ডোনাল্ড ট্রাম্পের আকস্মিক ইরান-মার্কিন সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের মধ্যকার তিন দশকের ‘পারিবারিক সৌহার্দ্য’ এখন প্রকাশ্য শত্রুতায় রূপ নিয়েছে। গত ৩০ বছরের ইতিহাসে আমেরিকা ও ইসরায়েলের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এতটা তলানিতে আর কখনো ঠেকেনি।
পরিস্থিতি কতটা সংঘাতপূর্ণ, তা স্পষ্ট হয়েছে হোয়াইট হাউসের সাম্প্রতিক প্রেস ব্রিফিংয়ে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের নজিরবিহীন ও ঝাঁঝালো মন্তব্য থেকে। ইসরায়েলি ক্যাবিনেটের কড়া সমালোচনা করে তিনি স্পষ্ট ভাষায় তেল আবিবকে তাদের বর্তমান অবস্থান ও একাকীত্ব নিয়ে সতর্ক করেছেন।
‘বাস্তবতা বোঝার চেষ্টা করুন’: জেডি ভ্যান্সের কঠোর বার্তা
ইরান চুক্তির বিরুদ্ধে ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের ক্রমাগত বিষোদগারের জবাবে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স অত্যন্ত কড়া ভাষায় ইসরায়েলকে তাদের সীমারেখা মনে করিয়ে দিয়েছেন। হোয়াইট হাউসের ব্রিফিং রুমে সাংবাদিকদের সামনে তিনি বলেন:
“ইসরায়েল সরকারের ক্যাবিনেটে আমি থাকলে, এই মুহূর্তে পৃথিবীর বুকে আমার অবশিষ্ট একমাত্র শক্তিশালী মিত্র রাষ্ট্রটিকে আক্রমণ করার আগে দশবার ভাবতাম। ইসরায়েলের যারা ভাবছেন তাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা মার্কিন প্রেসিডেন্ট, তাদের বলব—ঘুম থেকে উঠুন এবং বাস্তবতার মুখোমুখি হোন (Wake up and smell the reality)।”
ভ্যান্স আরও মনে করিয়ে দেন যে, গত চার মাসের ইরান যুদ্ধে ইসরায়েলকে রক্ষা করতে যে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে, তার দুই-তৃতীয়াংশেরই অর্থায়ন করেছে আমেরিকার সাধারণ করদাতারা। ওয়াশিংটনের স্পষ্ট বার্তা—আমেরিকার দাক্ষিণ্য ছাড়া বিশ্বমঞ্চে ইসরায়েল আজ সম্পূর্ণ একাকী।
তিন দশকের সবচেয়ে গভীর ফাটল: কৌশলগত বিচ্যুতি
১৯৯০-এর দশকের ওসলো চুক্তি বা পরবর্তী সময়ের যেকোনো সংকটের চেয়েও ২০২৬ সালের এই ফাটলকে গভীর মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। এই ঐতিহাসিক পতনের মূল কারণগুলো হলো:
-
স্বার্থের ভিন্নতা: আমেরিকার অগ্রাধিকার এখন মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেওয়া এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা (বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত করা)। অন্যদিকে, ইসরায়েলের লক্ষ্য ইরান ও হেজবুল্লাহর সম্পূর্ণ ধ্বংস সাধন, যা ওয়াশিংটনের বর্তমান কৌশলের সাথে সাংঘর্ষিক।
-
একতরফা কূটনীতি: ৪ মাস ধরে চলা ইরান যুদ্ধে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করার পর, ইসরায়েলকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে ট্রাম্পের এই শান্তি চুক্তিকে তেল আবিব ‘পিঠে ছুরি মারার’ শামিল বলে মনে করছে।
-
আর্থিক ও সামরিক চাপ: পেন্টাগন ইতিমধ্যে ইরানের ওপর থেকে নৌ-অবরোধ তুলে নিয়েছে। এর অর্থ হলো, ইসরায়েল যদি লেবানন বা ইরানে এককভাবে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চায়, তবে মার্কিন সামরিক ও গোয়েন্দা সহায়তার ছাতা আর তারা পাবে না।
মার্কিন জনমতের নাটকীয় পরিবর্তন
আমেরিকার অভ্যন্তরেও ইসরায়েলকে নিয়ে জনমতের একটি বড় ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ও প্রজন্মগত পরিবর্তন (Generational Shift) দেখা যাচ্ছে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন জরিপ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য:
-
ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মার্কিন নাগরিকদের একটি বড় অংশ ইসরায়েলের চেয়ে ফিলিস্তিনিদের প্রতি বেশি সহানুভূতিশীল।
-
অর্ধেকেরও কম আমেরিকান মনে করেন যে, ইসরায়েলকে নিঃশর্ত সমর্থন দেওয়া আমেরিকার জাতীয় স্বার্থের অনুকূলে।
-
মার্কিন আইনপ্রণেতারা এখন আর ইসরায়েলকে ‘অস্পৃশ্য’ বা সমালোচনার ঊর্ধ্বে মনে করছেন না; বরং কংগ্রেসে ইসরায়েলের সামরিক সহায়তার জবাবদিহিতা নিয়ে নিয়মিত প্রশ্ন উঠছে।
ইসরায়েলের সামনে এখন কোন পথ?
এই কূটনৈতিক বিপর্যয় ইসরায়েলকে এক চরম অস্তিত্ব সংকটের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। তেল আবিবের কট্টরপন্থী লিকুড ঘরানার থিঙ্কট্যাংকগুলো এখন পরামর্শ দিচ্ছে যে, আমেরিকার ওপর এই ‘একক নির্ভরশীলতা’ (Single-point dependence) কমিয়ে ইসরায়েলকে বিশ্বের অন্যান্য শক্তি কেন্দ্রের সাথে বহুমুখী কৌশলগত নেটওয়ার্ক তৈরি করতে হবে।
তবে আগামী অক্টোবরের নির্বাচনের আগে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জন্য এই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা অসম্ভব বলেই মনে হচ্ছে। বিরোধী দলগুলো ইতিমধ্যেই প্রচার করতে শুরু করেছে যে, নেতানিয়াহুর ভুল নীতির কারণে ইসরায়েল আজ বিশ্বজুড়ে বন্ধুহীন ও একঘরে। ৩০ বছর ধরে যে আমেরিকাকে ইসরায়েল নিজেদের পকেটের সম্পত্তি মনে করত, ২০২৬ সালের জুনে এসে সেই আমেরিকার হাতই আজ তাদের ওপর থেকে সরে গেছে।
মার্কিন-ইসরায়েল বিশেষ সম্পর্কের অবসান নিয়ে ফরেইন পলিসি লাইভের আলোচনা
এই ভিডিওটিতে ট্রাম্প-ইরান চুক্তির প্রেক্ষাপটে আমেরিকা ও ইসরায়েলের মধ্যকার দীর্ঘদিনের কৌশলগত এবং জনমতগত পরিবর্তনের গভীর বিশ্লেষণ করা হয়েছে, যা বর্তমান কূটনৈতিক ফাটলকে আরও স্পষ্টভাবে বুঝতে সাহায্য করবে।







