দেশ স্বাধীনের দীর্ঘ ৫৫ বছরে এই প্রথম সীমান্ত লাগোয়া উত্তর জনপদের জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে সফরে এলেন বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন। ৫৫ বছরে যা ঘটেনি, শুক্রবার সেটাই দেখল উত্তরের প্রান্তিক জেলা ঠাকুরগাঁও।
আকস্মিক ও নজিরবিহীন এই সফরকে কেন্দ্র করে স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলে যেমন ভূ-রাজনৈতিক জল্পনা-কল্পনা চলছে, তেমনি সাধারণ মানুষের মাঝে সৃষ্টি হয়েছে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার আশা।
বিশেষ করে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে ‘পুশব্যাক’ বা বাংলাভাষী মানুষকে জোর করে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টার চলমান উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যে এই অঞ্চলে চীনা রাষ্ট্রদূতের আগমনকে কেবল ‘নিছক সফর’ হিসেবে দেখছেন না অনেকে। তবে ভূ-রাজনৈতিক এই সমীকরণকে ছাপিয়ে স্থানীয় নেতৃত্ব একে ঠাকুরগাঁওয়ের কৃষি ও শিল্পায়নের নতুন দিগন্ত হিসেবেই তুলে ধরছেন।
শুক্রবার (১২ জুন) সকাল ১১ টায় ঠাকুরগাঁও শহীদ মোহাম্মদ আলী স্টেডিয়ামে আয়োজিত এক জমকালো অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ও এলজিআরডি মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
চীনা রাষ্ট্রদূতের সাথে ব্যক্তিগত সুসম্পর্কের কথা উল্লেখ করে এলজিআরডি মন্ত্রী বলেন, ‘ইতিমধ্যে আমি দুবার চীন সফর করেছি। সেই সুবাদেই উনাকে বিশেষভাবে ঠাকুরগাঁওয়ে দাওয়াত করে নিয়ে এসেছি। আমরা ঠাকুরগাঁওয়ে নতুন নতুন শিল্প-কলকারখানা তৈরি করতে চাই। চীনা রাষ্ট্রদূত আমাদের এই শিল্পায়নের কাজে পূর্ণ সহযোগিতা করার আশ্বাস দিয়েছেন।’
মির্জা ফখরুল আরও জানান, আগামী বছরের জুলাই-আগস্ট মাসের মধ্যে চীনের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল ঠাকুরগাঁওয়ে আসবেন এবং এখানকার স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সাথে মতবিনিময় করে বিনিয়োগ ও শিল্প কারখানা স্থাপনের রূপরেখা চূড়ান্ত করবেন। চীন সরকারের সৌজন্যে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার ৩৮টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ৬ হাজার ৩০৮ জন শিশু শিক্ষার্থীর মাঝে আকর্ষণীয় স্কুল ব্যাগ ও বিভিন্ন শিক্ষা উপকরণ বিতরণ করা হয়।
দীর্ঘ প্রতীক্ষিত উপহার পেয়ে খুদে শিক্ষার্থীদের মাঝে এক আনন্দঘন ও উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
এর আগে সকালে অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছালে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনকে লাল গালিচা সংবর্ধনা, পুষ্প বৃষ্টি এবং আদিবাসী নারীদের ঐতিহ্যবাহী নৃত্যের মাধ্যমে জমকালো অভ্যর্থনা জানানো হয়।
পবিত্র ধর্মগ্রন্থসমূহ থেকে পাঠের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা ঘটে এবং পরে বাংলাদেশ ও চীনের জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বলেন, ‘মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাংলাদেশের একজন অত্যন্ত বিখ্যাত ও প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ। তিনি দেশের ও জনগণের কল্যাণে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। চীন সরকার সবসময় আপনাদের পাশে রয়েছে।’
ঠাকুরগাঁওয়ের উর্বর ভূমির প্রশংসা করে তিনি বলেন, ‘এখানে প্রচুর কৃষিজমি ও বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। আমি আসার পথে দেখছিলাম এখানে অনেক জমি আছে। মির্জা ফখরুল স্যার আমাকে ঠাকুরগাঁও সম্পর্কে অনেক পরিচয় দিয়েছেন। আমি ভাবছি আরও অনেক বিনিয়োগ ঠাকুরগাঁওয়ে আসবে।’
রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, চলতি বছর বা আগামী বছরে এখানকার ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে চীনে সফর করা হবে। আমি আপনাদেরকে সেই সুযোগ করে দেব।
এর আগে বিভিন্ন সময়ে ঠাকুরগাঁওয়ে নেদারল্যান্ডস, কানাডা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং আমেরিকার দূতাবাস কর্মকর্তারা এসেছেন। এমনকি জেলাটিতে ভারতীয় ভিসা সেন্টার চালুর পর রাজশাহী অঞ্চলের ভারতীয় অ্যাসিস্ট্যান্ট হাই কমিশনার মনোজ কুমারও একাধিকবার পরিদর্শন করেছেন। কিন্তু অতীতে কোন বিদেশি কূটনীতিকের সফর নিয়ে এলাকায় এমন শোরগোল বা আলোচনা তৈরি হয়নি, যা এবার চীনা রাষ্ট্রদূতের আগমনকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে। সকাল থেকেই পুরো ঠাকুরগাঁও শহর জুড়ে ছিল উৎসবমুখর ও সাজ সাজ রব।
ঠাকুরগাঁও এবং এর পার্শ্ববর্তী এলাকা মূলত কৃষিভিত্তিক অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। তবে সঠিক নেতৃত্ব ও অর্থনৈতিক বিনিয়োগের অভাবে অঞ্চলটি দীর্ঘদিন ধরে একপ্রকার অর্থনৈতিক মঙ্গা বা স্থবিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
ঠাকুরগাঁও জেলা চাল কল মালিক সমিতির সদস্য ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক তাজুল ইসলাম বলেন, নীলফামারী জেলায় ইতিমধ্যে চীনের পৃষ্ঠপোষকতায় উৎপাদনমুখী শিল্প কারখানা গড়ে ওঠায় ওই অঞ্চলের শ্রমজীবী মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। সরকার বা কোন বন্ধুপ্রতীম দেশের পৃষ্ঠপোষকতায় ঠাকুরগাঁওয়েও কৃষিভিত্তিক অর্থনৈতিক অঞ্চল দ্রুত বিস্তার করতে পারে।
চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি মোদাচ্ছের হোসেন বলেন, ‘বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনার মাধ্যমে সম্ভাবনাময় জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা সম্ভব। এর জন্য দরকার সঠিক নেতৃত্ব ও সুষ্ঠু পরিকল্পনা।’
ভারতের সীমান্ত ঘেঁষা এই জেলায় বিএনপি মহাসচিবের নেতৃত্বে চীনা রাষ্ট্রদূতের এই ঐতিহাসিক সফর ঠাকুরগাঁওয়ের কৃষি ও শিল্পে কতটা বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
অনুষ্ঠানে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খাইরুল ইসলামের সঞ্চালনায় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রফিকুল হক, পুলিশ সুপার বেলাল হোসেন, জেলা বিএনপির সভাপতি মির্জা ফয়সাল আমিন, সাধারণ সম্পাদক পয়গাম আলী এবং ইএসডিও-র নির্বাহী পরিচালক ড. মুহম্মদ শহীদ উজ জামানসহ স্থানীয় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ।







