নতুন সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালেয়েশিয়াতে প্রথম বিদেশ সফর করছেন। তিনি গত ২১ জুন মালয়েশিয়া সফর শুরু করে সোমবার রাতে চীনের দালিয়ান চলমান ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের নতুন চ্যাম্পিয়নদের বার্ষিক সভায় যোগ দিয়েছিলেন তিনি।
বুধবার (২৪ জুন) বেইজিং-এ সফরে গিয়ে ২৬ জুন পর্যন্ত চীনে থাকবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মূলত তিনি কুয়ালালামপুর থেকে বেইজিং-এ গিয়েছেন। সরকারী সফরে ভারত ও চীনকে এড়িয়ে তৃতীয় দেশ মালেয়েশিয়াকে বেছে নেওয়ার বিষয়টি রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনায় এসেছে। আবার দেশের শ্রমবাজারের উল্লেখ্যযোগ্য এক দেশ মালেয়েশিয়া সফরে শ্রমবাজার ঘিরে জনমানুষের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। সবমিলিয়ে রাজনৈতিক সরকার হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তৃতীয় দেশ সফর ঘিরে মানুষের নানান কৌতুহল পাশাপাশি শ্রম ও কর্মসংস্থানের জন্য মালেয়েশিয়ার চলতি সফর আশাবাদীও করেছে। ‘ভারত ও চীনকে এড়িয়ে তৃতীয় দেশ মালেয়েশিয়া গমন, ভারসাম্যের আঞ্চলিক রাজনীতি ?
আসুন আজকের এক্সপ্লেনারে বিষয়টি বিশ্লেষণ করি:
প্রথমত: ৫ আগষ্ট ২০২৪ পরবর্তী নানান ঘটনা প্রবাহে রাষ্ট্র বাংলাদেশের নানান ধরনের সংকট পেরিয়ে রাজনৈতিক সরকার গঠন। বর্তমান সরকারের চার মাস পর প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বিদেশ সফর। তবে বৃহৎ প্রতিবেশী ভারত এবং সবচেয়ে বড় উন্নয়ন কার্যক্রমের অংশজন দেশ আরেক বৃহৎ দেশ চীন না গিয়ে তৃতীয় দেশ মালেয়েশিয়াতে গেলেন তিনি। প্রতিবেশী ও বৃহৎ উন্নয়ন সহযোগী দেশকে এড়িয়ে তৃতীয় কোন দেশ সফরের পিছনের কারণ নিয়ে নানান আলোচনা হচ্ছে।
এই বিষয়টিকে আঞ্চলিক রাজনীতির বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রধান মন্ত্রী চীন না ভারত না প্রথম সরকারি সফর করলেন মালেয়েশিয়াতে। এই যে সরকার প্রধানের প্রথম সফরের জন্য মালয়েশিয়াকে বেছে নেওয়া প্রধানমন্ত্রীর একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত, যা আঞ্চলিক রাজনীতি ও কূটনীতির ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
অধিকাংশ বিশেষকদের মতে, “বিনিয়োগ ও শ্রমবাজার বিষয়ে মালয়েশিয়া বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আবার আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক রাজনীতিতে দেশটির নিরপেক্ষ ভূমিকা রয়েছে। পাশাপাশি চীন ও পশ্চিমাদের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে দেশটির। দুই শক্তিধর দেশ ভারত ও চীনের বিতর্ক এড়িয়ে কুয়ালালামপুর সফর প্রধানমন্ত্রী বেছে নেওয়ার অন্যতম কারণ। বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারত-চীন বিতর্ক এড়ানো কিংবা সম্পর্কে ভারসাম্যের বার্তা দেওয়ার চেষ্টা এবং ভারতকে নিয়ে জনমনে থাকা প্রতিক্রিয়া বিবেচনায় নিয়ে কৌশলগত কারণেই প্রথম সফরের জন্য মালয়েশিয়াকে বেছে নিয়ে থাকতে পারেন প্রধানমন্ত্রী। সবমিলিয়ে বলা চলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীন ও ভারতের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখেই চলতে চাইছেন তা বলায় যায়।
দ্বিতীয়ত: এবার আসি প্রধানমন্ত্রীর মালেয়েশিয়া সফর বাংলাদেশের জন্য নিঃসন্দেহে অপরিসীম গুরুত্ব বহন করে। কেননা মালয়েশিয়া বাংলাদেশের শ্রমবাজার বা তরুণদের কর্মসংস্থানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশীদার দেশ মায়েশিয়া। এই দেশটিতে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মরত রয়েছেন। তাই শ্রমবাজার পুনরায় চালু করাই সফরের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। সেকথা সরকারী পর্যায়ের সংশ্লিষ্টরা বিভিন্ন ভাবেই তুলে ধরেছেন।
মূলত সরকার প্রধানদের সফর সবসময়ই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে এগিয়ে নেয়। তাই মালেয়েশিয়াতে প্রধানমন্ত্রীর সফরকে ঘিরে মালয়েশিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশিদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা ছিল। আবার দীর্ঘদিন পর বাংলাদেশের কোনো সরকারপ্রধান মালয়েশিয়া সফর করায় প্রবাসীরা এটিকে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন।
আমরা জানি যে, বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি রপ্তানির তালিকায় চতুর্থ দেশ হিসেবে রয়েছে মালয়েশিয়া। তারপরেও দেশটির শ্রমবাজার নিয়ে বিভিন্ন সময় নানা টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে গেছে বাংলাদেশ। সিন্ডিকেটসহ বিভিন্ন কারণে এখনো বাংলাদেশের জন্য বন্ধ আছে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার। মালয়েশিয়া সফরের মধ্য দিয়ে বন্ধ শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়ে বড় সুযোগ তৈরি হবে বলে তারা আশা করছেন।
গত ২২ জুন সোমবার মালেয়েশিয়া সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়েছেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম। তাঁরা একান্ত বৈঠক ছাড়াও দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন। সেখানে বৈঠকের পর উভয় প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে সংস্কৃতিবিষয়ক একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়।
এ ছাড়া সন্ত্রাসবাদ দমন বিষয়ে গবেষণা ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহযোগিতা সংক্রান্ত একটি দলিল এবং বিনিয়োগ সংক্রান্ত একটি দ্বিপক্ষীয় দলিল বিনিময় করা হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পুত্রজায়ায় মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় একান্ত বৈঠকের পর দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকও হয়েছে।
আলোচনায় বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের জন্য শ্রমবাজার আবার উন্মুক্তকরণ, বিভিন্ন কারণে অবৈধ হয়ে যাওয়া বাংলাদেশি নাগরিকদের নিয়মিতকরণ ও ওয়ার্ক পারমিট নবায়ন, বাংলাদেশের আম, ফলমূল ও শাকসবজির জন্য মালেশিয়ার বাজারে প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি, আসিয়ানের সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার হওয়ার জন্য বাংলাদেশের আবেদন, রিজিওনাল কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি, রোহিঙ্গা ইস্যু এবং জাতিসংঘ ও অন্যান্য বহুপক্ষীয় ফোরামে সহযোগিতার বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।
তৃতীয়ত: মালয়েশিয়ার চেয়ে বেশি কৌতূহল তৈরি হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর নিয়ে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী চীনে গিয়েছেন। ২৩ থেকে ২৬শে জুন পর্যন্ত বেইজিং সফর করবেন। এই যে, মালেয়েশিয়া থেকে প্রধানমন্ত্রীর চীনে সফরের রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক গুরুত্বের বিবেচনায় নানান সমীকরণ কাজ করছে। আর একারণে এই সফরের খুঁটিনাটি চূড়ান্ত করতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম বেইজিং গিয়ে চীনের উপ পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন।
মনে করা হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রীর সফরের মাধ্যমে মালয়েশিয়া ও চীনের সাথে সম্পর্কের গতি আরও বাড়বে, যার মাধ্যমে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে জটিলতার অবসান ও বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ আরও বাড়ানোর ক্ষেত্র তৈরির সুযোগ তৈরি হতে পারে। এ সফরে প্রায় পনেরটির মতো সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হবার আভাস পাওয়া গেছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে। বাণিজ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রতিরক্ষাসহ বিভিন্ন খাতে এসব সমঝোতা স্মারক হবে বলে জানা যাচ্ছে।
এই সফরে যে কয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে তার মধ্যে রয়েছে-বাংলাদেশে প্রস্তাবিত দ্বিতীয় পদ্মা সেতু, তিস্তা মহাপরিকল্পনা, যমুনায় আরেকটি সেতু, বাংলাদেশে চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল।
সম্প্রতি একনেকে চীনের ঋণে ৪ হাজার কোটি টাকার একটি অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি বাংলাদেশ চীনা মুদ্রায় একটি বন্ড চালুর প্রস্তাব খতিয়ে দেখছে।
কর্মকর্তারা বলছেন, এ সফরে বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাণে বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি সহায়তা চাইবে বাংলাদেশ। এছাড়া কৃষি প্রযুক্তি হস্তান্তরেও চীনকে প্রস্তাব দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বাংলাদেশের দিক থেকে।
এর বাইরেও চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ), মুদ্রা বিনিময় চুক্তি এবং বাংলাদেশে একটি চীনা ব্যাংক স্থাপনের পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে থাকা বিনিয়োগ চুক্তিগুলোর আপগ্রেডেশনের প্রস্তাব আলোচনায় আসতে পারে বলে কর্মকর্তারা ধারণা দিয়েছেন।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই–এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







