চব্বিশের জুলাই-আগস্টে ছাত্র জনতার গণ-অভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে হওয়া মামলার প্রথম সাক্ষী ট্র্যাইব্যুনালকে বললেন, ‘আমার সব শেষ হয়ে গেছে।’
রোববার (৩ আগষ্ট) বিচারপতি গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল- ১ এ এই মামলার সুচনা বক্তব্য উপস্থাপনের পর প্রথম সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা শেষ হয়েছে।
আজ চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম সুচনা বক্তব্য উপস্থাপনের পর এই মামলায় প্রথম সাক্ষী ২৩ বছরের খোকন চন্দ্র বর্মন গত বছরের ১৮ জুলাই নারায়নগঞ্জের সাইনবোর্ড এলাকায় তার সামনে ঘটে যাওয়া ঘটনায় হতাহতের সাক্ষ্য দেন। এসময় খোকন চন্দ্র বর্মন বলেন, ওইদিন যাত্রাবাড়ি থানা থেকে পুলিশ বের হয়ে পাখির মত ছাত্র জনতার ওপর গুলি চালায়। একপর্যায়ে পুলিশ তাকে টার্গেট করে গুলি করলে হাতে পায়ে গুলি লাগে বলে উল্লেখ করেন খোকন। একপর্যায়ে সে ফ্লাইওভারের নিচে থাকা কিছু ড্রামের পেছনে আশ্রয় নেয়। কিন্তু পুলিশ কাছ থেকে তার মাথা টার্গেট করে গুলি করে এবং সেটা টার মুখে লাগলে ছটফট করতে থাকেন বলে উল্লেখ করেন খোকন।
প্রথমে মুগদা মেডিকেল, তারপর ঢাকা মেডিকেল, এরপর মিরপুরের ডেন্টাল হসপিটাল ও বার্ন ইউনিটের আইসিইউতে ১ মাস চিকিৎসার পর রাশিয়ায় তাকে চিকিৎসার জন্য পাঠায় সরকার এবং আগামী ১২ আগস্ট আবার রাশিয়ায় অপারেশনের জন্য যাবেন বলে সাক্ষ্য দেন খোকন।
ট্রাইব্যুনালে দেয়া সাক্ষ্যে খোকন চন্দ্র বর্মন বলেন, আমার এক চোখ শেষ হয়ে গেছে, আরেক চোখে ঝাপসা দেখি। আমার নাক চোয়াল সব নষ্ট হয়ে গেছে। আমার সব শেষ হয়ে গেছে। একপর্যায়ে মাস্ক খুলে বিকৃত হয়ে যাওয়া নিজের মুখমণ্ডল দেখান খোকন। এরপর খোকন বলেন, মাননীয় আদালত আমার এই অবস্থা এবং আমাদের ভাইদের হত্যার আমি বিচার চাই। শেখ হাসিনা, কাউয়া কাদের, আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক আইজিপি ও শামীম ওসমানের বিচার চাই।
আজকে প্রথম সাক্ষ দেয়ার পর শেখ হাসিনার পক্ষে রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী আমির হোসেন খোকন চন্দ্র বর্মনকে জেরা করেন। আগামীকাল এই মামলায় পরবর্তী সাক্ষ্য গ্রহণ করবেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১।
আজ চিফ প্রসিকিউটরের সুচনা বক্তব্য উপস্থাপনের আগে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মো: আসাদুজ্জামান আজকের দিনটিকে ঐতিহাসিক উল্লেখ করে গত জুলাই আগস্টের গণহত্যার ন্যায় বিচার চেয়ে ট্র্যাইব্যুনালে বক্তব্য রাখেন।
আজ ট্র্যাইব্যুনালে চিফ প্রসিকিউটরের সাথে প্রসিকিউটররা উপস্থিত ছিলেন। অন্যদিকে, শেখ হাসিনার পক্ষে আছেন রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী আমির হোসেন। আর এই মামলায় গ্রেফতার হয়ে ট্র্যাইব্যুনালে হাজির থাকা আসামী সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের পক্ষে আছেন আইনজীবী যায়েদ বিন আমজাদ।
এদিকে আজকের বিচারিক কার্যক্রমের সময় এই মামলায় রাজসাক্ষী সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন কাঠগড়ায় হাজির ছিলেন।
এই মামলায় শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের বিরুদ্ধে গত ১০ জুলাই অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। এছাড়া এই মামলায় দোষ স্বীকার করে ঘটনার সত্যতা উদঘাটনে (অ্যাপ্রোভার) রাজসাক্ষী হতে সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের আবেদন মঞ্জুর করেন ট্র্যাইব্যুনাল।
গত ১৬ জুন ট্র্যাইব্যুনাল-১ পলাতক শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালকে হাজির হতে একটি বাংলা ও একটি ইংরেজি পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দেন এবং পরদিন দুটি পত্রিকায় শেখ হাসিনা ও কামালকে ৭ দিনের মধ্যে আত্মসমর্পণ করতে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়। তবে বিজ্ঞপ্তি দেয়ার পরেও পলাতক দুই আসামী ট্র্যাইব্যুনালে হাজির না হওয়ায় তাদের পক্ষে রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী দিয়ে এই মামলায় অভিযোগ গঠন বিষয়ে শুনানির দিন ধার্য করেন। সে অনুযায়ী শুনানি শেষে গত ১০ জুলাই এই মামলায় অভিযোগ গঠনের আদেশ দেন ট্র্যাইব্যুনাল-১।
জুলাই আগস্টে ছাত্র জনতার গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গত ১ জুন আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফর্মাল চার্জ) আমলে নেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। শেখ হাসিনার পাশাপাশি এই মামলায় অভিযুক্ত সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের ৫ টি অভিযোগ এনে অভিযোগ গঠনের আবেদন করে প্রসিকিউসন।
গত বছরের ৫ আগস্ট ছাত্র জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করা হয়। পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালে গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে প্রথম মামলাটি (মিস কেস বা বিবিধ মামলা) হয় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে।
এই মামলাটি ছাড়াও শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে আরও দুটি মামলা রয়েছে। যার মধ্যে একটি মামলায় আওয়ামী লীগ শাসনামলের সাড়ে ১৫ বছরে গুম-খুনের ঘটনায় তাকে আসামি করা হয়েছে। অন্য মামলাটি হয়েছে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায়।
গত জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলন নির্মূলে আওয়ামী লীগ সরকার, তার দলীয় ক্যাডার ও সরকারের অনুগত প্রশাসনসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি অংশ গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংগঠিত করে বলে একের পর এক অভিযোগ জমা পড়ে। জাজ্জ্বল্যমান এসব অপরাধের বিচার অনুষ্ঠিত হচ্ছে দুটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে।







