এই খবরটি পডকাস্টে শুনুনঃ
যুবপ্রজন্মের নতুন পরিচিতি ‘জেনারেশন জেড’ বা সংক্ষেপে ‘জেন-জি’। এই প্রজন্ম শুধু প্রযুক্তি ব্যবহারে পারদর্শী নয়, বরং তারা রাষ্ট্র ও সমাজের কাঠামোগত বৈষম্যের বিরুদ্ধেও সোচ্চার। দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ স্পষ্ট করে দিচ্ছে—জেন-জি কেবল আগামীর নাগরিক নয়, বরং বর্তমানের পরিবর্তনের চালিকাশক্তি। বাংলাদেশ থেকে নেপাল, এমনকি শ্রীলঙ্কা ও ইন্দোনেশিয়াতেও এই প্রজন্ম রাষ্ট্রীয় নীতিমালাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে।
বিক্ষোভ থেকে সরকার পরিবর্তন
নেপালে সরকারের পক্ষ থেকে ২৬টি সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত ছিল ‘নিয়ন্ত্রণ ও ভুয়া খবর রুখতে’। কিন্তু তরুণরা এটিকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর হুমকি হিসেবে দেখেন। তাদের আন্দোলন শহর থেকে গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগে গড়ায়। বাংলাদেশেও একইভাবে কোটাবিরোধী বিক্ষোভ সরকার পতনে গড়িয়েছে। এছাড়া সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিক্ষার্থী আন্দোলন, বিক্ষোভ কিংবা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সামাজিক ন্যায়ের দাবির পক্ষে জেন-জি প্রজন্ম দৃঢ় অবস্থান নিচ্ছে।

রাষ্ট্রীয় দমননীতির মুখেও তারা সোশ্যাল মিডিয়াকে শক্তিশালী হাতিয়ার বানিয়ে আন্দোলনকে সামনে এগিয়ে নেয়। যা শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক পরিবর্তনের ক্ষেত্র তৈরি করে। এই প্রবণতা শুধু বাংলাদেশ বা নেপালেই নয়। বরং পুরো দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াজুড়ে বিস্তৃত। শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক সংকটে তরুণদের রাজপথে নামা, ইন্দোনেশিয়ায় দুর্নীতিবিরোধী শিক্ষার্থী আন্দোলন—সবই জেন-জি প্রজন্মের নতুন রাজনৈতিক চেতনার বহিঃপ্রকাশ।
সমাজ পরিবর্তনে অবদান রাখতে চায় জেন-জি
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, জেন-জির একটি স্বাভাবিক বৈশিষ্ট হল, তারা প্রতিবাদমুখর। তারা পরিবর্তন চায়। তারা সমাজ পরিবর্তনে অবদান রাখতে চায়। যার প্রতিফলন দেখা গেছে বাংলাদেশের বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনে। নেপালে-শ্রীলংকাতেও তাই দেখা গেছে।
আমরা সরকার পরিবর্তনে ইচ্ছুক না,
বরং অপশাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়াই…
জেন-জিরা নিজেদের দেখছেন অপশাসনের প্রতিকার হিসেবে। তেমনই জেন-জি প্রজন্মের একজন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী জুবায়ের মাহমুদ খান বলেন, আমরা প্রযুক্তির কারণে বেশি স্বাধীন। অন্যায় দেখলে সোশ্যাল মিডিয়ায় তা ছড়িয়ে দেই। আমরা সরকার পরিবর্তনের ইচ্ছুক না। বরং অপশাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়াই।

বৈধতার সংকট
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ইতিহাস গবেষক আলতাফ পারভেজের মতে, জেন-জি মূলধারার দলগুলোকে পাশ কাটিয়ে সরাসরি সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে ভার্চুয়াল দল গঠন করছে। তবে তাদের আন্দোলনে গঠনমূলক দিকের ঘাটতি আছে। তিনি নেপালের উদাহরণ টেনে বলেন, জেন-জির চাপে নতুন সরকার এলেও সেটি বৈধতার সংকটে রয়েছে।
সবাই পরিবর্তন চায়,
কিন্তু পরিবর্তিত হতে চায় না অনেকেই
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, জেন-জিরা যে পরিবর্তন নিয়ে এসেছে তার প্রতিফলন নির্ভর করবে কর্তৃপক্ষের ওপর, তারা জেন-জির স্লোগান কতটা ধারণ করতে পেরেছে তার ওপর। সবাই পরিবর্তন চায়। কিন্তু পরিবর্তিত হতে চায় না অনেকেই। তাই এইসব আন্দোলন একটি মাইলস্টোন তৈরি করলেও দেখা যায় কর্তৃত্ববাদের ফিরে আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়। তবে এর দায় জেন-জিকে দেওয়া যায় না।

আছে পজেটিভ ও নেগেটিভ দিক
এই প্রজন্মের পজেটিভ ও নেগেটিভ দুই দিকই রয়েছে বলে মনে করেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক কাজী আনিস। তার মতে, পজেটিভ দিক হল তাদের ট্রান্সপারেন্সি আছে এবং তারা সাসটেইনেবলিটি চায়। আর নেগেটিভ দিক হল, তাদের কোন নিয়ন্ত্রণ নেই।
তারা তাদের চাওয়ার কোনো লিমিট রাখেনি,
যার ফলে তারা মবের সৃষ্টি করছে…
তিনি বলেন, তারা তাদের চাওয়ার কোনো লিমিট রাখেনি। যার ফলে তারা মবের সৃষ্টি করছে। তারা স্বচ্ছতার জন্য লড়াই করলেও তাদের পরিচালিত করছে কিছু অস্বচ্ছ মানুষ। জেন-জির একটি নিয়ন্ত্রণ দরকার এবং এই নিয়ন্ত্রণ তাদেরকেই করতে হবে। অন্যথায় তারা যার জন্য লড়াই করছে। শেষ পর্যন্ত তাই থেকে যাবে।
এই বিষয়ে সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, উৎসাহকে দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে মিলাতে হবে। অর্থাৎ, শুধুমাত্র প্রতিবাদ নয়, সাজানো পরিকল্পনা, অংশগ্রহণমূলক আন্দোলন ও স্থায়ী উদ্দেশ্য থাকা দরকার না হলে আন্দোলনের অর্জনগুলো সহজেই হারিয়ে যেতে পারে। জেন-জি বিদ্রোহী হলেও তাদের মূল লক্ষ্য গণতান্ত্রিক সংস্কার— যেখানে ক্ষমতা শুধু নির্বাচিতদের হাতে নয়, জনগণের প্রতিও দায়বদ্ধ থাকবে।







