু প্রকৃতির প্রজা পীড়নকারী রাজা কংসের গল্পটা নিশ্চয়ই সবার মনে আছে। তার রাজ্যে বেড়ে ওঠা কৃষ্ণ তারই পতনের কারণ হবে তা সে কখনো কল্পনা করতে পারেনি।
তবে ইতিহাস বোদ্ধারা বর্তমান সময়ের কৃষ্ণ বলে অভিহিত করছেন জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানকে। অনেকে তাকে স্বৈরাচার শেখ হাসিনার আত্মীয় বলে ফলাও করে থাকলেও শেখ হাসিনার পতনে ওয়াকারুজ্জামানের মুখ্য ভূমিকা অনস্বীকার্য।
২০২৫ সালে আমরা একটা দীর্ঘস্থায়ী শান্তির পথে যেতে চাই। সে জন্য সবাইকে একসঙ্গে চলতে হবে। সবাইকে ঐকমত্যে পৌঁছাতে হবে। আমাদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকতে পারে; কিন্তু জাতীয় স্বার্থে ঐকমত্য জরুরি। তাহলেই গণতন্ত্র স্থায়ী হবে।
আমরা শান্তিপূর্ণ পরিবেশ চাই। বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সামাজিক উন্নয়নের জন্য এখন শান্তি ও স্থিতিশীলতা খুবই জরুরি। এই দুটি বিষয় না হলে উন্নয়ন আর সুশাসনও আসবে না। সে জন্য আমাদের মধ্যে সহিষ্ণুতা ফিরিয়ে আনতে হবে। সে জন্য একটা জাতীয় সমঝোতার পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
দেশ এবং দেশের জনগণ নিয়ে নিজের মনোবাসনা একটি স্বনামধন্য সংবাদ পত্রিকার কাছে সাক্ষাৎকার দেয়ার মাধ্যমে এভাবেই প্রকাশ করেছিলেন সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান।
১৯৬৬ সালে জন্মগ্রহণ করা ওয়াকার-উজ-জামান বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন জেনারেল ও বর্তমান সেনাপ্রধান। তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১৮তম সেনাপ্রধান হিসেবে ২৩ জুন ২০২৪ সালে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে আজ অব্দি তাকে যত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে বিগত বছরগুলোর কোন আর্মি জেনারেলকে সেটা হতে হয়নি।
ঐতিহাসিক ৫ ই আগস্ট, গণঅভ্যুত্থান এরপর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন; বিশ্রাম নেয়ার যেন সুযোগই পাচ্ছেন না জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান।
জুলাই বিপ্লব নিয়ে তার অনুভূতি তিনি ব্যক্ত করেন অনেকটা এভাবে “এটা সত্য। এত বড় গণ-অভ্যুত্থান। এত শহীদ, এত আহত, ঐতিহাসিক এক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে আমরা বর্তমান সময়ে এসে পৌঁছেছি। আমরা একটা নতুন স্বপ্ন, নতুন সময়ের পরিবর্তনের মধ্যে রয়েছি। ২০২৪ সালে আমাদের জন্য একটা নতুন সুযোগ ও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে ঘটে যাওয়া গণ-অভ্যুত্থানে ছাত্র, জনতা ও রাজনৈতিক দলসমূহের অংশগ্রহণ বাঙালি জাতির ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় ঘটনা। গণ-অভ্যুত্থানে শাহাদাতবরণকারী ও আহত সবার প্রতি জাতি চিরকৃতজ্ঞ থাকবে।”
প্রায় সময়ে বিভিন্ন ইস্যুতে নানাভাবে তাকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করেছে একশ্রেণীর লোকজন।
তার বিরুদ্ধে অন্যতম অভিযোগ হচ্ছে অন্য তিনি শেখ পরিবারের উত্তরসূরী। এর প্রেক্ষিতে বিশেষজ্ঞগণ বলছেন তিনি ঐ পরিবারের জামাতা হতে পারেন, তবে তিনি রক্ত সম্পর্কিত কেউ নন। এবং এই বিষয়টিও স্মরণে রাখতে বলেন যে ছাত্র জনতার উপর গুলি চালাতে নিষেধ করা মানুষটি ছিলেন জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। জানা যায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী স্বৈরাচার শেখ হাসিনার নির্দেশ অনুসরণ করতে এসএসএফ উদ্যত হলে এই বিষয়টিও সামলে নেন ওয়াকার-উজ-জামান।
এদিকে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামান না থাকলে দেশটা ম্যাসাকার হয়ে যেত বলে মন্তব্য করেছেন রাওয়া’র চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ আবদুল হক ।
জুলাই আন্দোলনের কথা স্মরণ করে তিনি একথা বলেন। তিনি আরো বলেন, “৫ আগস্ট জেনারেল ওয়াকার উজ জামান ছিলেন মূসা আলাইহিস (স.) এর মতো। অর্থাৎ ফেরাউনের ঘরে লালিত-পালিত হয়েছেন। কিন্তু মূসা আলাইহিস (স) কি ফেরাউনের পক্ষে ছিলেন? তার যে বিশাল একটা দিল, মানবতাবোধ, আল্লাহর যে ভয়, সততা, নিষ্ঠা, দেশপ্রেম, এটা একেবারে অসাধারণ।
আবদুল হাই বলেন, এটা অনেক আগে থেকেই আমি দেখেছি, আমার বিশ্বাস ছিল জেনারেল ওয়াকার উজ জামান কখনো ফ্যাসিস্ট হাসিনাকে কখনোই সমর্থন করবেন না। এ বিশ্বাস আমার শতভাগ ছিল।”
বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ মনে করেন বাংলাদেশের ইতিহাসের সেরা ৫ জন সেনাপ্রধানের তালিকা করলে সেখানে ওয়াকার-উজ-জামানের নাম আসবে।
সেনাবাহিনী আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালাবে না, জনগণের পাশে থাকবে—এই বার্তা ৩ আগস্টই ছড়িয়ে পড়ে। ওই দিন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান সেনা সদরের হেলমেট অডিটরিয়ামে ‘অফিসার্স অ্যাড্রেস’ গ্রহণ করেন। এ সময় তিনি সেনা কর্মকর্তাদের উদ্দেশে দেশের চলমান নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর আলোকপাত করে সেনাবাহিনীর কার্যক্রম সম্পর্কে বিভিন্ন দিকনির্দেশনা এবং তাদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশের জনগণের আস্থার প্রতীক। জনগণের স্বার্থে এবং রাষ্ট্রের যেকোনো প্রয়োজনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সব সময় জনগণের পাশে আছে এবং থাকবে। নির্বাহী আদেশ ছাড়া যেকোনো উসকানির মুখেও ছাত্র ও সাধারণ জনগণের দিকে গুলি না ছুড়তে তিনি সেনা সদস্যদের নির্দেশ দেন। এ ছাড়া সেনা কর্মকর্তাদের উদ্দেশে জানান, সেনাবাহিনীর সদস্যরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য কিছু সতর্কীকরণ ফায়ার করলেও তাতে কোনো নিহতের ঘটনা ঘটেনি।
জানা যায়, ওই দিন সেনাপ্রধান তরুণ সেনা কর্মকর্তাদের কাছে দেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে তাদের মতামত জানতে চান এবং স্পষ্ট করে বলেন, ‘এখন থেকে আর কোনো গুলি নয়। ’
সাবেক সেনা কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাসান নাসির (অব.) এ প্রসঙ্গে বলেন, সেনাবাহিনীর জুনিয়র লেভেলের অফিসাররা ছাত্র-জনতার বিপক্ষে অবস্থান নিতে চাননি। তাদের মনোভাব সেনাপ্রধানের সিদ্ধান্ত নেওয়াকে সহজ করে। আলটিমেটলি সেনাপ্রধানকেই সঠিক সিদ্ধান্তটি নিতে হয়।
নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব না নেয়া পর্যন্ত দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় ধৈর্যের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। পাশাপাশি কাজের সময় অতিরিক্ত বল প্রয়োগ না করার বিষয়টিও নিষ্ঠার সঙ্গে খেয়াল রাখছেন তিনি।
আমাদের সকলের শুভকামনা এবং সমর্থন রয়েছে তার প্রতি।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







